৩৯ বার হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয় শিশুদের টমটম গাড়ি

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২৪, ০৫:৩০ পিএম

দড়ি বা সুতলি লাগিয়ে শিশুরা ঠেলাগাড়ির মত খেলনা টেনে নিয়ে যায়, আর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে ঢোলের ন্যায় মৃদু শব্দ। আর শিশুদের এই খেলনার নাম ‘টমটম গাড়ি’। স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে রংপুর অঞ্চলে বসবাসরত বিহারীদের হাতে তৈরি হতো এই খেলনা গাড়ি। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর তা বগুড়ার খোলাস গ্রামের কয়েকজন যুবক রপ্ত করেন এবং এই গাড়ি তৈরি করেন।

খোলাস গ্রাম বগুড়া শহর থেকে প্রায় ২৯ কিলোমিটার দূরে দুপচাাঁচিয়া উপজেলায় অবস্থিত। এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই তৈরি হয় ‘টমটম’ খেলনা। খোলাস গ্রামে তৈরি হওয়া টমটম খেলনা সরবরাহ হয় সারাদেশে। এই গ্রামের তিন পুরুষের আদি ব্যবসায় পরিণত হয়েছে টমটম তৈরি। একটি টমটম গাড়ি তৈরি করতে প্রায় ৩৯ বার হাতের ছোঁয়া লাগে। তারপর পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয় টমটম গাড়ি। আধুনিকতার ছোয়া ছাড়াই সম্পূর্ণ হাতে তৈরি হয় এই খেলনা। প্রতি বছর দূর্গা পূজা, বৈশাখী মেলা এবং ঈদে টমটম নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মেলায় ছুটে বেড়ান এই গ্রামের ব্যবসায়ীরা। এই গ্রামের প্রায় ৩ শতাধিক পরিবার এই টমটম শিল্পকে নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।

সম্প্রতি খোলাস গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, পুরুষের পাশাপাশি সমানতালে কাজ করেন বাড়ির নারীরা। গৃহস্থালির কাজ শেষ করে নারীরা টমটম গাড়ির বিভিন্ন অংশ তৈরি করেন। কেউ বাঁশ নিদিষ্ট মাপে কাটছেন, আবার কেউ বাঁশের টুকরো গুলোকে নিদিষ্ট মাপে ভাগ ভাগ করে রোদে দিয়েছেন, আবার কেউ বাশের ছোট ছোট টুকরো গুলোকে ড্রিল মেশিন দিয়ে ছিদ্র করছেন। ছিদ্রগুলোতে কেউ আবার আগুনের শিক গরম করে তাতে আঁচ দিচ্ছেন। কেউ আবার বাশ থেকে নিদিষ্ট মাপের কাঠি তৈরি করছেন। কেউ কুমার পাড়া থেকে আনা ঢোলের বাটি ও চাকা রোদে শুকাচ্ছেন। কেউ আবার শুকনো বাটির উপরে আঠা দিয়ে কাগজ লাগাচ্ছেন। আবার কেউ সেই বাটিতে কাঠিতে পেচানো কাপড়ের তৈরির তুলি দিয়ে রাঙিয়ে দিচ্ছেন। বিভিন্ন রঙে ফুটিয়ে তুলছেন, ফুল, পাখি, গাছ, হাতি, ঘোড়া, মাছ, মই, কুলা, ঘরসহ আরও অনেক কিছু। তবে প্রতিবারই আলাদা আলাদা চিত্র উঠে আসছে। এরপর তা আবারও রোদে দেয়া হয় শুকানোর জন্য। এভাবেই পর্যায় ক্রমে ৩৯ বার হাত দিতে হয় একটি টমটম গাড়ি তার নিজস্ব রূপে আসে।

রঙ করা হচ্ছে শিশুদের খেলনা গাড়ি টমটম।

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর যে কয়জন যুবক এই টমটম গাড়ি তৈরি করা শিখে ছিলেন তার মধ্যে একজন ফয়জল হক (৭৫)। বয়সের ভারে এখন বৃদ্ধ তিনি। নিজ বাড়িতে এখনও টমটম তৈরি করেন। তার ছেলে মামুনুর রশিদও বাবার হাতধরে টমটম তৈরি ও ব্যবসা করে যাচ্ছেন। এখন মামুনুর রশিদকে তার ছেলে ও স্ত্রী এ কাজে সহায়তা করেন। প্রায় তিন পুরুষের ব্যবসায় পরিণত হয়েছে এটি।

ফয়জল হক বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের পর খোলাস গ্রামের কুড়ানো নামের একলোকের সাথে রংপুরে যাই কয়েকজন। সেখানে পাকিস্তানি বিহারীদের কাছে এই টমটম বানানো শেখা হয়। তারপর বাড়ি এসে আমরা টমটম বানানো শুরু করি। তখন এই অঞ্চলে কেউ জানতো এটি তৈরি করা। টমটম ব্যবসা ভাল হওয়ায় গ্রামের আরও বেশ কয়েকজন যুবক শিখে তারাও শুরু করে। সে সময় টমটম তৈরিতে ২ আনার মত খরচ পড়তো, আর বিক্রি হতো ২ আনা ও ৪ আনায়। এখন তা তৈরিতে খরচ পড়ে ৯/১০ টাকা, পাইকারি বিক্রি হয় ১১ থেকে ১২ টাকা, খুচরা বিক্রি হয় ২০ থেকে ২৫ টাকা। আগেকার দিনে হেঁটে হেঁটে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে গেছি। জয়পুরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর আরও কত জেলায়। এখন ছেলে যায়। তবে এই হস্তশিল্পটিকে এগিয়ে নিতে পারলে আরও ভাল হয়।

বাড়ির উঠানে বসে টমটম গাড়ি তৈরি করছিলেন আব্দুল বারী ও তার স্ত্রী আসমা বেগম। আব্দুল বারী প্রায় ২০ বছর আগে বিয়ে করেন। তার ব্যবসা ভাল না হওয়ায় খোলাস গ্রামে শ্বশুর বাড়িতে এসে থিতু হন। তারপর থেকে জীবিকার তাগিদে তৈরি করছেন টমটম গাড়ি। আর তা দিয়েই সংসার চালাচ্ছেন তিনি। 

আব্দুল বারী জানান, একটি টমটম গাড়ি তৈরি করতে প্রায় ৩৯ বার হাত দিতে হয়। তারপর তা পূর্ণরূপ পায়। সারাবছর এই কাজে তার স্ত্রী আসমা বেগম সহায়তা করেন।

আরেক বাড়ির উঠানে গিয়ে দেখা যায় বৃদ্ধা বুলবুলি বেগম দা দিয়ে বাঁশের ছোট ছোট টুকরোগুলো কেটে কাঠি দিয়ে বানানো ফ্রেমে লাগাচ্ছেন, পাশেই তার ছোট বোন আকলিমা রং তুলি দিয়ে ছবি ফুটিয়ে তুলছেন নানা চিত্র। যা মূল আকর্ষণ টমটম গাড়ির।

আরেক বাড়ির ঘরের মধ্যে টমটম তৈরিতে ব্যস্ত রুবেল হোসেন। রুবেল জানান, প্রতিটি পার্বণেই দেশের স্থানে এই টমটম গাড়ি শিশুদের প্রিয় খেলনা। রুবেল দেশের কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলায় যান। সারা বছরই চাহিদা থাকে। তবে দূর্গা পুজা থেকে বৈশাখ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি  চাহিদা থাকে। মেলায় খাজনা দিয়ে নিজেদের খরচ চালিয়েও লাভ থাকে, যা দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। বছরে প্রায় কয়েক লাখ টমটম তৈরি করেন এই গ্রামের কারিগররা।

এই শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা ও বিশিষ্টজনরা। টমটম গাড়ির বিষয়ে বগুড়া লেখক চক্রের সভাপতি কবি ইসলাম রফিক বলেন, খোলাস গ্রামে তৈরি টমটম গাড়ি সারাদেশে যাচ্ছে। যা শিশুদের অত্যন্ত প্রিয় খেলনা। আমরা ছোট বেলায় এই খেলনা দিয়ে খেলেছি। তাই শিল্পকে আরও সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত