হালিমের নামে আমরা আসলে কী খাই

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৮:১৯ পিএম

মাহে রমজান শুরু হলেই শহরের অলি গলি থেকে পাঁচতারকা হোটেলে কিংবা বাসাবাড়িতে, ইফতার আয়োজনে হালিম থাকবেই। রমজান ছাড়াও বছরের সব সময়ই হালিম পাওয়া যায়। ডেকচিতে লাল শালু মুড়িয়ে চলে হালিম বিক্রি, রেডিমিক্স প্যাকেটের কল্যাণে বাড়িতে বানানোও সহজ। কয়েক রকম ডাল, টুকরো মাংস, ওপরে ছড়ানো টাটকা ধনেপাতা কুঁচি আর একটু লেবুর রস। এই হালিমটাই তো আমাদের পছন্দ। কিন্তু যদি বলে হালিম নামে যে খাবারটা আমরা খাচ্ছি, সেটা আসলে হালিমই নয়! ভারতবর্ষে যাদের হাত ধরে মধ্যপ্রাচ্যের হারিসা নামের খাবারটি হালিম নামে পরিচিতি পেল, সেই নিজামদের শহর হায়দ্রাবাদের যে হালিম তার সঙ্গে আমাদের চেনা খাবারের কোন মিল নেই।

সময়টা ২০১৯ সাল। প্রথমবারের মত পূর্ণাঙ্গ সফরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল খেলতে গিয়েছে ভারতে, টেস্ট ম্যাচ হবে মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে। দিন সাতেকের জন্য সেখানেই আস্তানা গেড়েছি। খাবারের সন্ধানে গুগল আর ট্রিপ অ্যাডভাইজার ঘেঁটে মিলল 'নাফিস' রেস্টুরেন্টের নাম। এখানকার বিরিয়ানি নাকি সল্লু ভাইজানের খুব পসন্দিন্দার! বলে রাখা ভালো সালমান খানের বাবা সেলিম খানের জন্ম কিন্তু এই ইন্দোর শহরেই। মেনুতে দেখলাম হায়দ্রাবাদি হালিম, সেটাই অর্ডার দিলাম। সঙ্গে তন্দুরি রুটি। ওয়েটার একটু অবাক। কিছুক্ষণ  পর যে বস্তুটি হাজির হল তার সঙ্গে আমার কোন পরিচয় নেই। কাপ আইসক্রিমের যে  প্লাস্টিকের বাটি, তার চেয়ে একটু বড় বাটিতে বাদামি রঙের থকথকে একটা পেস্ট। তার ওপর কয়েক টুকরা ভাঁজা পেঁয়াজ ছিটানো আর একটু কাজুবাদাম ও  পুদিনা পাতা। সঙ্গে একখানা আইসক্রিমের সঙ্গে যেমন দেওয়া হয় সেই কাঠের চামচ। মুখে দেওয়ার পর যে স্বাদটা পেলাম তার সবচেয়ে সরল বর্ণনা বলা যেতে পারে মাংসের ঝাল হালুয়া! অন্তত আমার কাছে সেরকমই কিছু একটা মনে হয়েছে। থকথকে, আঠালো একটা মিশ্রণ, মাংসের সঙ্গে কিছু শষ্যদানার। একটু তেল মসলার ছোঁয়া আছে কিন্তু এই খাবারটা কোনোভাবেই আমাদের চেনা হালিমের ধারেকাছেরও কিছু নয়। এরপর ব্যাপারটা ভুলেই গিয়েছিলাম, ফের মনে পড়ল রমজান মাস শুরুর পর ইউটিউবে একটা তথ্যচিত্র দেখে। পিশতা হাউজ নামের হায়দ্রাবাদের একটি রেস্টুরেন্ট হালিম বিক্রির ব্যবসা থেকে আয় করেছে ৮০০ কোটি রুপি! তারা প্লেনে করে হালিম পাঠায় ভারতের অন্য রাজ্যে এমনকি বিদেশেও। ওমান এবং মার্কিন মুল্লুকে তাদের হালিমের দোকান।পিশতা হাউজের  'হায়দ্রাবাদি হালিম' পেয়েছে জিআই ট্যাগ। সেই রেস্টুরেন্টেরই রান্না ঘরে, বিশাল বিশাল সব পাত্রে কীভাবে হালিম রান্না করা হয় আর নানান শহরে সেসব হালিম পৌঁছে যায় সেসব নিয়েই 'বিজনেস ইনসাইডার' এর একটি তথ্যচিত্র দেখে ফের মনে হল ইন্দোরের সেই অভিজ্ঞতার কথা। তাতে করে জোরালো ভাবেই বলতে পারি, বাংলাদেশে হালিম নামে যে খাবারটা বিক্রি হয় সেটা মোটেও হালিম নয়। বাংলাদেশে যে হালিমটা পাওয়া যায় সেটা মূলত ডাল গোশত।  লাহোর, পাঞ্জাব বা বিহার অঞ্চলে যেটা মূলত রুটির সঙ্গে খাওয়া হয়ে থাকে। এলাকাভেদে উপাদানে একটু এদিক-ওদিক হলেও মূল রন্ধন প্রক্রিয়াটা একই।  হায়দ্রাবাদেও এ রকমই একটা খাবার প্রচলিত আছে 'ডালচা' নামে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় খাবারের ব্যবসায় জড়িত সিগনেচার বাই খাজানা এর প্রধান নির্বাহী অভিষেক সিনহাও জানালেন, বাংলাদেশে যে হালিমটা বিক্রি হচ্ছে সেটা আসলে হালিম নয়। তারা হায়দ্রাবাদ থেকে হালিমের বাবুর্চি নিয়ে এসে ওভাবে বানিয়েছিলেন এক বা দুই রমজানে, মানুষ  পছন্দ করেনি।

জেনে নেওয়া যাক হায়দ্রাবাদের হালিম কি করে বানানো হয়। বিজনেস ইনসাইডারের তথ্যচিত্রে দেখা যায় সারি করে, ইটের ভাটার মত বিশাল  চুলায় চড়িয়ে রাখা বিশাল সেই হাঁড়িগুলোতে কয়েক ঘণ্টা ধরে সেদ্ধ করা হয় টুকরো করা খাশির মাংস আর কাঁচামরিচ। এরপর সেই হাঁড়ির ওপর দাঁড়িয়ে বিশাল কাঠের হাতুড়ি দিয়ে থেঁতলে থেঁতলে সেই মাংসগুলোকে আক্ষরিক অর্থেই ভর্তা করেন জনা চল্লিশেক মুশকো জোয়ান। সেই মাংসের ভর্তার সঙ্গে মেশানো হয় বাসমতি চাল, গম, নানান রকম মসলা যার ভেতর আছে কয়েক কিসিমের বাদাম, শুকনো গোলাপের পাপড়ি সহ অনেক 'সিক্রেট ইনগ্রিডিয়েন্টস' । ক্রমাগত নেড়ে আর উনুনে জ্বাল দিয়ে কয়েক ঘণ্টা পর যে পদার্থটা তৈরি হয়ে, সেটা বিশাল ড্রামের মত 'থারমাল ফ্লাক্স' এ ভরে ভরে নিয়ে পৌঁছে দেওয়া হয় রেস্তোরাঁর শাখায় শাখায়। বিমানে করে এ রকম বিশাল সব 'থার্মাল ফ্লাক্স' পাড়ি দেয় ভিনদেশে বা  ভিন রাজ্যে। পরিবেশনের সময় সেই ফ্লাক্স থেকে তুলে কাজুবাদাম, লেবু,পুদিনা পাতা আর একটা ঝোলের মত তরল এক চামচ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। 

অভিনয় ছেড়ে এখন পুরোদস্তুর কনটেন্ট ক্রিয়েটর আদনান ফারুক। ডাইন আউট উইথ আদনান চ্যানেলে নিয়মিতই দেখা যায় তার খাদ্য অভিযান। হায়দ্রাবাদে গিয়ে তার হালিম খাওয়ার অভিজ্ঞতায় বলেছেন, ' এই হালিম আমাদের বাংলাদেশে হয় না। দুই একটা জায়গায় হয়তো করে, এইরকম মাংস স্ম্যাশ করা হালিম, তবে ওগুলো এত ঘন না। আমাদের বাংলাদেশে হালিমের এক্সপেক্টেশন যেমন থাকে,তার চেয়ে এটা আলাদা। বাংলাদেশের হালিমে যেমন ডালের আধিক্য, অনেক রকম ডালের মিশ্রণ, সেরকম নয়। এটা পুরোটাই একটা থকথকে জিনিস।'

হায়দ্রাবাদের নিজামের দরবারে হালিমের আগমনের গল্পটা রূপকথার মতই। নিজাম-উল-মূলক হচ্ছে হায়দ্রাবাদের শাসকের উপাধি, লাখনৌ'র যেমন নবাব। মোঘল শাসন তখন ক্রমেই দুর্বল হচ্ছে। ইউরোপিয়ানরা নজর দিচ্ছে ভারতবর্ষে। এমন গোলযোগপূর্ণ সময়ে   নিজামের জন্য দেহরক্ষী নিয়ে আসা হল আরবদেশ থেকে। হাদারামি আরব থেকে  ( আরবদের একটি গোত্র, এখনকার পূর্ব ইয়েমেনের বাসিন্দা মূলত) একদল সৈনিক ও দেহরক্ষী নিয়ে আসা হল হায়দ্রাবাদে, তাদের নিয়োগ দেওয়া হল নিজাম ও রাজপরিবারের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী এবং নিজস্ব সেনাবাহিনী হিসেবে। সোজা বাংলায় একালের 'এসএসএফ', তখন তাদের বলা হত চৌশ। এই চৌশ সেনাদের থাকার জায়গা ছিল নিজামের প্রাসাদের কাছেই। আরব থেকে আসা এই সৈনিকদের ব্যারাকে রান্না হত হারিসা, সেই হারিসার সুঘ্রাণে নিজাম হয়েছিলেন মাতোয়ারা।এরপর নিজামের পাকশালে তার বাবুর্চিরা আরবি হারিসার সঙ্গে ভারতীয় রসনার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে তৈরি করেছিলেন হায়দ্রাবাদি হালিম। যার সঙ্গে আমাদের চেনা হালিমের বিস্তর ফারাক।তাহলে বাংলাদেশের এই হালিম এল কোথা থেকে?

বাংলাদেশে নানান জায়গায়  চকবাজারের কিংবা পুরান ঢাকার শাহী হালিম -এই জাতীয় চটকদার নামে যে খাবারটা বিক্রি হয় সেটা আসলে ডাল গোশত। ফুটপাতের হালিমে ডালের সঙ্গে মেশানো হয় চর্বি বা ছাঁট মাংস, ভালো জায়গায় দেওয়া হয় রান্না মাংসের টুকরো।  নানান মসলা আর  শষ্যগুঁড়ো আর কয়েক পদের ডাল লম্বা সময় ধরে ফুটিয়ে  যে  ঘন তরলটি তৈরি হয়,তার রান্না করে রাখা মাংসের কয়েকটা টুকরো মিশিয়ে ওপরে ভাজা পেঁয়াজ, শসা কুচি, কাঁচামরিচ কুঁচি ছিটিয়ে বাটিতে পরিবেশিত খাবারটি তাই আর যাই হোক হালিম নয়। সিগনেচার বাই খাজানা'র প্রধান নির্বাহীও সেটাই বললেন, 'আমরা হায়দ্রাবাদ থেকে বাবুর্চি এনেছিলাম, এক না দুই রমজান হালিম বানিয়েছিল ওভাবে। কিন্তু ঢাকার মানুষ পছন্দ করেনি। হায়দ্রাবাদের হালিমে মাংসটা স্ম্যাশ করে দেওয়া হয় আর ঢাকায় মানুষ বাইট সাইজ মাংস পছন্দ করে। এখানে মাংসটা আলাদা করে মেশাতে হয়। এটা ঢাকার নিজস্ব হালিম'।

ঢাকার সবচেয়ে বিখ্যাত হালিমের দোকান কলাবাগানের মামা হালিম। প্রায় ৪০ বছর ধরে হালিম বিক্রি করে আসছে এই প্রতিষ্ঠানটি, যার কর্ণধার দ্বীন মোহাম্মদের পিতৃপ্রদত্ত নামটাই হারিয়ে গেছে 'মামা' নামের আড়ালে। অবশ্য শৈশবেই ভুল ট্রেনে উঠে পড়ে ঢাকায় এসে পড়েন ১০ বছরের দ্বীন মোহাম্মদ। এরপর বিহারি বাবুর্চি কাল্লু-মাল্লুর দোকানে ফুট ফরমায়েশ খাটা আর পানি টানার কাজ দিয়ে শুরু। শিখলেন রান্না। বিহারি রান্না ডাল-গোশতও শিখলেন। তার সঙ্গেই দেশিও মসলার মিশ্রণের পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে 'মামা' আবিষ্কার করলেন মামা হালিম। এখন বাংলাদেশে পথের ধারে ছোট রেস্তোরাঁয়, ভ্যানে বা রমজান মাসের জন্য অস্থায়ী ইফতারের দোকানে যে হালিম বিক্রি হয় সেসবই আসলে মামা'র ভাগনে! অর্থাৎ মামা হালিমের অনুকরণেই। যেটা আদতে হালিমই নয়।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত