শনিবার, ২৫ মে ২০২৪, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

নববর্ষের আবাহনে প্রাণ প্রকৃতির লড়াই 

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ০১:০২ পিএম

আরও একটা বছর বিদায় নিল। আমাদের মাঝে চলে এল নতুন একটি বছর। ভোরের সূর্য ফুটতেই অনিঃশেষ আশা নিয়ে আসল বাংলা নববর্ষ। বাঙালির নববর্ষের দিনে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, চাংক্রাং উৎসবও পালিত হচ্ছে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে। 

বাংলাদেশের বাইরেও  আসাম, বঙ্গ, কেরল, মণিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়ু এবং ত্রিপুরার প্রায় একই সময়ে নতুন বছরকে বরণ করে নিচ্ছেন। 

নতুন বছরের উদযাপন অবশ্য কেবলই একটা উৎসব নয়। কৃষিভিত্তিক এই জনপদে ঋতুচক্রের সঠিক হিসাবের ওপর নির্ভর করত কৃষিজ পরিকল্পনা ও কার্যক্রম। বৈশাখ মাসটিকে বছরের প্রথম মাস ধরে অবশ্য কেবল কৃষকের পরিকল্পনাই নয়, বণিকের নতুন শুরু এবং কর আদায়েরও সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হতো। 

চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। আর বৈশাখের প্রথম দিনে ভূমির মালিকেরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো।

বণিকদের হাল খাতা করার রেওয়াজ আজও আমরা দেখতে পাই। আর বৈশাখী মেলাও এখনো ভীষণ প্রাসঙ্গিক। আদতে, নৃবিজ্ঞানীরা বলেন, এই নতুন শুরুর প্রত্যয়ে উৎসব করা আর মেলার আয়োজন এই দুইটাই কৃষিভিত্তিক সভ্যতার দুইটা বড় সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য। 

মানুষের শরীরে মেদ জমলে যেমন ক্ষতিকর, সমাজেও অতিরিক্ত বৈভব ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে জ্ঞানীরা ভাবতেন। উৎসব সেই বাড়তি মেদ ঝরানোর দিন। এই দিন বিতরণের। ঝরঝরে হয়ে নতুন শুরুর। পুঁজিবাদী সমাজে আমাদের অনন্ত ভোগ আর অসীম সম্পদের লোভ দেখানো হলেও, পুরোনো সেই প্রজ্ঞা যে পৃথিবী বাঁচাতে জরুরি, তা এখন আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাই। 

আর মেলা তো মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটা। যেই অকিঞ্চিতকর প্রাণীটা গোটা দুনিয়া রাজ করে বেড়াচ্ছে, তাঁর শক্তি যুথবদ্ধতায়। মিখাইল বাখতিন তাঁর কার্নিভালেস্ক তত্ত্বে দেখান কীভাবে মেলা মানুষের সমাজকে আরও দৃঢ় ও শক্তিশালী করে। 

নতুন বছরের শুরুটা কেবল আরেকটা দিনই। কিন্তু, মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর কল্পনা। এই কল্পনা দিয়ে সে ভাবে পুরোনো সব ভুল, আবর্জনা ধুয়ে আবার নতুন করে শুরুর একটা উপলক্ষে পাওয়া গেল। এই বিশ্বাসটা যখন সামষ্টিক হয়ে উঠে তখন সমাজ সত্যি সত্যি খুব গতিশীল হয়ে উঠে। প্রতিবছর অনেকটা নতুন করে মেশিন সেটাপ দেওয়ার মতো গোটা সমাজ ঝরঝরে বোধ করে। টিকে থাকা ও এগিয়ে যাওয়ার জন্য এই প্রক্রিয়া ভীষণ জরুরি। 

দুর্ভাগ্যজনকভাবে আধুনিক সময়ে এসে নববর্ষ উদযাপনকেও আমরা কেবলই ভোগবাদে সংকুচিত হওয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ্য করি। প্রকৃতির সঙ্গে, প্রাণের সঙ্গে মিলে যে বিপুল শক্তি আহরণের চেতনা তা থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়ে কেবল রীতিস্বর্বস্ব কাষ্ঠ অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। মেলায় প্রাণের সঞ্চারের বদলে একঘেয়ে উত্তাপের সৃষ্টি হয়। উৎসব হয়ে উঠে জীবনহীন। 

পান্তার সঙ্গে ইলিশ মেশানো, কিংবা লোকজ কিছু মোটিফ নিয়ে শোভাযাত্রা অথবা গ্রামের মেলার আদলে কিছু কার্যক্রম নেহায়েতই যান্ত্রিক মনে হয়। যেন মনে হয় ক্লান্ত কেরানির বাধ্যগত অফিস করার মতো। ইতিহাস আর ঐতিহ্য উদ্ভাসিত করার বদলে জোয়ালের মতো ভারী মনে হয়। 

এখনকার দিনে সচেতন আর প্রাজ্ঞ মানুষেরা বোঝেন যে, প্রকৃতিকে দখলে নেওয়া আর অসীম ভোগবিলাসের কল্পনা আসলে আত্মহনন। মানুষ প্রাণ প্রকৃতির একটা অংশ মাত্র। আমাদের আশপাশে কুকুরটা, বিড়ালটা, বট আর অশ্বথগাছটা তো বটেই, অগণিত সংখ্যক অণুজীব আমাদের মতো জরুরি। এদের ভারসাম্য নষ্ট হলে এই পৃথিবী হুমকির মুখে পড়বে। 

ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তী এই ঝোঁককে বলেন বর্তমান-সর্বস্ব  কেন্দ্রিকতা। সমস্ত প্রাণী জগতের অবাধ মুক্তির আর তাঁদের অধিকারকে স্বীকারে করে নেয় না যে মানুষী সভ্যতা, তাঁর এক সংকীর্ণ বর্তমান থাকতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ নেই কোন। 

জীবনানন্দ সূচেতনা কবিতায় বলেছিলেন, পৃথিবীর গভীরতর অসুখ এখন। নতুন বছরে নতুন শুরুর সবচেয়ে বড় পাওয়া সম্ভবত এই আত্মচেতনা। আমাদের ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্রীয় এমনকি বৈশ্বিক চিন্তার অসুখগুলো নির্ণয় করা। এদের সঠিক নিরাময়। জীবনানন্দ কিন্তু পরের লাইনেই বলেছিলেন, মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীর কাছেই। 

সুচেতনা, এই পথে আলো জ্বেলে— এ-পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে…আমাদের মতো ক্লান্ত ক্লান্তিহীন নাবিকের হাতে গ’ড়ে দেব, আজ নয়, ঢের দূর অন্তিম প্রভাতে।

নতুন বছর, নতুন শুরু সেই প্রত্যয় মাথায় রেখেই। নতুন বছরটা এই প্রিয় ধরাকে অগ্নিস্নান করিয়ে সূচি করার নতুন প্রতিজ্ঞার। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত