মায়ের বসুধা, সেই যে আমার মা ও একটি চিঠি

আপডেট : ১২ মে ২০২৪, ০৬:১৬ পিএম

সেই যে আমার মা

মেয়ের আর মায়ের ভূমিকা এক জীবনে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী । তবুও কোথাও একটা মিল তো আছেই । প্রথমে মেয়ের কথা এলো কেননা আমাকে একটু একটু করে মা হয়ে উঠতে হয়েছে । আর আমি তো জন্ম থেকেই মা-বাবার মেয়ে! আমাকে মেয়ে হয়ে ওঠার জন্য কোনো কসরত করতে হয়নি । তবে কতটা লক্ষী মেয়ে হয়ে উঠতে পেরেছি সে বিষয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে! ছোটবেলা থেকে দস্যিপনা করে বড় হয়েছি। আমাদের বাড়িতে শাসন করা বলে কিছু ছিল না । আনন্দ আর আনন্দ । বাবার চাকরির সুবাদে ছোটবেলায়  ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে থাকার কারণে জীবন হয়ে উঠেছিল বৈচিত্র্য আর আনন্দে ভরপুর । মায়ের সঙ্গে লুডু খেলা, ক্যারম খেলা, নাটক-সিনেমা দেখা, বই নিয়ে আড্ডা ছিল নিত্যদিনের বিষয়। তবে মায়ের সঙ্গে আমার তেমন স্বভাবের মিল ছিলো না। মা ছিলো গোছানো , পরিপাটি । ঘরে ও বাইরে । এবং বই পড়ে পড়ে দারুণ  স্মার্ট। বিশেষত সংসারের ক্ষেত্রে। বেগম পত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক ছিলো। বড় মেয়ে হওয়ার কারণেই হয়তো মাকে খুব ছোট বয়সে বিয়ে দেওয়া হয় । অথচ মায়ের আর বাকি চারবোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করার পরে বিয়ে করে সেই ষাট এবং ৭০ দশকে। এবং সকলেই চাকরি ক্ষেত্রে সফল ছিলো। আমার ভাগ্য, আমার মামা-খালারা সবাই আছে। আমার মা-টাই কেবল নেই। মা চলে যাওয়ার চারবছর পরে এই প্রথম কিছু মাকে নিয়ে লিখছি । আমার মেধাবী মা ক্লাসে বরাবর ফার্স্ট হতো কিন্তু প্রথাগতভাবে বেশিদূর পড়তে  পারেনি বলে দুঃখও ছিল। বিস্ময়ের এবং আনন্দের বিষয় হলো আম্মা প্রচুর বই পড়ত । বিছানায় গেছে অথচ সাথে কোনো বই নেই এই দৃশ্য ছিল বিরল । আর সাথে  কলকাতার রেডিওর নাটক আর গানের মহাভক্ত ছিল আম্মা। খুব সুন্দর চিঠি লিখত । নাতি নাতনিদের চিঠি লিখে চিঠির চারপাশে ছবি এঁকে দিত! ছড়া লিখে দিত । আঁকতে ভালোবাসত। পছন্দমতো ছবি পেলে  কার্বনকপি করে রেখে দিত। কখন কোন্ কাজে লাগে! কথা বলত  স্বাভাবিক উচ্চারণে। কিছুটা কিশোরগঞ্জের মতোও। কিন্তু চিঠির ভাষা ছিল রীতিমতো স্মার্ট । আমাকে নিউইয়র্কে নিয়মিত চিঠি লিখত । একবার লিখল, 'আজকাল তোর চিঠি পাইনা তেমন। মায়ের সঙ্গে চিঠিতে এত রেশনিং করলে চলে?'এই আমার মা । 

মা মাহফুজা শীলুর সঙ্গে কন্যা বসুধা

ভীষণ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করত । মায়ের যৌবনে দেখেছি বিছানার চাদর থেকে ড্রেসিং টেবিলের পর্দাটা পর্যন্ত সাদা ছিলো তার। গান শুনত প্রচুর । গলায় কিছুটা সুর ছিল । গুনগুন করত প্রায়ই। আর হলে গিয়ে হরহামেশাই  সিনেমা দেখত ঢাকা আসার পরে।  মানিকগঞ্জে থাকতেও। খুব ভালবাসত  সতীনাথ,  শ্যামল, সন্ধ্যার গান।  শুধু কবিতার প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না। আকাশবাণীর  নাটকের মহাভক্ত ছিল । ঢাকার বাইরে যখন আব্বার পোস্টিং ছিলো , সব্জি বাগান করত নিয়মিত। গরু- ছাগল-মুরগি নিয়ে ছিলো কত না ব্যস্ততা! 

যে কোনো জিনিসই  যত্ন করতে পছন্দ করত । সেটা সম্পর্ক আর শরীর যাই হোক। অনেকক্ষণ ধরে মুখে তিব্বত স্নো মাখতো।  একদিন আমাকে দেখালো  ডাবল চিন থেকে বাঁচতে হলে মুখে কীভাবে কী করতে হবে ! আমরা দুজনেই সেদিন হো হো করে হেসেছিলাম! নিশ্চয় কোথাও পড়েছে! প্রতিদিন গোসল করে পাট-ভাঙ্গা শাড়ি পরত। ইস্ত্রি করার ঝামেলায় যেত না । ধুয়ে ভাঁজ করে বালিশের নিচে রেখে দিতো। অপূর্ব সেলাই করত । আমাদের বাড়ির প্রায় আমারই বয়সী সিঙ্গারের হাতে চালানো  মেশিনটি ছিল তার কাছে বিশেষ। আমাদের জামা সেলাই করত, গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার সময় অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে আত্মীয়-স্বজনদের জন্য নিজের হাতে বেশ কিছু পেটিকোট, ব্লাউজ বানিয়ে নিয়ে যেত । সেসব তখন গ্রামে তত সহজলভ্য ছিল না । কেউ বলতো না। নিজে থেকেই নিত।  চা পাতাও বোধকরি তখন গ্রামে পাওয়া যেত না । সেটাও নিত মনে পড়ে । পাড়া প্রতিবেশীদের নিয়ে চায়ের আড্ডা বসাতো।

আরও অনেক কিছু বলা হলো না । শেষে বলি, আমার গল্পের বই আম্মাকে উৎসর্গ করেছিলাম বলে বলেছিল, 'আমি কী এর যোগ্য!' এতটা বিনয়ী হওয়া সত্যি সহজ নয়!

মায়েরা ভালো থাকুক। 

মা দিবসে বসুধার লেখা একটি চিঠি

মা দিবসে বসুধার লেখা একটি চিঠি

বসুধাকে মায়ের চিঠি

বসুধা, 
অনেকদিন মা-বাবার কাছে নেই তুমি । তবু সবটা বাড়ি জুড়ে আছো!  মা দিবসে তোমাকে আর আমার মাকে নিয়ে লিখতে বসেছি। সারাজীবনের মা দিবসের উপহার তুমি । কেননা তুমি যেদিন জন্মালে, সেদিন ছিলো মা দিবস! আমেরিকা যাওয়ার প্রথম মাসেই জানতে পেলাম আমি মা হতে চলেছি। সে জানার আনন্দের মুহূর্তটুকু মনে আছে একদম । শিল্পী পরিবারে জন্ম তোমার।  আর তুমিও জন্ম থেকেই শিল্পী হয়ে এলে। গানটা তোমার সবটা জুড়ে আছে। সেই ছোটবেলা থেকে।

তোমার বাবার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের মূল অনুষঙ্গ ছিলো কবিতা, গান, সিনেমা, নাটক। সবকিছুই আমরা উপভোগ করতাম একসঙ্গে।  এখনও তিনজনে একসঙ্গে হলে এসবই করি। এই তো গতবার যখন করোনার সময় দেশে ছিলে, আমরা সত্যজিৎ রায়ের অনেকগুলি ছবি দেখলাম একসাথে। নিউ ইয়র্কে  গেলে নীলু বা তুমি আমাকে ব্রডওয়েতে নাটক দেখাতে নিয়ে যাও। 

মনে পড়ে তোমার তখন মাত্র দেড় মাস বয়স, আমরা সুমন চট্টোপাধ্যায়ের গান শুনতে ( তখনও  কবীর সুমন নন) গিয়েছিলাম । নিউইয়র্কে তখন থাকি আমরা। তোমার বাবা বুকে বেঁধে রেখেছিল তোমাকে।  তুমি একটুও শব্দ করনি। আশেপাশের সকলে অবাক হয়ে গিয়েছিল।

গাড়িতে সুমনের 'ছোট বড় মিলে' ক্যাসেটটি সবসময়ই প্রায় বাজাতাম ।  কারণ তুমি যে কোনো সুরই পছন্দ করতে । সে সুকুমারের 'আবোল তাবোল'  কী সুমনের গান। আর একটু বড় হলে আধো উচ্চারণে সুমনের এই গানটা গাইতে ' স্কুলের ব্যাগটা বড্ড ভারী, আমরা কি আর বইতে পারি ?  এও কি একটা শাস্তি নয় ? কষ্ট হয় । কষ্ট হয় ।' তখন পর্যন্ত তোমার নিজের স্কুল জীবনই  শুরু হয়নি ! 

তুমি এ লেভেল পর্যন্ত দেশে ছিলে । নিউইয়র্কে জন্ম ও বড় হওয়া তোমার দেশে প্রথম প্রথম মানিয়ে নিতে বেশ কষ্ট হয়েছিল । তবু তোমাকে দেখতাম কাজিনদের  সঙ্গে কী সহজে মিশে গিয়েছিলে । তোমার দাদার বাড়িতে অনেকেই গান করেন। নাটক করেন। তুমি জানতে না ওরা কতটা পরিচিত!  একদিন স্কুল থেকে এসে বললে, জানো মা স্কুলের সবাই বাবা,  বড়চাচু, বড়চাচিকে চেনে ! এসব নিয়ে তোমার মধ্যে ভালো লাগা  নিশ্চয়ই ছিল তবে অহংকার করতে দেখিনি! এ সময়ের ছেলেমেয়েদের ভাষায় (ভাব নিতে) দেখিনি । কী ভাগ্য, সেসব তুমি শেখোনি। 

তুমি নিজে এখন গান লেখ,  সুর দাও , কন্ঠ দাও। তোমার গানের কথা তোমার  দাদু শুনে বলেছিল, এটাই তো হওয়ার কথা । কোন্ বাড়ির মেয়ে দেখতে হবে না ! গান নয় তবে লেখালেখির চর্চ্চাটা অবশ্য তোমার নানাবাড়ির দিকে বেশ আছে।  একটা মজার কথা মনে পড়ল লিখতে লিখতে । এটা কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে, তবে তুমি যে গড়পরতা বাচ্চাদের মতো নও, সেটা সেদিন মনে হয়েছিলো। তখন আমরা কুইন্সের এলমহ্রাস্টে থাকি । তুমি প্রি স্কুলে যাও । সময় হয়ে গেছে। স্কুলে যাওয়ার জন্য তোমাকে ডাকছি । উঠছো না । যখন উঠলে স্কুল তখন শুরু হয়ে গেছে । আমি বললাম,  ' বসুধা এখনই তুমি ফাঁকিবাজি করছো ?' তুমি খুব বিস্মিত হয়ে বলেছিলে,  কী বলছো মা? আমি ইভেন ফাঁকিবাজির মানে জানিনা, সেটা কী করে করতে পারব!' এটাই আমার তুমি । সত্যবাদী,  কখনও প্রতিবাদী । 

তোমার সঙ্গে ভ্রমণ খুব আনন্দের । একবার তুমি আর আমি সিঙ্গাপুর গেলাম আর একবার কলকাতায়।  তুমি সিঙ্গাপুরে বইয়ের দোকানে বসে অনেকক্ষণ ধরে বই দেখলে। কিনলে। এই তোমাকে দেখতে খুব ভালো লেগেছিলো আমার । তুমি বেশ কয়েকটি ভাষা শিখেছ। বাংলা, ইংরেজি, স্প্যানিশ, কিছুটা ফরাসি। কী মজা না! মা তো ইংরেজিটাই ভালো করে শিখতে পারলাম না! 

বসুধা, মা হিসেবে চাই তোমার অর্থপূর্ণ জীবন হোক।  বড় চাকরি, শান শওকত , টাকার  পেছনে ছোটা তুমি শেখোনি।  তোমার আগ্রহ জীবনের আরও বড় কোনো অর্থের প্রতি। আর সাহস তো তোমার বরাবরই বেশি । সে শুধু মা জানি। 

বসুধা, নিরাপদ পৃথিবী তৈরিতে ভূমিকা রেখো।  নিজেও নিরাপদ থেকো । আর গানটা থাকুক তোমার প্রাণের সঙ্গী হয়ে। 

দীর্ঘায়ু হও।
মা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত