মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কোনদিকে এগুচ্ছে ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ

আপডেট : ১৪ মে ২০২৪, ১২:৫৬ এএম

টানা দুই বছর ধরে সম্মুখযুদ্ধরত রাশিয়া-ইউক্রেন। রাশিয়ার বাহিনীকে পিছু হটানোর পাশাপাশি নিজেদের হারানো ভূখণ্ড ফিরে পেতে কিয়েভের এ লড়াই। ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি রয়েছে। তাই ওই অঞ্চলে যুদ্ধ করতে গিয়ে সুরক্ষা পাওয়া তুলনামূলক কঠিন। সেখানে রুশ বাহিনী নিজেদের প্রতিরক্ষার জন্য কয়েক মাস সময় পেয়েছে। তাই বেশ গভীরভাবে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়তে পেরেছে তারা। উন্মুক্ত প্রান্তরগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে বারবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ইউক্রেনীয় সেনারা। কিন্তু সফলতা এসেছে সামান্যই। গত সপ্তাহে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ৮০০ দিনের মাইলফলক স্পর্শ করল। কিন্তু এই সংঘাত বন্ধে উল্লেখযোগ্য কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যত দিন গড়াচ্ছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এর প্রতিঘাত ভোগ করছে।

ওয়াশিংটনে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ইউক্রেন নিয়ে তাদের নীতি কী হবে, তা নিয়ে বিবাদ চলছে। অনেক বিতর্কের পর গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ইউক্রেনকে ৬১ বিলিয়ন সামরিক সহায়তা বিল অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু এই সহায়তা সত্ত্বেও তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক। যুক্তরাষ্ট্র যে ৬১ বিলিয়ন ডলারের বিল অনুমোদন করেছে, তার ২৩ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য, তাদের ফুরিয়ে যাওয়া রসদ সরবরাহের কাজে। ১৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ কিনতে। ১১ বিলিয়ন দেওয়া হবে ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ডে জোগাতে এবং ইউক্রেনের সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দাদের তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা উন্নত করতে। আর ৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে বেসামরিক খাতে। সামরিক সহায়তা অনুমোদনের খবরে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুই পার্টিকেই ধন্যবাদ জানিয়েছেন। অন্যদিকে মস্কোয় ক্রেমলিন মুখপাত্রের অবস্থান ছিল পুরোপুরি ভিন্ন। দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ইউক্রেনকে নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত এই সংঘাতকে আরও খারাপ দিকে নিয়ে যাবে। পেসকভ বলেন, এই সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হতে পারে, কিন্তু ইউক্রেনের ক্ষতি হবে।

গত আটশ দিনের সংঘাতের ভয়াবহ স্মৃতি কিয়েভের সরকারি কার্যালয় ও রাস্তায় প্রতিধ্বনিত হয়ে চলছে, তা বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়, এই যুদ্ধ কতটা দুর্ভোগের জন্ম দিয়েছে। সুইজারল্যান্ডের নেতৃত্বে একটি শান্তি সম্মেলন করার আয়োজন চলছে। জুন মাসে বার্গেনস্টোক রিসোর্টে সম্মেলনটি হওয়ার কথা। সেখানে পোপ ফ্রান্সিসকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এই সম্মেলনে আসা প্রতিনিধিরা ইউক্রেনের জন্য একটা ন্যায্য ও টেকসই শান্তির পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে। বিভিন্ন দেশ থেকে যাওয়া ১৬০ জনপ্রতিনিধি ইউক্রেন সংঘাত বন্ধের উদ্দেশ্যে নেওয়া আগের পরিকল্পনাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক আইনের ওপর ভিত্তি করে একটা শান্তি পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সম্প্রতি সুইস সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে, রাশিয়াকে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হবে না। সুইস সরকার তাদের এই অবস্থানের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছে, রুশ সরকারের অংশগ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহের ঘাটতি রয়েছে। ইউক্রেন সংঘাতের মতো বিতর্কিত ইস্যুতে কূটনৈতিক সম্পর্কের যে জটিলতা, তার মধ্যে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে একটা সংলাপের আয়োজন করা অনেক কঠিন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়াকে রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট রুশ নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে।

ইউক্রেন সংঘাত সমাধান, এ মুহূর্তে অধরা একটা বিষয়। সংঘাতের ধরনটি দীর্ঘস্থায়ী হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়ে চলেছে। সম্প্রতি সরকারিভাবে ফ্রান্স প্রথম ইউক্রেনে সেনা পাঠাল। যুক্তরাষ্ট্রও ন্যাটো সেনাদের ইউক্রেনে পাঠানোর বিরোধিতা করে আসছে। এখন ফ্রান্স ইউক্রেনে সেনা পাঠানোয় প্রশ্ন উঠেছে ইউক্রেন যুদ্ধে ন্যাটোর সম্পৃক্ততা নিয়ে রাশিয়ার দিক থেকে যেটাকে সতর্করেখা বলা হচ্ছে, তা অতিক্রম করা হলো কি? এবং রাশিয়া কি এটাকে ইউক্রেনের সীমান্তের বাইরে বৃহত্তর যুদ্ধ হিসেবে দেখবে কি না... ইত্যাদি। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে অনেক সেনা পাঠানোর সক্ষমতা নেই ফ্রান্সের। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল থেকে সম্প্রতি ফরাসি সেনাদের চলে আসতে হয়েছে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করে নিয়েছেন রাশিয়ান সেনারা। আফ্রিকার ফরাসিভাষী দেশগুলোর ওপর ফ্রান্সের যে নিয়ন্ত্রণ ও সেখান থেকে আসা সম্পদের যে প্রবাহ, সেটা বিপ্লব ও বিদ্রোহের কারণে ভেঙে পড়েছে। সরাসরি হোক আর ভাড়াটে বাহিনী ভাগনার গ্রুপের মাধ্যমেই হোক, এ ক্ষেত্রে রাশিয়ারও একটা সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা আছে। আর এখন এটা প্রমাণিত যে এসব বিদ্রোহ ও বিপ্লবের পেছনে ভøাদিমির পুতিনের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এই অপমানের আঁচ এলিসি প্রাসাদে গিয়েও লেগেছে।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন কিয়েভ সফরে গিয়ে বলেছেন, ইউক্রেনের যত দিন প্রয়োজন হবে, যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে প্রতি বছর ৩৭৫ কোটি মার্কিন ডলার করে দেওয়া হবে। ক্যামেরন বলেন, রাশিয়া যেভাবে ইউক্রেনের অভ্যন্তরে হামলা করছে, তাতে ইউক্রেন কেন আত্মরক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে, তা সহজে অনুমান করা যায়। কিন্ত ডেভিড ক্যামেরনের মন্তব্যের নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। মস্কো বলেছে, আরেকটি অত্যন্ত বিপজ্জনক বিবৃতি। ক্রেমলিন মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, ইউক্রেন সংঘাত ঘিরে এটি সরাসরি উত্তেজনা ছড়াবে, যা ইউরোপীয় নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি সৃষ্টি করবে। পেসকভ, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর বক্তব্যেরও নিন্দা জানান। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে বলেন, ইউক্রেনে রাশিয়া যদি জয়লাভ করে, তবে ইউরোপে কোনো নিরাপত্তা থাকবে না। তবে এ মুহূর্তে স্থিতাবস্থা বজায় রাখাটাই ইউক্রেন সংঘাতের একমাত্র টেকসই বিকল্প বলে বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত