মুসলিম সভ্যতার অনন্য নিদর্শন স্পেনের কর্ডোবা মসজিদ। অষ্টম শতাব্দীর শেষের দিকে খলিফা আবদুর রহমান এটির নির্মাণ শুরু করেন। ৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে খলিফা আব্দুর রহমানের ছেলে খলিফা হিশাম মসজিদটির প্রাথমিক কাজ সমাপ্ত করেন। নবম শতাব্দীতে খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমানের তত্ত্বাবধানে পরিপূর্ণভাবে মসজিদটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। তখন মসজিদের আয়তন দাঁড়ায় ১ লাখ ১০ হাজার ৪০০ স্কয়ার ফিট।
১২৩৬ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম শাসকরা স্পেনের ক্ষমতা হারালে মুসলমানদের ইবাদত বন্দেগির জন্য স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায় কর্ডোবা মসজিদের দরজা। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের গির্জায় পরিণত হয় মুসলমানদের টানা ৭০০ বছরেরও অধিক সময়ের এই মসজিদটি। মুসলমানদের ইবাদত-বন্দেগির জন্য তাতে কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। আজ পর্যন্ত সে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে।
আজও স্পেনের অন্যতম আকর্ষণ হলো ঐতিহাসিক কর্ডোবা মসজিদ। এ মসজিদই স্পেনকে পৃথিবীর অন্যতম দর্শনীয় দেশের মর্যাদায় সমাসীন করে রেখেছে। আজও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে কর্ডোবা পৃথিবীর আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হিসেবে স্বীকৃত।
১ লাখ ১০ হাজার ৪০০ বর্গফুট আয়তনের মসজিদটির নকশা করেন একজন সিরিয়ান স্থপতি। এর থামের সংখ্যা ৮৫৬টি।
এছাড়াও ৯টি বাহির দরজা ও ১১টি অভ্যন্তরীণ দরজা রয়েছে। লাল ডোরাকাটা খিলানগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় স্থাপত্যশিল্পে মুসলিম পণ্ডিতদের কথা।
এই মসজিদের থামগুলো নির্মিত হয়েছে মার্বেল, গ্রানাইট, জেসপার ও অনিক্স পাথর দিয়ে। পরে নতুন করে সংস্কার করে সোনা, রুপা ও তামাসহ অনেক মূল্যবান উপাদান ব্যবহার করে এর সৌন্দর্য আরও বাড়ানো হয়।
কর্ডোবা মসজিদ নির্মাণে সেই সময়েই তিন লাখ মুদ্রা ব্যয় করা হয়েছিল। পূর্ব-পশ্চিমে এর দৈর্ঘ্য ছিল ৫০০ ফুট। এর সুন্দর ও আকর্ষণীয় মিহরাবগুলো স্থাপিত ছিল পাথরের নির্মিত এক হাজার ৪১৭টি স্তম্ভের ওপর। মিহরাবের কাছে একটি উঁচু মিম্বর ছিল হাতির দাঁত এবং কাঠ দিয়ে তৈরি। সেগুলোর ওপর ছিল নানা ধরনের হীরার কারুকাজ। দীর্ঘ সাত বছরের পরিশ্রমে মিম্বরটি নির্মাণ করা হয়। তৈরি করা হয় ১০৮ ফুট উঁচু মিনার, যাতে ওঠা-নামার জন্য নির্মিত দুটি সিঁড়ির ছিল ১০৭টি ধাপ। মসজিদের মধ্যে ছোট-বড় ১০ হাজার ঝাড়বাতি জ্বালানো হতো। তার মধ্যে সর্ববৃহৎ তিনটি ঝাড়বাতি ছিল রুপার, বাকিগুলো ছিল পিতলের তৈরি। বড় বড় ঝাড়ের মধ্যে এক হাজার ৪৮০টি প্রদীপ জ্বালানো হতো। শুধু তিনটি রুপার ঝাড়েই ৩৬ সের তেল পোড়ানো হতো। ৩০০ কর্মচারী ও খাদেম শুধু এই মসজিদের তদারকিতেই নিয়োজিত ছিলেন।
মসজিদ নির্মাণের পর থেকে মুসলিমরা এখানে নামাজ আদায় করেছিলেন প্রায় পাঁচশ বছর। এর সুউচ্চ চারকোনা আকৃতির মিনারটি নির্মাণ করেছিলেন খলিফা তৃতীয় আবদুর রাহমান। এক সময় সুন্দর সেই মিনার থেকে ভেসে আসত আজানের ধ্বনি। কিন্তু গির্জায় রূপান্তরিত হওয়ার পর মিনারটিতে অসংখ্য ঘণ্টা লাগানো হয়েছে। বর্তমানে কর্ডোবা মসজিদে জুতা পরিহিত অবস্থায় প্রবেশাধিকার রয়েছে।
স্পেন থেকে মুসলমানরা বিতাড়িত হওয়ার পর দীর্ঘ ৭০০ বছর কর্ডোবা মসজিদে কোনো আজান ও নামাজ হয়নি। আল্লামা ইকবালের দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল এই মসজিদে দুই রাকাত নামাজ পড়ার। আল্লামা ইকবাল ছিলেন একাধারে মুসলিম দার্শনিক, বিশ্ব বিখ্যাত সাহিত্যিক, কবি, আইনজীবী, গবেষক ও আধ্যাত্মিক জনক। তিনি আধুনিক সময়ের অন্যতম মুসলিম দার্শনিক ও চিন্তাবিদ হিসেবেও অত্যন্ত প্রশংসিত ও সমাদৃত ছিলেন।
১৯৩৩ সালে স্পেন সফরকালে আল্লামা ইকবাল এই মসজিদ পরিদর্শন করেন। মসজিদে নামাজ পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও শুধু আল্লামা ইকবালকে মসজিদে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে প্রবেশের পর ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিতে বলা হয়। মসজিদে প্রবেশ করেই উচ্চৈঃস্বরে আজান দেন আল্লামা ইকবাল। দীর্ঘ ৭০০ বছর পর ওই মসজিদে এটিই ছিল প্রথম আজান। আজানের পর জায়নামাজ বিছিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন আল্লামা ইকবাল। নামাজের পর এমন এক অবস্থা সৃষ্টি হয় যে, তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। জ্ঞান ফেরার পর তিনি অশ্রুসিক্ত নয়নে মুনাজাত করেন। আল্লামা ইকবাল ৮৬ বছর আগে মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহতায়ালা তাকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।
