সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪, ২ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

অনলাইন টিকিট যুদ্ধের পর ট্রেনে স্বস্তির ঈদযাত্রা

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৩১ এএম

চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ঈদের বাকি আর মাত্র সপ্তাহখানেক। গতকাল বুধবার থেকে রেলপথের যাত্রীদের আনুষ্ঠানিক ঈদযাত্রা শুরুর প্রথম দিন ছিল অনেকটাই স্বস্তির। অনলাইন টিকিট যুদ্ধে জয়ী হয়ে বাড়ি ফেরার আরামদায়ক যাত্রায় শামিল হতে পেরে যাত্রীদের চোখেমুখে ছিল খুশির ঝিলিক।

ঈদযাত্রার প্রথম দিনে এবার যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় চোখে পড়েনি। বরং সকালের দিকে ভিড় ছিল স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও কম। ট্রেনের ভেতরেও আগের মতো গাদাগাদি অবস্থা ছিল না। কামরার ভেতরে কিছু যাত্রী দাঁড়িয়ে থাকলেও ছাদে ভ্রমণের দৃশ্য চোখে পড়েনি। সময় মেনেই বেশিরভাগ ট্রেন কমলাপুর থেকে ছেড়ে গেছে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে। শুক্রবার থেকে আস্তে আস্তে যাত্রীর ভিড় বাড়বে বলে মনে করেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

দুপুর ২টার দিকে ঢাকার কমলাপুর রেলস্টেশন পরিদর্শন শেষে রেলমন্ত্রী জিল্লুল হাকিম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঈদে ঘরমুখো মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে ট্রেনে বাড়ি ফিরতে পারে, সেজন্য সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা রয়েছে, আমাদের চেষ্টার কোনো ঘাটতি নেই। আমাদের সীমিত আসনের মধ্যে যারা টিকিট পায়নি, তারা যেন দাঁড়িয়ে যেতে পারে সেজন্য স্টেশনে সরাসরি ২৫ শতাংশ টিকিটের ব্যবস্থা রেখেছি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের যাত্রীরা নির্বিঘ্নে যাতায়াত করছে। কালোবাজারি নেই। বিনা টিকিটে রেল ভ্রমণ ঠেকাতে সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও রেলের আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে আরও সতর্ক ও তৎপর থাকতে বলা হয়েছে।’

ট্রেনে যাত্রী সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ২০০ বগি আমদানির অনুমোদন পেয়েছি। আগামী এক বছরে ৭০০-৮০০ বগি এবং ইঞ্জিন আমদানি করব। আশা করি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমরা আরও বেশি যাত্রী ও মালামাল বহন করাতে পারব।’

ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ঠেকাতে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়ে রেল সচিব ড. মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘বিভিন্ন পয়েন্টে আমাদের অতিরিক্ত লোকোমোটিভ রাখা থাকবে। যাতে জরুরি কোনো সমস্যা থাকলে তা যেন দ্রুত সমাধান করা যায়। সে ক্ষেত্রে কোনো ইঞ্জিনের সমস্যা হলে যত দ্রুত সম্ভব সমাধানের জন্য অতিরিক্ত লোকোমেটিভ আমরা বিভিন্ন পয়েন্টে রাখব।’

কমলাপুর স্টেশন পরিদর্শন এবং মতবিনিময়কালে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশ রেলওয়ে গত ২৪ মার্চ থেকে যাত্রীদের মধ্যে আন্তঃনগর ট্রেনের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছিল। ওইদিন যারা টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন তারা গতকাল বিভিন্ন গন্তব্যে যাত্রা করেন। ভোর ৬টার দিকে ঢাকা থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে প্রথম ট্রেন ধূমকেতু এক্সপ্রেস ছেড়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ঈদযাত্রা। দ্বিতীয় ট্রেন হিসেবে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ছেড়ে যায় সকাল ৬টা ২০ মিনিটে। তৃতীয় ট্রেন সিলেটগামী পারাবত এক্সপ্রেস সকাল ৬টা ৩৪ মিনিটে ঢাকা ছেড়ে যায়। এভাবে একে একে ট্রেন ছেড়ে যায় বিভিন্ন গন্তব্যে।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ছেড়ে যায় সিলেটের উদ্দেশে। ট্রেনটির পরিচালক হাসান সিকদার বলেন, ‘সরকারি ছুটি শুরু না হওয়ায় ঈদযাত্রার প্রথম দিনে তেমন একটা যাত্রীর চাপ নেই। বরং স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও যাত্রীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে যাত্রীর চাপ কিছুটা বাড়তে পারে।’

কমলাপুর রেলস্টেশন ঘুরে দেখা যায়, বিনা টিকিটে যাত্রা বন্ধ করতে দুই ধাপে চেক করা হচ্ছে। টিকিট স্ক্যান করে তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পরই যাত্রীরা ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছেন। ভেতরে প্রবেশ করানো হচ্ছে।

স্টেশনে বাঁশ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে প্রথম অস্থায়ী গেট। সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন রেলওয়ের কর্মীরা। পরে প্ল্যাটফর্মের মূল গেট দিয়ে প্রবেশের আগেও যাত্রীদের থেকে টিকিট দেখা হচ্ছে। যাত্রীদের কেউ টিকিট প্রিন্ট করে নিয়ে এসেছে কেউ আবার মোবাইলেই টিকিট দেখিয়ে ভেতরে প্রবেশ করছিলেন।

প্রথম দিনের ঈদযাত্রায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি পরিবারের একাংশকে আগে পাঠানো যাত্রীদের সংখ্যা বেশি দেখা গেছে। ঈদের আগমুহূর্তে ঝক্কি-ঝামেলা এড়াতে আগেভাগেই স্ত্রী-সন্তানদের গ্রামের বাড়িতে পাঠানোর উদ্দেশ্যে রাজশাহীগামী সিল্কসিটি এক্সপ্রেসের জন্য স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জাফর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমার অফিসে ঈদের ছুটি হবে ৮ তারিখ অফিস শেষ হওয়ার পর। যেহেতু ট্রেনের টিকিট পেয়ে গেছি তাই পরিবারের সদস্যদের আগেই পাঠিয়ে দিচ্ছি। পরে আমি একা যেতে কোনো ঝামেলা হবে না।’

ঈদযাত্রায় স্বস্তি প্রকাশ করে জাফর বলেন, ‘সবমিলে স্টেশনের পরিবেশ অনেক ভালো। ঈদযাত্রা নিয়ে ঝক্কি-ঝামেলার আশঙ্কা করে বাসা থেকে বের হয়েছিলাম। কিন্তু স্টেশনে এসে দেখলাম পুরো উল্টো চিত্র। খুবই ভালো লাগছে।’

সিলেটগামী কালনী এক্সপ্রেসের যাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সিরাজুম মুনিরা বলেন, ‘অনলাইনে ঈদযাত্রার টিকিট কাটতে গিয়ে আমার তেমন কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয়নি। এবার টিকিট নিয়ে তেমন একটা কারসাজির কথা শোনা যায়নি। স্টেশনে প্রবেশের সময় একাধিকবার টিকিট চেক করে তারপর ভেতরে এসেছি। টিকিট ছাড়া যাত্রী প্রবেশ করতে না দেওয়ায় অনেক ভালো হয়েছে। সবমিলিয়ে রেলের উদ্যোগ যাত্রীবান্ধব।’ বছর জুড়ে এমন পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ট্রেনের যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধির দাবি জানান তিনি।

কমলাপুর স্টেশনে ঢোকার মুখেই বাঁশ দিয়ে কয়েকটি প্রবেশপথ বানানো হয়েছে। সেখানে হাতে টিকিট পরীক্ষা করার মেশিন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন রেলের ট্রাভেলিং টিকিট এক্সামিনাররা (টিটিই)। তাদের ওই মেশিনে টিকিট স্ক্যান করার পর তবেই যাত্রীরা ঢুকতে পারছেন প্ল্যাটফর্মে।

স্টেশনের প্রবেশমুখে টিকিট পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা এএইচএম সাজ্জাদুল বলেন, ‘এখনো টিকিট ছাড়াই স্টেশনে চলে আসছেন অনেকে। কেউ আসছেন অন্যের টিকিট নিয়ে। আমরা অনেককে জরিমানা করেছি, তাদের বুঝিয়েছি নিজের টিকিট নিজে নিয়ে আসার জন্য। পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো। কালোবাজারিদের কোনো দৌরাত্ম্য নেই। শৃঙ্খলার সঙ্গেই যাত্রীরা যাচ্ছেন।’

ঢাকায় ট্রেন ফিরতে দেরি হওয়ায় সকালে রংপুর এক্সপ্রেস এবং সিল্কসিটি এক্সপ্রেস ট্রেন কিছুটা দেরি করে ছেড়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য ট্রেন মোটামুটি সময় মেনেই ঢাকা ছেড়ে গেছে।

উল্লেখ্য, এবার কাউন্টারে ভিড় না থাকলেও অনলাইনে লাখ লাখ হিট পড়েছে অগিম টিকিটের জন্য, হিটের সংখ্যা কোনো কোনো দিন কোটিও ছাড়িয়ে গেছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত