ঢাকায় কাতারের আমির, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক আজ

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ০৪:৫৫ এএম

কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি দুদিনের সফরে ঢাকায় এসেছেন। গতকাল সোমবার বিকেল ৫টার দিকে একটি বিশেষ ফ্লাইটে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। আমিরকে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিমানবন্দরে তাকে লালগালিচা অভ্যর্থনা জানানো হয়।

গত জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশ থেকে এটি প্রথম উচ্চপর্যায়ের সফর। এর মাধ্যমে প্রায় দুই দশক পর দেশটির কোনো আমির বাংলাদেশ সফরে এলেন। কাতার মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশ। সব মিলিয়ে কাতারের আমিরের এ সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার।

বিমানবন্দরে কাতারের আমিরের অবতরণের সময় ২১-বার তোপধ্বনি করা হয়। আমিরকে ফুলের তোড়া দিয়ে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন। এরপর তাকে অস্থায়ী অভিবাদন মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হয়। আমিরকে রাষ্ট্রীয় সম্মানের অংশ হিসেবে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এ সময় দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। পরে কাতারের আমির প্যারেড পরিদর্শন করেন।

পরে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন কাতারের আমিরকে প্রেজেন্টেশন লাইনে অপেক্ষমাণদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন এবং আমিরও তার প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতিকে পরিচয় করিয়ে দেন। রাষ্ট্রপতির সহকারী প্রেস সচিব এসএম রাহাত হাসনাত এসব তথ্য জানান।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী, বিদ্যুৎ, জ¦ালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মো. নসরুল হামিদ বিপু, তিন বাহিনীর প্রধান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, পররাষ্ট্র সচিব, রাষ্ট্রপতি কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সচিবরা এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, সফরের দ্বিতীয় দিন আজ মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করবেন কাতারের আমির। দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকের পর দুদেশের মধ্যে ১১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে কাতারের আমিরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। কাতারের আমির আজ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বঙ্গভবনের সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন ও রাষ্ট্রীয় মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন। সন্ধ্যায় বিশেষ বিমানযোগে ঢাকা ত্যাগ করবেন তিনি। আমিরকে বিমানবন্দরে বিদায় জানাবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।

কাতারের আমিরের সফর উপলক্ষে গত রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আমিরের ঢাকা সফরের সময়ে ১১টি দলিল সই হওয়ার সম্ভাবনা আছে। এর মধ্যে ছয়টি চুক্তি ও পাঁচটি সমঝোতা স্মারক।

চুক্তিগুলো হলো : দ্বৈতকর ও কর ফাঁকি পরিহার, আইনগত বিষয়ে সহযোগিতা, সাগরপথে পরিবহন, বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সুরক্ষা, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বদলি এবং যৌথ ব্যবসা পরিষদ গঠন-সংক্রান্ত। এ ছাড়া শ্রমশক্তি, বন্দর পরিচালনা, উচ্চশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যুব ও ক্রীড়া সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক প্রশিক্ষণে সহযোগিতাসহ পাঁচটি এমওইউ সই হতে পারে।

কাতারের আমিরের এ সফরের তাৎপর্য বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কাতার মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার। সেখানে প্রায় চার লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। এ ছাড়া বিপুল পরিমাণ সার্বভৌম তহবিল রয়েছে কাতারের এবং বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় বিনিয়োগের উৎস হতে পারে ওই তহবিল। বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি আমদানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসও কাতার।

হাছান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ ও কাতারের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, বন্ধুত্বপূর্ণ ও বহুমুখী। কাতার বঙ্গবন্ধুর সরকারকালীন সময়ে (১৯৭৪ সালে) বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানকারী অন্যতম মুসলিম রাষ্ট্র।

মন্ত্রী জানান, সাম্প্রতিককালে কাতারের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে কূটনৈতিক, যোগাযোগ ও আলোচনার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পরিধি সম্প্রসারণের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, জ্বালানি, বিমান চলাচল, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং গাজায় মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ফিলিস্তিনিদের পক্ষে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ‘কাতার এ বিষয়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। কাতার হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে। তাই স্বাভাবিকভাবে এ আলোচনা আসতেই পারে।’

ঢাকায় আমিরের নামে সড়ক : কাতারের আমিরের নামে ঢাকায় একটি সড়কের নামকরণ হবে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ঢাকা উত্তর সিটির মিরপুরের কালশী এলাকায় বালুর মাঠের নির্মিতব্য পার্ক এবং মিরপুর ইসিবি চত্বর থেকে কালশী উড়াল সেতু পর্যন্ত সড়কটি আমিরের নামে করা হবে।

কাতারের আমিরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট জারি করা হয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাতারের আমিরের ছবি দিয়ে ঢাকার কয়েকটি রাস্তা সাজানো হয়েছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে আগ্রহী কাতার : বাংলাদেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে চায় কাতার। এ ছাড়া বন্দর করিডর তৈরিসহ পণ্য পরিবহন নিয়েও একসঙ্গে কাজ করতে চায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি।

গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর একটি হোটেলে কাতারের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশটির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান।

বৈঠকে ঢাকার পক্ষে বাণিজ্য দলের নেতৃত্ব দেন সালমান এফ রহমান আর দোহার পক্ষে নেতৃত্বে ছিলেন কাতারের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন হামাদ আল থানি।

ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে সালমান এফ রহমান জানান, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ করতে ঢাকার দেওয়া প্রস্তাবে আগ্রহ দেখিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশ কাতার। এ ছাড়া ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার বন্দর করিডর হিসেবেও ভাবছে বন্ধুপ্রতিম দেশটি। তবে বৈঠকে জ্বালানি তেল আমদানি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে দুদেশের আগ্রহ রয়েছে কমোডিটি এক্সচেঞ্জ ও ইসলামিক শরিয়াহভিত্তিক বন্ড নিয়ে বড় পরিসরে কাজ করার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত