বিদায় প্রিয় সালেহ্ স্যার

আপডেট : ২৫ জুন ২০২৪, ০৯:২৩ পিএম

প্রফেসর ড. কাজী সালেহ আহমেদ ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং পরিসংখ্যান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। হাজারো শিক্ষার্থীর কাছে তিনি ছিলেন অতি প্রিয় সালেহ স্যার। কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় এই শিক্ষক মারা গেছেন আজ। 

আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু করি, ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরের এক কনকনে শীতের সকাল, আমাদের ভীতু আড়ষ্ট উপস্থিতিকে চমকপ্রদ করে তুলেছিলেন সালেহ স্যার। তার কিছুদিন আগেই উনি ভিসি-শিপ শেষ করেছেন, শুনেছি উনি ছিলেন দোর্দন্ড প্রতাপশালী ভিসি, সব্যসাচীর মত কাজ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে। কত গল্প, কত মিথ উনাকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াত। কিন্তু সব কিছু পাশ কাটিয়ে আমরা উনাকে পেয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন থেকে শুধুমাত্র আমাদের সালেহ্ স্যার হিসেবে। পরিসংখ্যানের জ্ঞানবৃত্তে তিনি ছিলেন মহীরুহের মত। ক্লাসরুমে উনি এক অন্য মানুষ। স্যারের পড়ানোর গতির সাথে তাল মেলানোই ছিল আমাদের তখনকার যুদ্ধ। পরে, পরিণত বয়সে, কর্মক্ষেত্রে এসে জেনেছি এবং বুঝেছি, উনার পরিসংখ্যানের জ্ঞানের সাথে তাল মেলানো তাবৎ পরিসংখ্যানবিদেরই কাছেই একটা দুরূহ ব্যাপার ছিল।

উনাকে বলা হত প্রোবাবিলিটি আর স্যাম্পলিংয়ের জাহাজ। আমাদের স্যাম্পলিং ট্যাকনিক আর প্রোবাবিলিটি কোর্সটা পড়াতেন উনি। পরিসংখ্যানের মত জটিল বিষয় এত সহজ করে পড়াতেন, আর তার সাথে উনার নোয়াখালী ডায়ালেক্টে কথা বলা, স্যারের ক্লাস মিস করা ছিল দুস্কর। তাছাড়া স্যারের ক্লাস মিস করতে ভয়ও হতো, মনে হতো এই কঠিন জিনিস এত সাবলীল করে আর কে পড়াবেন পরে, আমাদের আমলে তো আর ইউটিউব ছিল না। পরিসংখ্যানের কত কি ভুলে গেছি, কিন্তু স্যারের পড়ানো স্যাম্পলিং ট্যাকনিক আজও ভুলিনি। ক্লাস্টার স্যাম্পলিং, মাল্টি স্টেজ, স্ট্রাটিফাইড … কোন ট্যাকনিক কোথায়, কেন, কিভাবে রিপ্রেজেন্টেটিভ হবে, আহা,স্যার আজকে চলে গেলেন, স্যারকে ফ্রিজিং গাড়িতে শুইয়ে রাখা দেখে আসলাম। মনটা বিষন্ন হয়ে গেল।

স্যার ছিলেন জাত শিক্ষক। ভিসি ছিলেন, প্রশাসনিক কাজ করেছেন, শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন চাঙ্গা হয়ে উঠেছিল উনার ভিসি থাকাকালীন সময়ে। কিন্তু এসব কাজের বাইরে উনি ছিলেন সত্যিকারের শিক্ষক, পরিসংখ্যানের শিক্ষক, একাগ্র মনে যিনি কেবল ক্লাসের ছাত্রদের পরিসংখ্যানটাই শেখাতে চাইতেন সহজভাবে। স্যারকে যারা ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন জানতেন তাদের নিশ্চয়ই মনে থাকবে, স্যার খুব কম জিনিসই আলাদা করে খেয়াল করে দেখতেন বা শুনতেন, উনি সব কিছু খুব সামগ্রিকভাবে দেখতেন। উনার ক্লাসে আমরা কেউ ভালো ছাত্র/ছাত্রী বা খারাপ ছাত্র/ছাত্রী ছিলাম না, আমরা সবাই প্রথম বর্ষ বা দ্বিতীয় বর্ষ বা তৃতীয় বর্ষ ছিলাম। সবাইকে এত এক করে দেখতে পারার দৃষ্টি বা যোগ্যতা বা উচ্চতা খুবই বিরল। উনার ভিসি-শিপ ছেড়ে দেয়ার পর সম্ভবত আমরাই প্রথম, প্রথম বর্ষ। উনি আমাদের ক্লাস নিতেন… ভিসি স্যার প্রথম বর্ষকে পড়ান, আজকাল এসব ভাবা যায়?

আমরা কোন কারণ ছাড়াই স্যারকে ভীষণ ভয় পেতাম, আসলে বলতে হবে সমীহ করতাম। আমাদের বিভাগের অন্য বর্ষের শিক্ষার্থীরা তো বটেই, এমনকি অন্য সকল শিক্ষকদেরকেও দেখতাম স্যারকে ভীষণ সমীহ করতেন। স্যার যে কেবিনে বসতেন, আমি আমার চার বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পরিসংখ্যান বিভাগের ওই কেবিনের সামনের করিডোরে ধরে হাঁটিনি কখনো, কিন্তু জীবনে কখনো স্যারের ক্লাসও মিস দিইনি। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে আমাদের পরিচয় ছিল আমরা সালেহ স্যারের স্টুডেন্ট । বলতেই হবে, জাহাঙ্গীরনগরের পরিসংখ্যান বিভাগকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন প্রফেসর কাজী সালেহ আহমেদ, পরিসংখ্যান বিভাগের আজ যত প্রাপ্তি সবটার সাথে জড়িয়ে আছে এবং থাকবেন ডঃ সালেহ’র নাম। 

কর্মজীবনে এসে বিভিন্ন সভা সেমিনার মিটিংয়ে স্যারের সাথে দেখা হতো, বলতো আমার ছাত্রী। পিতৃতুল্য শিক্ষক উপমাটা মনে হয় উনাদের দেখেই এসেছে। শেষ দেখা হলো আড়ং -এ, স্যারের যথারীতি উদ্ভ্রান্ত চাহনি। আমি এগিয়ে গেলাম, জিজ্ঞেস করলাম কি কিনবেন স্যার। আমাকে দেখেই বললেন, তুমি আমার ছাত্রী না? মনে হলো হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন, বললেন আমাকে বাসা থেকে পাঠিয়েছে একটা বিয়ের গিফট কিনতে, এই নাও টাকা, একটা কিছু কিনে দাও, আমি এখানে বসলাম। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে বের হবার সময় পরম স্নেহে মাথায় হাত দিলেন।

আমরা ঋদ্ধ হয়েছিলাম সালেহ স্যারদের মত শিক্ষাগুরুদের পেয়ে। ক্লাস রুমে শিখেছি পরিসংখ্যানের জটিল সব অঙ্ক, বাইরে পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে শিখেছি সবাইকে এক চোখে দেখতে পারার মহান শিক্ষা। আমাদের উনি প্রায়ই বলতেন যে উনি ২৭ বছর বয়সে পিএইচডি শেষ করেছিলেন, সেই তারুণ্যে ড. সালেহের মত মানুষেরা দেশে ফিরে এসেছিলেন, কাজ শুরু করেছিলেন একটা শিশু রাষ্ট্রের মাত্র জন্মানো একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে। একটা জীবন উনারা এই বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়েছেন, আমাদের মত মফস্বল থেকে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে উঠে আসা ছেলেমেয়েদের তৈরি করতে ব্যয় করেছেন তাদের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়গুলো। এঁরা নিজের পরিবারের সময় থেকে, নিজের সন্তানদের জন্য নির্ধারিত সময় থেকে কত সময় বের করে বিভাগকে দিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়েছেন, আমাদের জন্য দিয়েছেন, এরা কেউ ৯-৫টা চাকুরে ছিলেন না, এঁরা ছিলেন জীবনভর শিক্ষক। বিভাগ ছিল উনাদের কাছে পরিবার, আমরা ছিলাম সন্তান। অশেষ কৃতজ্ঞতা, স্যার। পরপারে সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয়ই আপনাকে ভালো রাখবেন। আপনি বেঁচে থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনার বিভাগে, আপনার ছাত্রছাত্রীদের মাঝে। 

দেশ হারালো একজন কিংবদন্তি পরিসংখ্যানবিদকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিসংখ্যান বিভাগ হারালো তার অভিভাবক । মহীরুহের মত এই বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে অন্য কোথাও বিস্তারিত লিখবো আশা করি, যাতে আমাদের কালে যারা শিক্ষকতার মহান পেশাকে গ্রহণ করেছেন তারা ফিরে দেখতে পান শিক্ষকতা আসলেই কতটা মহান ব্রত। স্যারের পরপারের যাত্রায় আমাদের দোয়া ভালবাসা সঙ্গে থাকবে।

লেখক: প্রাক্তন ছাত্রী, পরিসংখ্যান বিভাগ (ব্যাচ-২৩), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত