মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ফেল করেছে বলে গালমন্দ করবেন না : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ১৩ মে ২০২৪, ০৪:২৭ এএম

ছেলেমেয়ে ফেল করেছে বলে তাদের গালমন্দ না করার এবং সান্ত্বনা দিয়ে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করানোর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ফেল করেছে বলে গালমন্দ করবেন না। ফেল করেছে এতেই তো তাদের মনঃকষ্ট। তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখাতে হবে। পড়াশোনার দিকে আরও মনোযোগী করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল রবিবার সকালে গণভবনে ডিজিটালভাবে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা-২০২৪-এর ফল প্রকাশকালে প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন। খবর বাসস

এর আগে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সম্মিলিত ফলের পরিসংখ্যান প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। এরপর ৯টি সাধারণ, একটি মাদ্রাসা বোর্ডসহ ১০টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং কারিগরি বোর্ডের মহাপরিচালক প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিজ নিজ বোর্ডের ফলাফলের পরিসংখ্যান হস্তান্তর করেন। তার সরকার শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশে বিশেষ করে মুখস্থ শিক্ষার ওপর নির্ভরতা কমাতে পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনছে বলে জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে শুধু মুখস্থ বিদ্যা শিখবে না। একটা শিশুর ভেতর যে মেধা ও মনন থাকে তাকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া। তার ওই মেধা দিয়েই যেন সে এগিয়ে যায় সেদিকে লক্ষ রেখে আমাদের শিক্ষা কারিকুলাম এবং শিক্ষা দেওয়ার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে।’

প্রি-প্রাইমারি শিক্ষাও আওয়ামী লীগ সরকারই শুরু করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ সময় বাচ্চাদের হাতে খেলনার মাধ্যমেই অনেক কিছু তৈরি করা বা অনেক কিছু শেখার সুযোগ রয়েছে। তাদের শুধু বই দিয়ে বসিয়ে না রেখে খেলাধুলার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া, যেমন ফ্লোরে যদি একটি মানচিত্র থাকে যেখানে মহাদেশ ও মহাসাগর থাকল, সেখানে বাচ্চাদের শেখানো যে একটা জায়গা থেকে আর একটা জায়গায় তোমরা লাফ দিয়ে যাও। তাহলে খেলতে খেলতেই সে ওই নামগুলোও জেনে যাবে। কাজেই খেলার মাধ্যমে তাদের শিক্ষা যেন প্রাথমিক পর্যায়ে আসে সেটা করে দেওয়া যায়। তা করলে আমার মনে হয় তাদের কতগুলো মহাদেশ আর মহাসাগর তা মুখস্থ করতে হবে না।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘দেখবে, খেলবে, বিভিন্ন রং দেওয়া হবে এক একটায়, সেভাবেই তারা শিখে যাবে। এ ধরনের অনেক কিছু আমাদের করতে হবে বলে আমি মনে করি।’

এ বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হওয়ায় আনন্দ অনুভূতি ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি মনে করি শিক্ষাক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা এবং ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে অভিভাবকদেরও একটা আগ্রহ থাকবে যে তাদের ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু সাধারণ বিএ-এমএ পাস করবে তা নয়, সঙ্গে সঙ্গে কারিগরি শিক্ষা, বিজ্ঞানপ্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তিসহ সার্বিকভাবে শিক্ষিত হওয়ায় জন্য যা যা দরকার সে ব্যবস্থা নিতে হবে। অর্থাৎ বিশ্ব পরিমণ্ডলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মতো শিক্ষাব্যবস্থাই আমরা প্রবর্তন করতে চাই।’

অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী ও শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বেগম শামসুন নাহার বক্তব্য দেন।

প্রধানমন্ত্রী ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশের জন্য সংশ্লিষ্টদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘অতীতে এমনও দেখা গেছে যে মাসের পর মাস ফল প্রকাশ হয়নি। কিন্তু আমরা এটাকে একটি নিয়মের মধ্যে নিয়ে এসেছি। এমনকি কভিড-১৯-এর নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সময়মতো ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছিল।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৯৬ সালে সরকারে এসে তিনি সাক্ষরতার হার পেয়েছিলেন মাত্র ৪৫ ভাগ। তার সরকার সে সময় নিরক্ষরতামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে জেলাভিত্তিক সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি এবং বয়স্ক শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করে। ফলে ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশে সাক্ষরতার হার উন্নীত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে এই প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়। ফলে ২০০৯ সালে সরকার গঠন করার পর তিনি দেখেন যে সাক্ষরতার হার কমে আবার ৪৪ শতাংশে নেমে এসেছে। পুনরায় উদ্যোগ নেওয়ায় আজ সাক্ষরতার হার বেড়ে ৭৬ শতাংশে পৌঁছেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল পর্যালোচনাতেও দেখেছেন অধিকাংশ শিক্ষা বোর্ডেই ছাত্রীদের অংশগ্রহণের হার বেশি। এটা খুশির খবর। কারণ আমরা নারী শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। আর জাতির পিতাও স্বাধীনতার পর নারী শিক্ষা প্রাথমিক পর্যন্ত অবৈতনিক করে যান। সেটাকে এখন এসএসসি পর্যন্ত আমরা করতে পেরেছি। ’

এ সময় ছাত্রসংখ্যা কম কেন তার কারণ খুঁজে বের করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এখন থেকে উদ্যোগ নিতে হবে যে কী কারণে আমাদের ছাত্র কমে যাচ্ছে। পাসের হারের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরাই অগ্রগামী। সেটা খুব ভালো কথা, তারপরও আমি বলব, এ ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে।’ তিনি বিবিএসও তাদের গণনার সময় এ বিষয়টি দেখতে পারে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।

শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক প্রবণতা ‘কিশোর গ্যাংয়ের’ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ‘কেন ছেলেমেয়েরা এ পথে যাবে? এটা তো আমাদের জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। যখন তাদের পড়াশোনা করা দরকার বা বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষার লাইনে যেতে পারে সে ক্ষেত্রে এই লাইনে কেন গেল সেটা আমাদের বের করা দরকার। এদের এখান থেকে বিরত করা ও একটা সুস্থ পরিবেশে নিয়ে আসতে যা করা দরকার তা আমাদের করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী এ বছরের এসএসসি পরীক্ষায় কৃতকার্যদের পাশাপাশি তাদের বাবা-মা, অভিভাবক, শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও অভিনন্দন জানান। আর যারা কৃতকার্য হতে পারেনি তাদের মন খারাপ না করতে বলেন। তিনি বলেন, ‘কারও জীবনে একবারের জন্য এমন ঘটনা আসতে পারে, কিন্তু তারা যদি উদ্যোগ নেয় এবং মনোযোগী হয় তাহলে আগামীতে পাস করতে পারবে। কাজেই সেই আস্থা নিয়েই তাদের চলতে হবে।’

সারাক্ষণ ‘পড়’ ‘পড়’ বলে চাপ না দিয়ে পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গ দেওয়ার জন্যও অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, ‘এখনকার ছেলেমেয়ে ডিজিটাল যুগের। এমনিতেই তাদের মেধা অনেক বেশি। তাদের সেই মেধা বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। আমরা যতই সুযোগ সৃষ্টি করব, ততই তাদের মেধা আরও বিকশিত হবে।’

শিক্ষার চলমান কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘শিক্ষিত জাতি ছাড়া কোনো জাতির দারিদ্র্যবিমোচন সম্ভব নয়। এটা আমি বিশ্বাস করি।’ আজকের ছেলেমেয়েরাই আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশের স্মার্ট সিটিজেন হবে এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত