ফেনীতে নির্বাচন আসে, ভোট হয় না

আপডেট : ২৬ এপ্রিল ২০২৪, ০৯:৪৩ পিএম

ফেনীর পরশুরাম উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নুরুল আফসার বলেন, নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে চাই না। কথা বলে কী লাভ? যা হওয়ার তো তা হচ্ছে। অভিমান নিয়ে বলা কথাগুলোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, নির্বাচন আসছে শুনছি, কিন্তু ভোট দিতে পারি না। গত ২০ বছরে ভোট দেননি বলেও জানান। 

নুরুল আফসারের মতো আরো অনেকের সাথে কথা বলে একই রকম বক্তব্য পাওয়া গেছে। কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচন গুলোতে ক্ষমতাসীন দলের ব্যাপক প্রভাব, ভোট হলে অস্বাভাবিক ব্যবধানে জয়, বিরোধী প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে তা প্রত্যাহার করে ভোট থেকে দূরে সরে থাকছেন। এটি স্থানীয়ভাবে ভোটের ‘ফেনী স্টাইল’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে।

ফেনীতে নির্বাচন নিয়ে অসন্তোষ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ও ভোটারদের। এ নিয়ে সাধারণ মানুষ ও ত্যাগী নেতারা মুখ খুলতে নারাজ। তারা একনায়কতন্ত্রের এ শাসন অবসান করে জনগণের মতামতের সুস্পষ্ট প্রতিফলন দিয়ে নির্বিঘ্নে নিজেদের ভোট প্রদান করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

গত তিন দশকে ফেনীর নির্বাচন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যথাসময়ে নির্বাচন এলেও যথানিয়মে ভোট হয় না। কখনো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়, কখনো পেশী শক্তির জোরে ভোট কেন্দ্রে যেতে পারেন না বিরোধী প্রার্থীর সমর্থকরা।

১৯৯৭ সালে জেলায় তিনটি ইউনিয়ন পরিষদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হন। এরা হলেন ধর্মপুরে আজহারুল হক আরজু, আনন্দপুরে একরামুল হক একরাম, দাগনভূঞা সদরে মোহাম্মদ হোসেন। ২০১৬ সালে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছাড়াও ১৫টি সাধারণ সদস্য ও পাঁচটি সংরক্ষিত নারী সদস্য পদের সবগুলোতেই সরকার দলীয় প্রার্থীরা বিনা ভোটে নির্বাচিত হন।

২০১৫ সালের নির্বাচনে পৌরসভার মেয়র এবং সংরক্ষিত ও সাধারণ ওয়ার্ডের ২৩টিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়  নির্বাচিত হয়েছিল।

২০১৯ সালে উপজেলা নির্বাচনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত ৫ চেয়ারম্যান ও ৪ ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। 

পরশুরামে চেয়ারম্যান পদে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মজুমদার, ফুলগাজীতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল আলিম, ছাগলনাইয়ায় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল, দাগনভূঞায় জেলা যুবলীগের সভাপতি ও বর্তমান চেয়ারম্যান মো. দিদারুল কবির রতন ও সোনাগাজীতে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা জহির উদ্দিন মাহমুদ লিফটন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

ভাইস চেয়ারম্যান পদে ফেনী সদর উপজেলায় জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক একেএম শহীদ খোন্দকার ও ফেনী সদর উপজেলা মহিলা লীগের সভাপতি জোসনা আরা বেগম, পরশুরামে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এনামুল করিম মজুমদার বাদল, মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী সামছুন নাহার পাপিয়া একক প্রার্থী হওয়ায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।

২০২১ সালে সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রহমান বি.কম এর মৃত্যুতে শূন্য হওয়া উপ-নির্বাচনেও অন্য কেউ প্রার্থী না হওয়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। 

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জেলার দাগনভূঞা উপজেলার ফুলগাজীতে ২, পরশুরামে ১, ছাগলনাইয়ায় ২, সোনাগাজীর দুটিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পান। সদর উপজেলার ১২ ইউনিয়নে ভোটগ্রহণের আগেই চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন ৭ জন। একক প্রার্থী হওয়ায়, এসব নৌকার প্রার্থীদের নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে।

২০২১ বছরের শুরুর দিকে পরশুরাম পৌরসভায় মেয়র, সংরক্ষিত ও সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদের সবকটিতে আওয়ামী লীগের নেতারা একক প্রার্থী হওয়ায় তারাও বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। একই বছরের ১৬ জানুয়ারি দাগনভূঞা পৌর নির্বাচনে সাধারণ ওয়ার্ডের চারজন ও সংরক্ষিত তিনটি ওয়ার্ডের সবাই বিনা ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। 

৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ফেনী পৌরসভার ২৪টি সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদের মধ্যে ১০জন সাধারণ সদস্য ও ৫ জন সংরক্ষিত নারী সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। সোনাগাজী পৌরসভা নির্বাচনে ৪,৫ ও ৬নং ওয়ার্ডে তাছলিমা আক্তার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।

২০২১ সালে ফুলগাজী উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) আওয়ামী লীগের তিন চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। আনন্দপুর ইউপির মো. হারুন মজুমদার, ফুলগাজী সদরের মোহাম্মদ সেলিম ও মুন্সিরহাটের নুরুল আমিন। 

২০২২ সালে ফেনী জেলা পরিষদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান ও আট সদস্য প্রার্থী। চেয়ারম্যান পদে খায়রুল বাশার মজুমদার তপন ও ছয়টি সাধারণ সদস্য ও দুটি সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে ১ নম্বর ওয়ার্ডে ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম, ২ নম্বর ওয়ার্ডে ছাগলনাইয়া উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ওমর ফারুক, ৩ নম্বর ওয়ার্ডে জেলা যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু তালেব জেকব, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে সদর উপজেলা যুবলীগ সভাপতি নুরুল আফছার আপন, ৫ নম্বর ওয়ার্ডে দাগনভূঞা পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি খায়েজ আহাম্মদ, ৬ নম্বর ওয়ার্ডে চরছান্দিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম মানিক, সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডে জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লায়লা জেসমিন বড়মনি ও ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে দাগনভূঞা উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য শাহিদা আক্তার শেফালী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন।

২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন সোমবার ( ২২ এপ্রিল) পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় ১৯ জনের মধ্যে ১৩ জন তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন। পরশুরাম উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা ফিরোজ মজুমদার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। ভাইস চেয়ারম্যান পদে উপজেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য নুর মোহাম্মদ সফিকুল হোসেন ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বর্তমান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সামছুন নাহার পাপিয়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। ফুলগাজীতে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে মন্জুরা আজিজ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন।

ফুলগাজী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ফুলগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ হারুন মজুমদারকে সমর্থন জানিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থেকে সরে দাঁড়ালেন বর্তমান উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল আলিম। পরশুরাম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন মজুমদার। 

তিনি তার ফেসবুক আইডিতে আবেগঘন স্ট্যাটাসে তিনি ভালো থাকার অধিকার রাখেন বলে মন্তব্য করেন। একই সাথে তিনি বলেন, তোমরা যারা আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে দূরে সরে গেছো তোমাদের উপর আমার কোনো রাগ, অভিমান ও অভিযোগ নেই। তিনি ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে লাইভ ভাষণ শেষে নির্বাচন কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত আবেদন করে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করে নিবেন। একইসঙ্গে তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা ফিরোজ আহমেদ মজুমদারকে সমর্থন জানাবেন।

ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট হাফেজ আহম্মেদ বলেন, কোনো প্রার্থীকে মনোনয়ন জমায় বাধা দেয়া হয়নি। নির্বাচনে পরাজয়ের ভয়েই তারা প্রার্থী হলেও নির্বাচনে যেতে সাহস করেননি। অনেকে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেছেন। এখন মুখ রক্ষার জন্য আওয়ামী লীগের নেতা বিরুদ্ধে দোষারোপ করছেন। 

তবে তিনি মনে করেন, শেখ হাসিনার নির্দেশনা মোতাবেক উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জনগণের মতামতের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটলে বা ভোটাররা নির্বিঘ্নে নিজেদের ভোট প্রদান করলে প্রার্থীদের সাথে জনগণের দায়বদ্ধতা বজায় থাকবে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত