শনিবার, ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

বিসিএস বাণিজ্য ক্যাডারে সদস্য কমে ১৭ জন

  • বাণিজ্য ক্যাডারের পদে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা
আপডেট : ২৬ মে ২০২৪, ১০:২০ এএম

একটা সময় ছিল, এক দেশ জোর করে আরেক দেশ দখল করে নিত। বর্তমানে তা আর হচ্ছে না। এখন যদি কোনো দেশ অন্য দেশকে দখলে নিতে চায়, তাহলে তার বাণিজ্য দখলই যথেষ্ট। আধুনিক বিশ্বে ট্রেড বা বাণিজ্য হচ্ছে বুদ্ধিমত্তার লড়াই। বাণিজ্যের বিধিবিধান নিয়তই পরিবর্তন হচ্ছে এবং জটিল আকার ধারণ করছে। অভিযোগ আছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অসম বিধিবিধানের শিকার হচ্ছে বাংলাদেশ। এ দেশের অংশীদারত্ব বাড়লেও সৃষ্ট সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও পেশাগত অদক্ষতাও রয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্য ব্যবস্থায় এ দেশের অবস্থান জোরদার করতে যখন প্রয়োজন শক্তিশালী ট্রেড ক্যাডার (বিসিএস বাণিজ্য), তখন তা দুর্বল করা হয়েছে। কিছু উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তার লিপ্সায় তা এখন বিলুপ্ত করা হচ্ছে।

১৯৮০ সালে ক্যাডার গঠনের সময় ১০০ পদ ছিল। এগুলো ছিল নবম থেকে গ্রেড ২ পর্যন্ত। ১৯৯৪ সালে পদসংখ্যা ১১৬টিতে উন্নীত করা হয়। ১৯৯৯ সালে পদসংখ্যা কমিয়ে ৬৬ করা হয়। পরে আরও কমে তা ৩২টি স্থির হয়। ৩২টি থাকলেও এসব পদে বর্তমানে রয়েছেন মাত্র ১৭ জন ট্রেড ক্যাডার।

গত ১৯ মে রবিবার ট্রেড ক্যাডার সংস্কারের আদেশ জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আদেশে ১৯৮০ সালের বিসিএস (ট্রেড) কম্পোজিশন অ্যান্ড ক্যাডার রুল বিলুপ্তির কথা বলা হয়েছে। এ আদেশটি এমন একসময়ে জারি করা হলো, যখন ট্রেড ক্যাডার বিলুপ্ত করে প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে মার্জ বা একীভূতকরণের আলোচনা চলছে। আদেশে কয়েকটি পদ বিলুপ্ত ও নতুন একটি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। যে আদেশ জারি করা হয়েছে তা আসলে সংস্কারের জন্য নয়। আদালতের একটা নির্দেশনা আছে, সামরিক শাসনামলে প্রণীত বিধিবিধান নতুন করে করতে হবে। এ ক্ষেত্রেও সংস্কার করার সুযোগ ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি।

বর্তমান সরকারের অন্যতম এজেন্ডা হচ্ছে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ। গত জানুয়ারিতে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে যে ৩৪ দফা নির্দেশনা দেন, তার প্রধান বিষয় হচ্ছে দ্রব্যমূল্য। কিন্তু দ্রব্যমূল্য নিয়ে যে ক্যাডার কাজ করে সেই ট্রেড মৃতপ্রায় একটি ক্যাডার। যেখানে প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের পদ বাড়ছে, সেখানে ট্রেড ক্যাডারের পদ কমছে। প্রশাসন ক্যাডারের দাপটে এর সঙ্গে মার্জ বা একীভূত হয়েছে ইকোনমিক ক্যাডার। বহু আগেই এ কাজ করেছে সচিবালয় ক্যাডার। এসব একীভূতকরণের পেছনে কাজ করছে প্রশাসন ক্যাডারের সুযোগ-সুবিধা। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার জন্য সুদবিহীন ঋণ পান। সেই গাড়ি পরিচালনার জন্য মাসে ৫০ হাজার করে টাকা পান, যা অন্য ক্যাডারে যা নেই। পদ না থাকার পরও প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারে পদোন্নতি হচ্ছে, যা অন্য ক্যাডারে চিন্তাই করা যায় না। আর প্রশাসন ক্যাডারও তাদের দাপট বাড়ানোর জন্য দুর্বল হয়ে যাওয়া ক্যাডারগুলোকে দলে বেড়াচ্ছে। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে এই পেশাভিত্তিক প্রশাসন সৃষ্টি করা হয়েছে, তা ভন্ডুল হতে চলেছে।

জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রেড কোনো বেসিক বিষয় না। যে কেউ এসে তাতে কাজ করে দক্ষতা দেখাতে পারবে বিষয়টা এমন না। ট্রেড বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা তৈরি এ ক্যাডারের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। অথচ এখনই এ ক্যাডারের দরকার অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কারণ মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। ডলারের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় তার প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। মানুষের আয় এক জায়গায় আটকে আছে অথচ ব্যয় বাড়ছে হুহু করে।

দ্রব্যমূল্য পর্যালোচনা ও পূর্বাভাস সেল করে সেখানে ট্রেড ক্যাডারের তিনটি পদ সৃষ্টি করেছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, যা বিভিন্ন সময় সাফল্য দেখিয়েছে। এই সেলটি এখনো আছে। তবে সেখানে বসে আছেন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। কয়লা আর সাপ্লায়ার অ্যান্ড ইন্সপেকশন নামে দুটি অধিদপ্তর ছিল, যা পরিচালনা করতেন ট্রেড ক্যাডারের কর্মকর্তারা। যার দুটোই বিলুপ্ত করা হয়েছে। যখন দপ্তর বিলুপ্ত হয়, তখন ক্যাডারের পদগুলোও বিলুপ্ত হয়। বিভিন্ন মিশনে কমার্শিয়াল কাউন্সেলরের পদগুলোয় ট্রেড ক্যাডার অফিসারদের নিয়োগ করা হতো। সেই পদগুলো এখন উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। যেকোনো ক্যাডারের কর্মকর্তারা এতে যোগ দিতে পারেন। একটা পরীক্ষা নেওয়া হয়। পরীক্ষায় নির্বাচিতরা মিশনে নিয়োগ পান। এ ছাড়া ট্যারিফ কমিশনে ডেপুটেশনে কিছু পদ ছিল। পরে এসব পদ বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ইম্পোর্ট পলিসি ফরমুলেশন শাখায় কাজ করতেন ট্রেড ক্যাডার কর্মকর্তারা। সেই শাখা এখন চালান প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তারা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ট্রেড ক্যাডারের ৯টি পদ রয়েছে। সেসব পদে নিয়োজিত আছেন মাত্র একজন ট্রেড ক্যাডার অফিসার। বাকি পদগুলোতে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তারাই কাজ করছেন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ডব্লিউটিও (বিশ^ বাণিজ্য সংস্থা) এবং এফটিএ (বৈদেশিক বাণিজ্য চুক্তি বা ফরেন ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট) নামে দুটি উইং আছে। এসব উইংয়ে যেসব কাজ হয়, সেগুলো বিশেষায়িত কাজ। এসব উইংয়ে এসে যেকোনো কর্মকর্তার পক্ষে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে নেগোসিয়েশন করতে সমস্যা হয়। বাণিজ্য চুক্তি করতে কিছু নেগোসিয়েশনের বিষয় থাকে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই ট্রেড ক্যাডার গঠন করা হয়েছিল। বাস্তবতা হলো, এই দুটি উইংয়ে ট্রেড ক্যাডারের একজন কর্মকর্তাও নেই। ডব্লিউটিওর হেড অফিসে ৯ মাসের বেসিক ট্রেড কোর্সে প্রশিক্ষণ হয়। এই প্রশিক্ষণে যাওয়ার কথা ট্রেড ক্যাডার কর্মকর্তাদের। কিন্তু যান প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তারা। সেই ট্রেনিং থেকে ফিরে তারা পদায়ন পেয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ে ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। তবে কালেভদ্রে ট্রেড ক্যাডার কর্মকর্তারাও এই প্রেস্টিজিয়াজ ট্রেনিংয়ের সুবিধা পান।

ট্রেড ক্যাডার হিসেবে অতিরিক্ত সচিব পদ থেকে অবসরে যাওয়া শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘এত দরকারি একটা ক্যাডার অথচ হেলায় ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে। বিসিএস হয় কিন্তু ট্রেড ক্যাডারে নতুন অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয় না, যারা আছেন তাদের ট্রেনিং দেওয়া হয় না। তাহলে কেন কর্মকর্তারা এ ক্যাডারে থাকবেন। অথচ কর্মকর্তাদের জন্য নয় দেশের জন্য ট্রেড ক্যাডার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আমাদের নেগোসিয়েশন খুব দুর্বল। যার কাজ তাকে করতে না দিলে তো দুর্বল হবেই। এ দেশে জোর যার মুল্লুক তার। এ ক্যাডারেরও কিছু অফিসার আছেন যারা পাওয়ার চান। সবাই চান ম্যাজিস্ট্রেট হতে, ডিসি হতে। তাহলে চীন-ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে কে নেতৃত্ব দেবেন? একটি বিশেষ ক্যাডারের নীতিনির্ধারকরাই চাচ্ছেন না ট্রেড ক্যাডারের সংস্কার হোক। তারা চাচ্ছেন এ কাজগুলো নিজেরা করতে।’

২০১৯ সালে প্রশাসন ক্যাডারের এক কর্মকর্তা বাণিজ্য সচিব হিসেবে যোগ দিলে ট্রেড ক্যাডারের কর্মকর্তারা তার সঙ্গে রীতি অনুযায়ী দেখা করেন এবং তাদের সমস্যা তুলে ধরেন। একপর্যায়ে সচিব তাদের থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমরা কী বলতে চাও তা আমি জানি। সংস্কার-টংস্কার বাদ দাও। প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে মার্জ হও।’

সচিবের এই কথায় ট্রেড ক্যাডার কর্মকর্তারা হতাশ হয়ে পড়েন। পরে বাধ্য হয়ে অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এজিএম করে সর্বসম্মতিক্রমে মার্জ হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ট্রেড ক্যাডার অফিসাররা। মার্জ হওয়ার এই প্রস্তাব ২০২২ সাল পর্যন্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পড়েছিল। ওই বছর মার্জ করানোর সিদ্ধান্ত নেয় জনপ্রশাসন। ওই সময় এই ক্যাডারে ছিলেন ১৩ কর্মকর্তা। এই স্বল্পসংখ্যক সদস্যকে মার্জ করা খুব সহজ বিষয় ছিল। কিন্তু তারপর আবার দেড় বছর পার হয়ে যাচ্ছে। এখন প্রশাসন ক্যাডারের একশ্রেণির কর্মকর্তা মনে করেন মার্জ হয়ে ইকোনমিক ক্যাডার কর্মকর্তারা খুব বেশি সুবিধা পেয়ে গেছেন। তাদের এত সুবিধা দেওয়া ঠিক হয়নি। তারা নতুন ক্যাডার মার্জ হওয়ার বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাবে পোষণ করেন। ১৩ জনের ক্যাডারের দর-কষাকষির ক্ষমতা কম। কাজেই তারা না পারলেন ক্যাডার শক্তিশালী করতে, না পারলেন মার্জ হতে।

দীর্ঘদিন বন্ধ রাখার পর ৪১তম বিসিএসে ৪ কর্মকর্তাকে ট্রেড ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা যোগ দেওয়ায় ১৭ জনের ক্যাডারে উন্নীত হলো ট্রেড। এর আগে সবশেষ ৩৬ ব্যাচে ৬ জন কর্মকর্তা পান এ ক্যাডার। ৩০ ব্যাচেও ২ জন কর্মকর্তা যোগ দিয়েছিলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেন, ‘আধুনিক বাণিজ্যের বিধিবিধান ও নজির সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছেন এমন কর্মকর্তারা হচ্ছেন ট্রেড ক্যাডার। অথচ কিছু বিষয় ঝুলিয়ে রেখে দরকারি ক্যাডারটাকে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। কারও সঙ্গে মার্জ নয়, এ ক্যাডারের সংস্কার দরকার।’

সাবেক এই মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘১৯৮০ সালে ২৭টি ক্যাডার সৃষ্টি করা হয়। এগুলোর আবার একাধিক সাব-ক্যাডারও রয়েছে। প্রয়োজনেই এসব ক্যাডার তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন মহলের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পরই এসব ক্যাডার চালু হয়েছে। কয়েকটি চালু রয়েছে যুগবাহিত ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়।’

ট্রেড ক্যাডার দুর্বল করার অভিযোগের তীর প্রশাসন ক্যাডারের দিকেই। কিন্তু এ ক্যাডারের দায়িত্বশীলরা অন্যান্য ক্যাডার নিয়ে কথা বলতে চান না। তবে প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রেড ক্যাডার দুর্বল হওয়ার সুবিধাভোগী আমাদের ক্যাডার নন। বরং বলা যায়, ফরেন ক্যাডার এর সুবিধাভোগী। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্কে কর্মতৎপরতা ইদানীং খুব বেশি বাড়িয়েছে। এমনকি কানাডার আদলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মন্ত্রণালয় করার চেষ্টা আছে ফরেন ক্যাডার কর্মকর্তাদের। তারা এটা করতে পারলে মিশনে ট্রেড বা অ্যাডমিন কোনো ক্যাডারের পদায়ন সম্ভব হবে না।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত