আজ আরেকটি ফাইনাল। আরেকবার শিরোপা লড়াইয়ে মুখোমুখি বসুন্ধরা কিংস এবং মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। চলতি মৌসুমে দ্বিতীয়বারের মতো। ময়মনসিংহের রফিক উদ্দীন ভুঁইয়া স্টেডিয়ামে বেলা ৩টায় শুরু হবে ফেডারেশন কাপের ফাইনাল। যে মঞ্চে মোহামেডান নামবে ১২-র সমীকরণ মেলাতে। আর বসুন্ধরা কিংসের চোখ তিন-এর লক্ষ্যপূরণে।
১৯৮০ সালে শুরু হওয়া ফেডারেশন কাপে ১২বার চ্যাম্পিয়ন হয়ে সবচেয়ে সফল দল আবাহনী লিমিটেড। গত মৌসুমে এই আবাহনীকেই হারিয়ে ১১বারের মতো শিরোপা জিতেছিল মোহামেডান। আজ জিতলে আবাহনীর সেরার আসনে ভাগ বসাবে তারা।
শীর্ষ স্তরে আবির্ভাবের পর টানা পাঁচ প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জেতা বসুন্ধরা কিংস ফেডারেশন কাপ জিতেছে দুবার। আজ জিতলে মিলবে তিন-এর সমীকরণ। তবে বসুন্ধরার কাছে এই হিসাব মেলানোর চেয়ে আরেকটা তিন-এর হিসাব মেলানোর মাহাত্ম্য অনেক বেশি। আজ তাদের সামনে ট্রেবল জয়ের (মৌসুমের সবকটি শিরোপা জয়) লক্ষ্য পূরণ হবে তাদের। তাতে শেখ রাসেলের ২০১২-১৩ মৌসুমের অনন্য রেকর্ডে ভাগ বসানো যাবে।
চলতি মৌসুমে সবচেয়ে সফল দুদলের লড়াই বলেই এই ফাইনাল নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই সমর্থকদের মধ্যে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্যালারি মাতিয়ে রাখতে এই দুই দলের সমর্থকদের জুড়ি নেই। মোহামেডানের দেশজুড়ে আছে বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী। গেল মৌসুমে ফেডারেশন কাপে আবাহনীকে হারানোর দিনে কুমিল্লার গ্যালারিতে সাদা-কালোর আধিক্য আরেকবার ফুটবলের সোনালি সময়ের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়েছিল। ময়মনসিংহের গ্যালারির একাংশ আজও থাকবে তাদের দখলে। ধারাবাহিক সফলতায় বসুন্ধরা কিংসেরও তৈরি হয়েছে ফ্যান-বেইজ। যেখানেই খেলছে দলটি, সেখানেই তাদের সরব উপস্থিতি। তাই তারাও আজ দ্বাদশ খেলোয়াড়ের দায়িত্ব পালনে প্রস্তুত।
ময়মনসিংহে আজ মোহামেডান চাইবে গত বছর ৩০ মে কুমিল্লার ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামের স্মৃতি ফেরাতে। অবিস্মরণীয় ফাইনালে টাইব্রেকারে আবাহনীকে হারিয়ে ১৪ বছর পর ফেডারেশন কাপ শিরোপা ঘরে তোলে সাদা-কালোরা। মর্যাদার শিরোপা ঘরে রাখতে মোহামেডানের চেষ্টার কমতি থাকবে না।
বসুন্ধরা চাইবে গত বছর ১৮ ডিসেম্বরের গোপালগঞ্জের শেখ ফজলুল হক মনি স্টেডিয়ামের শেষ বিকেলের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে। সেদিন মোহামেডানকে হারিয়েই তারা চলতি মৌসুম শুরু করেছিল স্বাধীনতা কাপ শিরোপা জিতে।
১২-র হিসাব মেলাতে মোহামেডানকে ৩ ফেব্রুয়ারির কিংস অ্যারেনার বিকেলটাও ফেরাতে হবে ময়মনসিংহে। এই মৌসুমে বসুন্ধরা কিংসকে একমাত্র হারের তেতো স্বাদ দিয়েছিল তারা। নিয়েছিল স্বাধীনতা কাপের ফাইনালে হারের প্রতিশোধ। একমাত্র হারের সেই জ্বালা বসুন্ধরা সারিয়েছে এই ময়মনসিংহেই। ১১ মে মোহামেডানকে ২-১ গোলে হারিয়ে নিশ্চিত করে টানা পঞ্চম লিগ শিরোপা।
আজ তাই মোহামেডানের ফিরিয়ে দেওয়ার পালা। সাদা-কালোদের বদলে দেওয়া কোচ আলফাজ আহমেদ অবশ্য প্রতিপক্ষকে যোজন এগিয়ে রেখে পণ করেছেন শিরোপা স্বপ্ন সত্যি করার। ধারে-ভারে বসুন্ধরা যে তার দলের চেয়ে অনেক এগিয়ে, তা নতুন করে বলার কিছু নেই। তবে এ মৌসুমে হওয়া তিন ম্যাচেই বসুন্ধরাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে তার দল। লড়েছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। তাতে দুবার হারলেও, এক জয়ে বড় স্বপ্ন দেখার জ্বালানিটা ঠিকই কুড়িয়ে নিয়েছে মোহামেডান।
আলফাজ তাই প্রত্যয়ী, ‘মোহামেডান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্যই মাঠে নামবে। এখানে আর অন্য কিছু বলার নেই। পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই আমরা নামব। দুই দলের মধ্যে অবশ্যই বসুন্ধরা ফেভারিট। তবে তাদের সঙ্গে লড়াই করার সামর্থ্য আমাদের আছে। এ জন্য ম্যাচটা যে কেউ জিততে পারে। আমি বলব ফিফটি-ফিফটি চান্স। কিংসের বিদেশিদের নিয়ে কৌশল তো অবশ্যই থাকবে। ওদের আটকাতে পারলেই ম্যাচটা জিতব।’
আলফাজ যখন প্রতিপক্ষের সেরাদের আটকানোর ছক কষছেন তখন বসুন্ধরা কোচ অস্কার ব্রুজোনের সবটুকু মনোযোগ নিজের শিষ্যদের দিকে। এই স্প্যানিশ জানেন, নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারলেই ট্রেবল নিশ্চিত হবে।
ব্রুজোন বলেন, ‘এই পর্যায়ে পৌঁছাতে আমরা পুরো মৌসুম জুড়েই কঠোর পরিশ্রম এবং উপযুক্ত প্রস্তুতি নিয়েছি। নিজেদের সেরা প্রমাণের আরেকটি সুযোগ এটা। নিজেদের ওপর শতভাগ বিশ্বাস আছে। আরও বিশ্বাস আছে আমাদের প্রযুক্তিগত এবং কৌশলগত স্বয়ংক্রিয়তায়, যা আমাদের ফাইনালে সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করতে সহায়তা করবে। ছেলেদের বলেছি হৃদয় দিয়ে, শতভাগ মনোযোগ দিয়ে ও সংকল্প নিয়ে খেলতে। ক্লাবের সত্যিকারের লক্ষ্য অর্জনে তাদেরই প্রধান ভূমিকাটা নিতে হবে।’
চেনা প্রতিপক্ষ বলেই মোহামেডান নিয়ে অতটা ভাবছেন না তিনি। তবে সতর্ক থাকতেই হবে তাকে। স্বাধীনতা কাপের ফাইনালে ২-১-এ জয়ের পর লিগের প্রথমপর্বে ১-০ হারের ধাক্কা সামলাতে হয়েছিল। লিগ শিরোপা নিশ্চিতের ম্যাচে ২-১-এ জিততেও ঘাম ঝড়াতে হয়েছে বসুন্ধরাকে।
তাই মোহামেডানকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই ব্রুজোনের, ‘প্রতিপক্ষ (মোহামেডান) নিজেদের কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পারফরম্যান্স করে আসছে। তাদের আছে নিরেট রক্ষণভাগ, সংঘবদ্ধ হয়ে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করে এবং দুই প্রান্ত ব্যবহার করে আক্রমণে উঠতে চায়। সেট-পিস থেকে সফলতার হারও তাদের সন্তোষজনক। সব মিলিয়ে আরেকটা কঠিন ম্যাচ হতে যাচ্ছে।’
বসুন্ধরার ট্রেবল জয় রুখতে পারলে মোহামেডান বসবে চিরকালীন শত্রু আবাহনীর পাশে। কাজটা ভীষণ কঠিন। তবে মরণ কামড় বসাতে প্রস্তুত আলফাজ বাহিনী। সেই কামড় এড়িয়ে শেখ রাসেলে একার রেকর্ডে ভাগ বসাতে সর্বশক্তি প্রয়োগে বদ্ধপরিকর কিংস। এত এত হিসাবের ফাইনালে জয় হোক ফুটবলের, এটাই প্রত্যাশা।
তবে প্রত্যাশা মেটানোর দায়িত্ব কেবল খেলোয়াড়দের নয়, দায়িত্ব নিতে হবে রেফারিদেরও। ভালো বাঁশি বাজানো নিয়ে যে দুই শিবিরেই বিরাজ করছে অস্বস্তি।
