অভিবাসীর গল্প

ওটা ক্যাম্প না, মরণফাঁদ

আপডেট : ১৭ মে ২০২৪, ০৭:২৩ পিএম

জেলখানা তার ঠিকানা নয়, তবুও তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন এক বাংলাদেশি অভিবাসী। তার নাম আসাদ (ছদ্মনাম)৷ অভাব অনটনের পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে যান মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাকে। তারপর নানা বাঁধা পেরিয়ে এখন তার ঠাঁই হয়েছে তুরস্কের বাণিজ্যিক শহর ইস্তাম্বুলে। সেখানে এক বন্ধুর বাসায় ঘরবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন তিনি৷ সেই গল্পের কথা তুলে জানিয়েছেন গণমাধ্যমে।

মুন্সীগঞ্জের এক কৃষক পরিবারে জন্ম আসাদের । কোনো সনদ না থাকলেও কিছুটা পড়াশোনা আছে তার ঝুলিতে। পরিবারে স্বচ্ছ্বলতা ফেরাতে বিদেশমুখী হওয়ার সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন আরও বছর ছয়েক আগে।

২০১৮ সালের কথা। ওই বছরের মাঝামাঝি সময়ে শ্রমিক হিসেবে নিয়মিত পথে ইরাকে যান আসাদ। রাজধানী বাগদাদে একটি চাকরিও পেয়ে যান।  আয় যা হচ্ছিল, তাতে খুশিই ছিলেন। ভালোই চলছিল সবকিছু। কিন্তু ২০২০ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে সবকিছু পাল্টে যেতে থাকে। ওইদিন ইরাকের বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হন ইরানের সাবেক মেজর জেনারেল কাশেম সুলেইমানি। 

ওইসময় সংঘর্ষ শুরু হয়।  বিভিন্ন স্থানে চলতে থাকে সহিংসতা, বোমা হামলা। পুরো এলাকা রূপ নেয় আতঙ্কে।  আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। দিন দিন পরিস্থিতি খারাপ হতে থাকে৷ প্রাণ ভয়ে বাগদাদ ছেড়ে কুর্দিস্তানে চলে আসেন আসাদ। সেখানে পৌঁছাতেই দেখা হয় তার দূর সম্পর্কের এক বোনের ছেলের সঙ্গে। তার মাধ্যমে পরিচয় হয় বাংলাদেশে তার পাশের গ্রামের নাঈমের সঙ্গে।

সবাই মিলে ঠিক করলেন ইরাকে আর থাকা যাবে না। সিদ্ধান্ত নিলেন চলে যাবেন তুরস্কে। কারণটাও তুলে ধরলেন আসাদ৷ বললেন, ‘‘তখন জানতে পারলাম অনেক লোক টার্কিতে (তুরস্কে) ঢুকতেছে। ওখানেই এক পরিচিতি, বন্ধুবান্ধব আছে না... যারা আগেই আসছে... ওইভাবে লিংক নিয়ে চলে আসছি৷’

সীমান্ত দিয়ে পায়ে হেঁটে অনিয়মিত পথ ধরেই আরো অনেকের সঙ্গে তুরস্কে প্রবেশ করেন আসাদ। বলেন, ‘ইরাকের কুর্দিস্তান দিয়ে তুরস্কে ঢুকি আমরা।’

তুরস্কে পৌঁছে দেশটির সীমান্তবর্তী এলাকায় কয়েকদিন ছিলেন তারা। আসাদ বলেন, ‘যে এজেন্টের মাধ্যমে এসেছিলাম আমরা, সেখানে ওই এজেন্টের বাসা ছিল। সেখানেই রাখছিল আমাদের। এক সপ্তাহের মতো ছিলাম। তারপর বাসের টিকিট করে দিছে। তারপর ইস্তাম্বুলে চলে আসি৷’


হাঁটা পথের গেইম

ইরাক থেকে তুরস্ক পা রেখে সাহসটা যেন আরো বেড়ে গেল আসাদসহ দলের আরো কয়েকজনের। এর মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগীর খোঁজখবরও নিয়ে নিলেন তারা। ঠিক করলেন, তুরস্কে কাজকর্ম না খোঁজে চলে যেতে হবে গ্রিসে। কারণ, তারা মনে করতেন ইউরোপে পৌঁছালেই বদলে যাবে জীবন।

আসাদ বলেন,ইস্তাম্বুলে আসার পর এক দালালকে টাকা দিছিলাম গ্রিসে যাওয়ার জন্য। গ্রিসে গেইম মারলাম বেশ কয়েকটা।  যখনই গ্রিসে যাচ্ছি, ওখানকার সীমান্তরক্ষীরা আবারো তুর্কিতে ডিপোর্ট করে দিত। কয়েকবারের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় হতাশ হলেন কিছুটা। কিন্তু হাল ছাড়তে রাজি না আসাদ। তাই খুঁজে বার করলেন অন্য মধ্যস্বত্বভোগীকে৷

আসাদ আরও বলেন, ‘অন্য দালাল বললো যে, আমার কাছে ভালো গেইম আছে। এলাকার পরিচয়-টরিচয় পেয়ে, ফুসলিয়ে, নানা কিছু বুঝিয়ে আমাকে রাজি করালো। ওই দালালের মাধ্যমে আবার গেইম মারলাম। দালাল লোকটা ভালো ছিল না। শেষে জানতে পারলাম৷’

‘ওই দালালের কাছে যখন টাকা জমা করি, দালাল একটা গেইমে পাঠায়। আধা রাস্তার মধ্যে পুলিশ আমাদের ধরে। মানে সীমান্তেই যেতেই পারিনি৷ ইস্তাম্বুল ছেড়ে আসতেই একটি চেক পয়েন্টে পুলিশ আমাদের ধরে ফেলে। ধরার পর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। ক্যাম্প থেকে নেয়া হয় ভান শহরে, যা ইরান সীমান্তের কাছাকাছি। ওইখানে প্রায় পাঁচ মাসের মতো রাখা হয় আমাদের৷’’
বন্দিশিবিরে ভয়ঙ্কর জীবন

ভান শহরের যে জায়গায় আসাদ ছিলেন, তার দেয়া বর্ণনায় সেটা ছিল মূলত বন্দিশিবির৷ কাঁপা কাঁপা গলায় সেই বন্দিদশার বর্ণনা করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘ওটা ক্যাম্প না। ওটা আসলে মরণ ফাঁদ। জেলখানা, রুমে রুমে বন্দি। নড়তে চড়তে দিত না। খাবার দাবারের অবস্থা খুবই বাজে। কিছু বললেই মারধর করত৷’

খাদ্য সংকট, শারিরীক নির্যাতন, নিপীড়ন যেমন ছিলো, তেমনি আতঙ্কেও থাকতে হতো তাকে। কারণ, ওই বন্দিশিবির থেকে অনেক লোককে নিয়ে রাতের আঁধারে ইরান সীমান্তে ছেড়ে দিত বলে দাবি করেন আসাদ৷
ইরানে মাফিয়াদের ভয়

আসাদ বলেন, সাদা কাগজে টিপসই নিয়ে জোর করে ইরানে ঢুকিয়ে দেয়া হতো। ইরানে যাদের পাঠানো হতো তাদের সবাইকে মাফিয়া ধরতো। মাফিয়া ধরে আঙ্গুল কেটে দিত৷।কান ও  হাত কেটে দিত। বিশাল অঙ্কের টাকা দাবি করত। টাকা না দিলেই শারীরিক নির্যাতন।

টানা পাঁচমাস ওই ক্যাম্পে রাখার পর সেই শিবিরের অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশীকে আবার নিয়ে যাওয়া হয়, ইরান সীমান্তবর্তী আরেকটি ক্যাম্পে। ওই এলাকার সম্পর্কে খুব একটা ধারণা নেই আসাদের। 

তিনি জানালেন, ‘সেই ক্যাম্পের ভেতর প্রচুর বাংলাদেশি আছেন। কিন্তু নেই কোনো খাবার দাবার। নেই গোসলের কোনো জায়গা। সেখানে আড়াই মাস যাওয়ার পর নাঈম (কুর্দিস্তান থেকে আসাদের সহযাত্রী) অসুস্থ হয়ে পড়ে৷ খাবার না পেয়ে, দুশ্চিন্তা থেকে অসুস্থ হয়ে যায় সে৷’

যে মধ্যস্বত্বভোগীর কথা শুনে গ্রিস যাওয়ার পথে ধরা খেলেন পুলিশের কাছে, তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলেন আসাদ। উদ্দেশ্য ছিল, তার কাছে দেয়া অর্থ আদায় করা।
আসাদ বলেন, ‘সে (মধ্যস্বত্বভোগী) আমাদের ফোন ধরতো না। দালাল ফোন ধরলে, তার কাছ থেকে টাকা আদায় করতে পারলে খেয়ে-বেঁচে থাকতে পারতাম৷’

ওই ক্যাম্পে অনেকে আট মাস, অনেকে নয় মাস, কেউ দেড় বছর ধরে আটকা পড়ে আছেন বলেও জানালেন তিনি৷ সেই ক্যাম্পের বর্ণনা দিতে গিয়ে আসাদ বলেন, ‘শুকনো রুটি দিত। এমন শুকনো যে এগুলো দিয়ে কাউকে আঘাত করলে মানুষের মাথা ফেটে যেতে পারে। আরেক এক পদের ম্যাগী নুডুলসের মতো নুডুলস দিত। শুধু গরম পানি দিয়ে সেদ্ধ করে দিত। এর মধ্যে আর কিছুই থাকতো না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খাওয়ার জন্য এক লিটার পানি দিত৷’

এদিকে, সহযাত্রী নাঈমের শরীরের আরো অবনতি হতে থাকে৷ কিন্তু ওই ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছিল না। অসহায়বোধ করছিলেন আসাদসহ অন্য বাংলাদেশিরা।

তিনি বলেন, ৪৮ ঘণ্টার পর তাকে (নাঈম) হাসপাতালে নেয়া হয়৷ রোজার মাসখানেক (ফেব্রুয়ারি) আগের কথা। আমরা চেঁচামেচি করার পর তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়৷ পরে জানতে পারলাম সে ব্রেইন স্ট্রোক করেছে।

এমন অনিশ্চয়তার চেয়ে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন কিনা, জানতে চাওয়া তার কাছে। উত্তরে আসাদ বলেন, ‘ফেরার কোনো পথ নেই। যদি ফিরে যাই — কী করব, বোঝেন তো, অনেক টাকা পয়সা খরচ হয়ে গেছে। দুই দালালকে টাকা পয়সা দিছি। সেই টাকাও পাই না।  দুই দালাল ৬ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছে। ইরাকে যা সঞ্চয় সব শেষ হয়ে গেছে৷’

একটু থেমে আবারও বলেন, ‘দেশে যাওয়ার ইচ্ছে নেই৷।গেলে কী করব? যা সম্বল ছিল সব শেষ। মানুষ অনেক টাকা পাবে। ঋণ করেছি। যেদিন সুযোগ পাব সেদিন থেকে কাজে লেগে যাব, কাজ করব৷’

(অভিবাসীর বক্তব্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে ইনফোমাইগ্রেন্টস)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত