বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ৯ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

গজারিয়া গণহত্যার স্মৃতি

আপডেট : ২০ মে ২০২৪, ০৯:০৭ পিএম

৯ মে ছিল গজারিয়া গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এ দিনে তৎকালীন ঢাকা জেলার মুন্সিগঞ্জ মহকুমার গজারিয়া থানার বিভিন্ন গ্রামে পাক হানাদাররা নৃশংস গণহত্যা চালিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন যে অসংখ্য গণহত্যা হয়েছিল গজারিয়া গণহত্যা তেমনই একটি। আমি তখন সাড়ে আট বছরের বালক। আমাদের পরিবারের মোট ৮ জন সদস্য এ গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী। বর্তমানে আমিই একমাত্র বেঁচে আছি। পরবর্তী প্রজন্মকে এ নৃশংস গণহত্যার বিবরণ জানানোর কর্তব্যবোধ থেকেই স্মৃতিচারণাটা লিখছি।

ওই সময়ে আমার বাবা ছিলেন গজারিয়া থানার সার্কেল অফিসার (উন্নয়ন)। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে আমরা মা’সহ ৬ ভাইবোন ঢাকাতেই ছিলাম। কর্তব্যকর্মে বাবা তখন গজারিয়াতেই ছিলেন। ঢাকার হত্যাযজ্ঞের খবর গজারিয়া পৌঁছলে বাবা আমাদের খবর জানার জন্য পাগলপ্রায় হয়ে যান। কিন্তু তার পক্ষে গজারিয়া থেকে ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা আসা ছিল অসম্ভব। পরিস্থিতি উন্নতি হলে তিনি তার অফিসের পিওনকে আমাদের খোঁজ নেবার জন্য ঢাকা পাঠান ৩ এপ্রিল। তাকে বলে দেয়া হয় আমাদের খোঁজ পেলে যেন গজারিয়ায় নিয়ে আসে। সে এসে আমাদের জীবিত পেয়ে স্বস্তিবোধ করে। বাবার আদেশ মতো আমাদের গজারিয়া নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করে। সম্ভবত পোস্তগোলা ঘাট থেকে একটা বড় নৌকা রিজার্ভ করে আমরা গজারিয়া পৌঁছাই।

গজারিয়া পৌঁছে আমরাও স্বস্তিবোধ করি। এলাকাটা তিন দিকে মেঘনা নদীবেষ্টিত। ওখানে অনেক লোক আশ্রয় নিয়েছিল। ভালোই কাটছিল আমাদের দিন। কিন্তু আমাদের কপালে দুর্ভোগ নেমে এলো। এখানে কিছু মুক্তি পাগল যুবক থানা প্রশাসনের প্রশ্রয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।এ সংবাদ পাক হানাদারদের দোসরদের মাধ্যমে ঢাকায় খবর চলে যায়। পাক হানাদাররা গজারিয়ায় অপারেশন চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

৯ মে খুব ভোরে গুলির শব্দ শুনে আমরা জেগে উঠি। নদীর দিক থেকেই গুলির শব্দ আসছিল। একটু পরেই জানতে পারি পাক আর্মি থানা আক্রমণ করেছে। আমরা দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সবাই খোলা মাঠের আলপথ ধরে ছুটতে শুরু করি। শতাধিক লোক আমাদের মতো ছুটছিল প্রাণ বাঁচানোর জন্য। প্রায় ৯টার দিকে আমরা নাজিরের চর নামক একটা গ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করি। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়ায় সবাই ক্লান্ত হয়ে ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। ১১টার দিকে পাক আর্মিরা ওই গ্রামে চলে আসে। ওরা ঘরগুলো ঘেরাও করে সব পুরুষদের বেরিয়ে আসার আদেশ দিচ্ছিল। এক পর্যায়ে ওরা আমরা যে ঘরে ছিলাম তার দরজা লাথি মেরে ভেঙে ফেলে বাবাসহ সকল পুরুষদের বের হবার আদেশ দেয়। ওরা বাইরে গেলে সবাইকে একটা লম্বা দড়ি দিয়ে কোমর বেঁধে ফেলে।

আমি তখন আমার মা’র কাছে দাঁড়িয়ে ভয়ে কাঁপছিলাম আর কাতর স্বরে কাঁদছিলাম। একটা বালুচ সৈন্য আমার বুক বরাবর রাইফেল ধরে মেরে ফেলার ভয় দেখায়। কিন্তু আল্লাহ অশেষ রহমতে আমরা রক্ষা পাই। সৈন্যটা রাইফেল নামিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ওরা চলে যেতেই আমরা সবাই উঠানে নেমে এসে কাঁদতে থাকি। ইতিমধ্যে সৈন্যরা সবাইকে নিয়ে দৃষ্টিসীমানার বাইরে চলে গেছে। ঘণ্টাখানেক পর বড়ভাই কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসেন। উনার শারিরীক প্রতিবন্ধীতা থাকায় পাক হানাদারদের অনুরোধ করে বাবা তাকে মুক্ত করেছিলেন। উনাকে পেয়ে আমাদের মধ্যে আবার কান্নার রোল পড়ে।

লেখক

সৈন্যরা সবাইকে নদীর পাড়ে থানা প্রাঙ্গণে নিয়ে বসিয়ে শেষ বারের মতো পানি পান করায়, দোয়া-দরুদ পড়তে বলে। মেশিনগান ফিট করা হয়। ফায়ার অর্ডারের জন্য অপেক্ষায় ছিল একজন। এমন সময় নদীর পাড়ে একটা স্পিড বোট এসে ভিড়ে। একজন পুলিশের বড়কর্তা নেমে আসেন। উনি ছিলেন তৎকালীন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার ই এ চৌধুরী। থানার ওসি ও বাবার সঙ্গে চৌধুরী সাহেবের আত্নীয়তা ছিল। তিনি পাক আর্মির কমান্ডিং অফিসার তরুণ ক্যাপ্টেনের সঙ্গে প্রায় অর্ধঘণ্টা আলোচনা করেন। তাদের আলোচনার পর ক্যাপ্টেন মেশিনগান সরিয়ে নিতে দেয় এবং বন্দি সবাইকে মুক্ত করার আদেশ দেয়। এভাবে আল্লাহ পাকের অশেষ রহমতে বাবা, ওসি সাহেবসহ প্রায় ৭০/৭৫ জন প্রাণে রক্ষা পান।

গজারিয়া গণহত্যায় অসংখ্য লোক শহীদ হন। অনেকের লাশ ফুলদি আর মেঘনায় ভেসে যায়। ধর্ষণ,লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ সব মিলিয়ে এক ভয়াল দিন ছিল ৯ মে ১৯৭১। আমি সকল শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি, যাদের রক্তে এদেশ মুক্ত হয়েছিল।

লেখক: প্রাবন্ধিক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত