হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি। গত রবিবার আজারবাইজান-ইরান সীমান্তে একটি বাঁধ উদ্বোধনের পর ফেরার পথে নিখোঁজ হয় তাকে বহনকারী হেলিকপ্টারটি। খবরটি আসার পর থেকেই তেহরানে শুরু হয় উদ্বেগ। কী ঘটেছে রাইসিসহ সেই হেলিকপ্টারে থাকা অন্যদের ভাগ্যে, তা নিয়ে শুরু হয় নানা জল্পনা-কল্পনা। শেষ পর্যন্ত গতকাল সোমবার ভোরের দিকে খোঁজ মেলে সেই হেলিকপ্টারের। তেহরান জানায়, মেঘলা আকাশ আর ঘন কুয়াশার কারণে জরুরি অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয়ে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আবদুল্লাহিয়ান, পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের গভর্নর মালেক রাহমাতি, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মুখপাত্র আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ আলি আলে-হাশেমসহ ৯ আরোহীর সবাই নিহত হয়েছেন। আকস্মিক এ ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে আসে ইরান জুড়ে। ইরানের মিত্র দেশ ও ইরানপন্থি গোষ্ঠীগুলোও শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে রাইসি আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ঘনিষ্ঠজনদের একজন হওয়ায় তার হঠাৎ মৃত্যু দেশটির ভবিষ্যৎ রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্যে সম্পর্ক বা বিশ্ব রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। কারণ, এমন একটা সময় রাইসি প্রেসিডেন্ট পদে শপথগ্রহণ করেন যখন ইরান তীব্র অর্থনৈতিক সমস্যা, ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং বিশ্ব শক্তিগুলোর সঙ্গে পরমাণু চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার আলোচনাসহ একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিল। রাইসি দায়িত্বভার গ্রহণের পর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী থেকেছে ইরান; যার মধ্যে ২০২২ সালে ইরান জুড়ে ছড়িয়ে পড়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, গাজায় ইসরায়েল ও ইরান সমর্থিত ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসের মধ্যে চলমান যুদ্ধ। আর এ যুদ্ধের সময়ই ইসরায়েলের সঙ্গে ছায়া যুদ্ধ!
অবশ্য গতকাল ইরানের মন্ত্রিসভার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরান সরকার ‘সামান্যতম বাধা’ ছাড়াই কার্যক্রম চালিয়েছে। বিবৃতি আরও বলা হয়েছে, আমরা জাতিকে আশ্বস্ত করছি, আয়াতুল্লাহ রাইসির অদম্য চেতনাকে সঙ্গে নিয়েই আমরা আমাদের সেবা অব্যাহত রাখব।
ইরান সরকার এমন কথা বলতেই পারে, কারণ সেখানে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি যা বলবেন তার বাইরে কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। দেশটির প্রেসিডেন্ট পদে যিনিই থাকুন না কেন, খামেনি ও তার কাউন্সিলের সিদ্ধান্তের বাইরে কারও কিছুই বলার বা করার ক্ষমতা নেই। তবে রাইসির মৃত্যুতে ইরানের যে ক্ষতি হয়েছে সেটি হচ্ছে, তাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব। কারণ, বর্ণাঢ্য ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জীবনের কারণেই তাকে ভাবা হতো ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা। অর্থাৎ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরি।
আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বয়স এখন ৮৫ বছর। অনেক দিন ধরেই তার স্বাস্থ্য পরিস্থিতি আলোচনার কেন্দ্রে। ইরানের কট্টরপন্থি প্রেসিডেন্টের দুঃখজনক মৃত্যুতে দেশটির নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে, এমনটি ভাবার কারণ নেই। তবে কঠোর রক্ষণশীলদের নিয়ন্ত্রিত কাঠামোকে একটা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তার প্রতিপক্ষের লোকেরা হয়তো এই সাবেক আইনজীবীর প্রস্থানে স্বস্তিই খুঁজবেন। তার বিরুদ্ধে আশির দশকে রাজনৈতিক বন্দিদের গণসাজা দেওয়ায় ভূমিকা রাখার অভিযোগ আছে। যদিও তিনি বরাবরই সেই অভিযোগ নাকচ করে এসেছেন। প্রতিপক্ষ আশা করে থাকবে, তার সঙ্গে সঙ্গে এ শাসনকালেরও ইতি ঘটবে। রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় ইরানের ক্ষমতাসীনরা দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে পড়বেন। আবার নিজেদের যাত্রা অব্যাহত রাখার ঘোষণাটা দেওয়ার সুযোগও থাকছে সেখানে। অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টে রাইসির আসনটি পূরণ করতে হবে। এ অ্যাসেম্বলি সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে থাকে।
অবশ্য কেউ কেউ বলছেন, রাইসির মৃত্যু হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের গভীর ও বিস্তৃত প্রভাব রয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছে তেহরান। ফলে এ দেশগুলো শক্তি প্রদর্শন করতে এবং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের কট্টর শত্রু যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলা প্রতিহত করতে পারে।
তবে বিবিসির বৈরুত প্রতিনিধি লিনা সিনজাব বলছেন ভিন্ন কথা। তার ভাষ্য, ইরানের আঞ্চলিক নীতিমালা খামেনির হাতেই নির্ধারিত হয়। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবারও একই আদর্শের অনুসারী। তিনিও খামেনির ঘনিষ্ঠ। অতএব ইরানের আঞ্চলিক নীতি অপরিবর্তিতই থাকবে।
রাইসির মৃত্যু কুদস ফোর্সের সাবেক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানির মৃত্যুর মতো প্রভাব তৈরি করার কথাও নয়। কারণ সোলেইমানি আঞ্চলিক রাজনীতির পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। তার মৃত্যুতে ইরান এবং তার আঞ্চলিক মিত্ররা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। এরপর কী হবে, বুঝে উঠতে পারছিল না তারা। পরে অবশ্য অবস্থান পাল্টে নিজেদের ক্ষমতা রক্ষায় মনোযোগী হয়েছিল তারা। বর্তমানে গাজা যুদ্ধই অঞ্চলটিতে মনোযোগের কেন্দ্রে রয়েছে।
অন্যদিকে রাইসির আকস্মিক মৃত্যুতে বিশ্ব রাজনীতিতে কেমন প্রভাব পড়তে পারে সে বিষয়ে একটি বিশ্লেষণ করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনীতির এক ক্রান্তিলগ্নে এ হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা ঘটল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, অবধারিতভাবেই হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অন্যান্য দেশের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কে তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের কিছু প্রভাব পড়তে পারে। ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এখনো রাইসির মৃত্যুতে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে ব্রিফিং করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
গত কয়েক বছর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে অনেক টানাপড়েন দেখা দিয়েছে। কারণ, মূলত তেহরানের পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের প্রচেষ্টা। ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে পিছিয়ে যান এবং দেশটির বিরুদ্ধে অসংখ্য অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। যার ফলে পারমাণবিক চুক্তিতে উল্লেখ করা কিছু শর্ত পালন থেকে বিরত থাকে ইরান। ২০২১ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর দর-কষাকষিতে কঠোর অবস্থান নেন ইব্রাহিম রাইসি। রয়টার্সের এক প্রতিবেদন মতে, ইরানের অত্যাধুনিক পারমাণবিক প্রযুক্তির উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় কিছুটা রাশ টেনে ধরার বিনিময়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিধিনিষেধের একটি বড় অংশ থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ দেখতে পান।
গাজার সংঘাত ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে, এমন আশঙ্কায় ছিল বাইডেন প্রশাসন। কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা ইরানের সঙ্গে পরোক্ষভাবে আলোচনা চালাচ্ছিলেন যেন অন্যান্য দেশে সংঘাত ছড়িয়ে না যায়। তবে রাইসির মৃত্যুতে খানিকটা হলেও এ অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা দেখা দেওয়ার হুমকি তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মূল্য শান্তি নিশ্চিতের প্রচেষ্টা চালাবে।
প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মতো কট্টরপন্থি নেতার মৃত্যুর পর ইরানকে মোকাবিলা করতে ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যে তার অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে বলে দ্য ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, রাইসির মৃত্যু ইসরায়েলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। কারণ ইসরায়েল বিরোধী হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছিলেন রাইসি।
রাইসির মৃত্যুতে নেতৃত্বের পরিবর্তনে ইরান ও ইসরায়েলের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সম্পর্কের গতিশীলতায় পরিবর্তন আসতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও সৌদি আরবসহ প্রতিপক্ষ দেশগুলো ইরানকে মোকাবিলা করতে এ সুযোগে নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও গভীর করার কথা।
