উন্নয়নে প্রবীণরা কোথায়?

আপডেট : ১৫ মে ২০২৪, ১১:১৭ এএম

উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দেশে দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে প্রবীণ ব্যক্তির সংখ্যা। অথচ বর্ধনশীল প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য এদেশে আক্ষরিক অর্থেই পরিষেবা অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। যদিও এই প্রবীণ জনগোষ্ঠী এক সময় দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে এবং স্ব স্ব পরিবারে যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। উন্নত দেশগুলোতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প রয়েছে। আমরা এক্ষেত্রে বেশ পিছিয়ে রয়েছি। অথচ এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য বর্তমান সরকারের যে অভীষ্ট লক্ষ্যগুলো রয়েছে, তার মধ্যে সবার জন্য সমতাভিত্তিক উন্নয়ন অন্যতম। অর্থাৎ, কাউকে পেছনে ফেলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বলছে, ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে ৬০ বছর ও তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা হবে ৩ কোটি ৬০ লাখ, যা হবে মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ। দেশে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের নির্ভরতা অনুপাত ২০২২ সালে ছিল ৮.৬ শতাংশ যা ২০২৩ সালে বেড়ে হয় ৯.৪ শতাংশ। বর্তমানে প্রবীণদের জন্য মাসিক বয়স্কভাতা ৬০০ টাকা এবং মোট সুবিধাভোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৮ লাখ ১ হাজার টাকা। অর্থাৎ, এই জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক কোনো না কোনো রাষ্ট্রীয় সহায়তার অধীনে আছেন। বলা বাহুল্য, আওয়ামী লীগ সরকার দেশে বয়স্কভাতাসহ আরও নানাবিধ সামাজিক সুরক্ষা ভাতা চালু করেছে। তবে, বয়স্ক ব্যক্তিদের নানামুখী চাহিদার বিপরীতে এই ভাতা একেবারেই অপ্রতুল। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরেই প্রবীণদের সংখ্যা ৬.১৪ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৪ লাখের বেশি হয়েছে। এ বিপুল সংখ্যক মানুষ যারা বার্ধক্যে পৌঁছাতে শুরু করেছেন, তাদের দেখভালের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেই বললেই চলে । 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ২৬ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছেন, এবং ৬২ শতাংশ রয়েছেন অপুষ্টির ঝুঁকিতে। গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রবীণদের মধ্যে যারা সঙ্গী ছাড়া জীবন কাটাচ্ছেন তাদের মধ্যে অপুষ্টি এবং অপুষ্টির ঝুঁকির মাত্রা ছিল যথাক্রমে ২৮.৬ এবং ৬৫.৩ শতাংশ। যাদের মানসিক স্বাস্থ্য স্বাভাবিক (১২.৫ শতাংশ) তাদের তুলনায় যারা হতাশাগ্রস্ত (৩৯.৩ শতাংশ) তাদের মধ্যে অপুষ্টির মাত্রা বেশি দেখা গেছে। ভারতের মুম্বাইয়ে প্রবীণদের ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে বৃদ্ধাশ্রম বা ওল্ডহোমে যেসব বয়স্ক ব্যক্তি থাকেন, তাদের চেয়ে ছেলেমেয়ে বা আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে থাকা বৃদ্ধরা বেশি বিন্নতা ও হতাশায় ভোগেন। ওই একই গবেষণায় বলা হয়েছে, ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে হয়তো বয়স্করা থাকতে চান কিন্তু প্রবীণরা তাদের বয়সীদের সঙ্গেই বেশি কোয়ালিটি টাইম কাটান। এক্ষেত্রে, গৃহবাসী কিন্তু একাকিত্বের শিকার হওয়ার চেয়ে বয়স্করা প্রবীণনিবাসেই ভালো থাকেন। কারণ সেখানে নিজের সময়ের মানুষের সঙ্গে সামাজিক গল্প থাকে। ফলে, একটি বিষয় সামনে চলে আসছে, আর তা হলো, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অনেকেই নিজেদের পরিবারে আর অনেকেই ওল্ডহোমে সমবয়সীদের সঙ্গে থাকতে পছন্দ করেন।

প্রবীণদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বার্ধক্যে মানুষ সবচেয়ে বেশি যে সমস্যার মুখোমুখি হন, তাহলো স্বাস্থ্যসেবার অপর্যাপ্ততা। বয়স্কদের স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা কনসালটেন্ট ড. আমিনুল হক কভিড-১৯ অতিমারীর সময়ে বিবিসিকে এক সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন কী কারণে প্রবীণদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ষাট বছর বয়সের পরে শরীরে ক্রমাগত নানা শারীরিক ও মানসিক রোগ জন্ম নিতে থাকে। প্রবীণদের ‘শারীরিক দিক দিয়ে যেমন দুর্বলতা দেখা দেয়, তেমনি রক্তশূন্যতা, ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার, ক্যানসার, কিডনির রোগ, আর্থ্রাইটিস এসব ধরা পড়ে। এখন অল্প বয়সীদের যেভাবে চিকিৎসা করা হয়, বয়স্কদের সেভাবে চিকিৎসা করা যায় না।’ ড. হক বয়স্কদের স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা (জেরিয়াট্রিক) বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবায় জেরিয়াট্রিক মেডিসিন বিষয়ে পড়াশোনার কোনো ধরনের ব্যবস্থাই নেই। এমনকি, সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যন্ত এই বিষয়ে আলাদা কোনো ইউনিট নেই। তবে, একটি প্রবীণ হিতৈষী সংঘে জরা বিষয়ক একটি ইনস্টিটিউট (Institute of Geriatric Medicine) ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় । এখানে আরেকটি কথা বলা জরুরি যে প্রবীণ ব্যক্তির শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক সুস্থতাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। পাশ্চাত্য সমাজের দিকে তাকালে আমরা দেখি যে, সেখানে বয়স্ক ব্যক্তিদের মূল সমস্যা হলো তারা অবসাদগ্রস্ত এবং একাকিত্বে ভুগেন। আমাদের এখানেও সে রকম একটি পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে মনে হয়। দেখা গেছে, অনেক বয়স্ক ব্যক্তির মূল সমস্যা তাদের সামাজিক মেলামেশার অভাব। তাদের সঙ্গে কথা বলার কেউ নেই। তাই, ছোটখাটো সমস্যা তাদের অস্থির করে তুলতে পারে। এই বিষয়টিই উঠে এসেছে নিউ ইয়র্কের মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের একটি প্রকল্পে। নিউ ইয়র্ক শহরে বয়স্ক ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করতেন এমন একজন সমাজকর্মী হলেন মারিয়া আলেহান্দ্রো (Maria Alejandro)।  তিনি বলছেন, রোগীরা তাদের একাকিত্বের অবসান ঘটাতে নিউ ইয়র্কের Martha Stewart Center For Living-এ হাজির হচ্ছেন। এরা একত্রে বসে নিজেদের খাবার খেতে চান। সেখানকার ডাক্তারদেরও এই বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে যে বয়স্ক ব্যক্তিরা একাকিত্ব ঘুচাতে হাসপাতালে আসতে পারেন। এতে করে অনেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে, কথা হবে, আর সেই অনুঘটকটি তাদের সুস্থ থাকতে সহায়তা করবে। মারিয়া বলেছেন, এই সেন্টারে আগত প্রবীণ/ বয়স্ক ব্যক্তিদের যে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে তা হলো একসঙ্গে যে কাজগুলো করা যায়, সেগুলো করুন। একসঙ্গে সাঁতার কাটুন, হাঁটুন, খাবার গ্রহণ করুন, ঘরোয়া খেলা খেলুন, সোজা কথা বাড়ি থেকে বের হোন, ইত্যাদি।

দেশে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় পরিচালিত ছয়টি প্রবীণ নিবাস আছে। এই প্রবীণ নিবাসগুলোতে ৫০ জন করে থাকার সুযোগ রয়েছে। এদিকে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৮৫টি শিশু পরিবার আছে। এর মধ্যে ছেলেশিশুদের জন্য ৪৩টি পরিবারে ১০ জন করে পুরুষ ও মেয়েশিশুদের জন্য যে ৪১টি পরিবার সেখানেও ১০ জন করে নারী প্রবীণ থাকতে পারেন। এই ব্যবস্থা অত্যন্ত অপ্রতুল। এছাড়া বেসরকারি উদ্যোগে দেশে বেশ কয়েকটি বৃদ্ধাশ্রম আছে সাভার, গাজীপুরসহ আরও কিছু এলাকায়। নানা কারণে একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়ার পর নিউক্লিয়ার পরিবারব্যবস্থা সমাজে মূল ইউনিটে পরিণত হয়েছে। এতে সমষ্টিগত কল্যাণের দিক থেকে বয়স্ক ব্যক্তিদের সুবিধা না কি অসুবিধা হয়েছে, তা গবেষণার দাবি রাখে। তবে, তারা যে নানা রকম বিপত্তিতে পড়ছেন, তা মাঝে মাঝেই সংবাদপত্রের শিরোনামে আসছে। প্রবীণদের বেশিরভাগই কোনো কাজকর্মে থাকেন না আর অনেকেই স্বাস্থ্যগত কারণে কাজ করতে পারেন না। তাই, অনেক দেশের মতোপ আমাদের দেশেও বয়স্কদের অসহায়ত্বের কারণ হলো অর্থনৈতিক সংকট, অপ্রতুল চিকিৎসা ও তাদের মানসিক এবং সামাজিকীকরণের সমস্যা। চিকিৎসা খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা অনিরাপদ বোধ করেন। পাশাপাশি বেকারত্ব বাংলাদেশের প্রবীণদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। আমাদের সমাজব্যবস্থায় বয়স্কদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগানোর মতো অবকাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। 

বয়স্কদের সুস্থতা নিশ্চিতে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে বয়স্ক ব্যক্তিদের সমস্যাগুলো খুঁজে বের করতে হবে। তাদের নানাবিধ সেবা ও মানসিক সহযোগিতা দেওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি নিতে হবে। এই প্রতিষ্ঠান প্রথমে উপজেলা পর্যন্ত গড়ে তোলা যেতে পারে। অবহেলিত হওয়ার পরও আমাদের বয়স্ক ব্যক্তি অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবারেই থাকেন। আমরা দেখেছি, করোনা মহামারীর সময়ে মা-বাবাকে দূরে ফেলে আসাসহ অন্যান্য অবহেলার বিষয়টি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। নিউক্লিয়ার পরিবারগুলো ও নতুন প্রতিষ্ঠান মিলে দেশের প্রবীণ ব্যক্তিদের যৌথভাবে সুস্থ রাখতে পারে। 

১. অনেক উপজেলাতেই এখন বেসরকারি এতিমখানা, মাদ্রাসা ইত্যাদি রয়েছে। এখন সরকারিভাবে এতিমখানার সঙ্গে প্রবীণ নিবাস গড়ে তুলতে হবে। এতে প্রবীণরা পাবেন সন্তান, আর এতিম শিশুরা পাবে অভিভাবক।

২. যেসব প্রবীণ ব্যক্তি অধিক জরাগ্রস্ত, তাদেরসহ সব দুস্থ প্রবীণ ব্যক্তিকে সর্বজনীন পেনশন স্কিমের সুবিধা দিতে হবে। যারা একাকী থাকেন, তাদের প্রবীণ নিবাসে রাখতে হবে।

৩. শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। সমস্যা চিহ্নিত করার পর বয়স্ক ব্যক্তিদের সুস্থতা নিশ্চিত করতে ব্যবস্থা, যত্ন-আত্তি ইত্যাদি নিতে হবে।

৪. অন্তত জেলা শহরগুলোতে একটি করে জরা হাসপাতাল নির্মাণ করতে হবে। হাসপাতাল নির্মাণের আগ পর্যন্ত জেনারেল হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতে জরা ইউনিট খুলতে হবে।

৫. করপোরেট সোশ্যাল রেস্পনসিবিলিটি প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে করপোরেট প্রতিষ্ঠানের দানের একটি অংশ সুনির্দিষ্টভাবে প্রবীণ ব্যক্তিদের কল্যাণে খরচের জন্য ধার্য করতে হবে। 

৬. প্রবীণদের জন্য সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে। তাদের খাবারে বিভিন্ন ধরনের ফল, সবজি, গোটা শস্য, চর্বিহীন প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত স্ন্যাকস এবং অত্যধিক লবণ গ্রহণ করতে দেওয়া যাবে না।

৭. আমাদের বয়স্ক ব্যক্তিরা যাতে পর্যাপ্ত সময় ঘুমোতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতি রাতে ৭/৮ ঘণ্টা মানসম্পন্ন ঘুমের প্রতি লক্ষ রাখতে হবে।

প্রবীণ ব্যক্তিদের সুস্থতার জন্য কতগুলো উদ্যোগ সম্ভব হলে তাদের নিজেদেরই নিতে হবে। এগুলো হলো: নিয়মিত ব্যায়াম করা, নতুন কিছু শেখা (এতে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো থাকে), নতুন লোকজনের সঙ্গে পরিচিত ও বন্ধুত্ব করা, শখ পূরণ করা, দায়িত্ব কাটছাঁট করা, অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস এড়িয়ে চলা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। আপনার শরীর ও মনকে ঠিক রাখতে যোগ ব্যায়াম, মেডিটেশন, তাই চি, সাঁতার, হাঁটা, দৌড়ানো এবং সক্ষম ব্যক্তিরা সাইকেল চালাতে পারেন। এ সবের বাইরে আপনার পছন্দের যে কোনো কায়িক শ্রমের চেষ্টা করুন।

প্রবীণ ব্যক্তিরা আমাদেরই মা-বাবা, দাদা-দাদি বা নানা-নানি। এ ছাড়াও রয়েছেন এক বা একাধিক আত্মীয়স্বজন। ধর্মগ্রন্থগুলোতে মা ও বাবা বা আত্মীয়স্বজন, পাড়া-পড়শির খোঁজ রাখতে বলা হয়েছে। ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর’ কথাটি সর্বদা মনে রাখতে হবে। আমাদের একান্নবর্তী পরিবার হয়তো ফিরে আসবে না। কিন্তু প্রবীণ ব্যক্তিদের যত্ন, খোঁজখবর নেওয়া, সামান্য সহানুভূতি দেখানো কোনো কঠিন কাজ নয়। তাদের যত্ন নেওয়া আমাদের সামাজিক ঐতিহ্যে পরিণত করতে হবে। 

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত