উত্তপ্ত মে দিবস

আপডেট : ০১ মে ২০২৪, ১২:১৯ এএম

আরও একটা মে দিবস চলে এলো। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যাদের শ্রমে ঘামে সভ্যতা গড়ে উঠেছে, মানুষের দুনিয়ায় অঢেল সম্পদ উৎপাদিত হচ্ছে তাদের নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য ক্রমাগত সংগ্রাম করতে হয়। দেশে ও বিদেশে এখনো এই সংগ্রাম চলছে বিধায় মে দিবসের গুরুত্ব অমলিন। বাংলাদেশে এই বছর মে দিবস হাজির হয়েছে সর্বকালের অন্যতম উত্তপ্ত সময়ে। গ্রীষ্মের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে বেশিই কেবল নয়, দেশ জুড়ে বয়ে যাচ্ছে তাপপ্রবাহ। এই অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন শ্রমিকরা। যারা ঘরের বাইরে বিভিন্ন কাজ করছেন, যেমন পরিবহনশ্রমিক, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক তাদের জন্য এই পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির। কারখানার তীব্র তাপে কাজ করাটাও কম ঝুঁকির নয়। তাপপ্রবাহে বেশ কিছু মানুষের মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এই তীব্র তাপপ্রবাহে বেশি সময় কাজ করলে মারাত্মক স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা রয়েছে।

অথচ, এইসব শ্রমিক অসহায়। দেশের শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে জোরালো কোনো সংগঠন নেই। তদুপরি বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশীয় মন্দায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও আগুনে দশা। করোনার আঘাতে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান যে আঘাত পেয়েছিল তা এখনো সেরে ওঠেনি। এরই মধ্যে ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ আর দেশের ডলার সংকটে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রচ- চাপে। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের ওপরে। অথচ, নিজেদের চাকরি কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো সামষ্টিক শক্তি নেই এই সব শ্রমিকের। আরেকটা মে দিবসে এসে মনে হচ্ছে শ্রমিক অধিকারের অবস্থা আরও নাজুক হচ্ছে।

বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমঘন এবং প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমশক্তির খাত হচ্ছে তৈরি পোশাক। এ খাতের শ্রমিকদের কিছুটা হলেও সামষ্টিক শক্তি আছে। তদুপরি বিদেশি ক্রেতাদের চাপে এই খাতে শ্রমিক অধিকার কিছুটা হলেও দিতে বাধ্য থাকেন মালিকরা। তথাপি এই খাতেও মজুরি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ চলছে। শ্রমিকরা যে মজুরি পান তা দিয়ে এই বাজারে জীবনধারণ করা অসম্ভব হয়ে উঠছে। এমনকি কিছুদিন আগে মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিনিধিদলও এ দেশের শ্রম পরিবেশ ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বিদেশি শক্তির এহেন অসন্তোষ দেশের জন্য দুঃখজনক।

অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অবস্থা আরও শোচনীয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, কর্মে নিয়োজিত মোট জনশক্তির ৮০ শতাংশের বেশি রয়েছে বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে। এদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই দৈনিক মজুরিতে কাজ করে। রিকশা-ভ্যান-ব্যাটারি রিকশা-ইজিবাইক চালক, নির্মাণশ্রমিক, হোটেল-রেস্তোরাঁ শ্রমিক, মোটর মেকানিক, হকার, দর্জি শ্রমিক, ক্ষুদ্র চা-দোকানের মালিক-শ্রমিক, সেলুন কর্মচারী, গৃহকর্মী, পাদুকা শ্রমিকসহ নানা পেশায় থাকা এমন পেশার শ্রমিকদের কাজ ও উপার্জনের কোনো নিরাপত্তা নেই। প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এখন আরও অনেক ধরনের পেশা যেমন রাইডার (উবার চালক), ডেলিভারিম্যান ইত্যাদি পেশায় বিপুল জনশক্তি যুক্ত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের কাছে প্রিক্যারিয়েট নামে পরিচিত এই শ্রমিকদের যেমন প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের মতো কোনো ধরনের ইন্স্যুরেন্স বা অন্যান্য সুবিধা পাওয়ার সুযোগ নেই, তেমনি একেবারেই নেই সামষ্টিক বা সাংগঠনিকভাবে অধিকার আদায়ের সুযোগ।

আর আমাদের দেশের আয়ের অন্যতম প্রধান খাত বৈদেশিক রেমিট্যান্স, তাতেও অধিকার আদায়ের সুযোগ নেই। আমাদের দেশের বেশিরভাগ শ্রমিকই স্বল্পশিক্ষিত এবং তারা প্রবাসে অল্প বেতনে মারাত্মক শারীরিক পরিশ্রম করতে বাধ্য হন। নানা রকম অন্যায়ের শিকার হলেও বেশিরভাগ সময় তারা এর প্রতিকার পান না। অথচ এদের শ্রমের ওপর ভর করেই দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। আরেকটা পহেলা মে আমাদের দেশের ও প্রবাসের শ্রমিকদের বড় সঙিন অবস্থায় হাজির হয়েছে। ফলে এই উত্তপ্ত দিনে এই মহান দিবসের চেতনা অনেক বেশি জরুরি বার্তা বহন করছে

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত