সালাউদ্দিন-সালামের পদত্যাগ দাবী সাবেকদের

আপডেট : ৩০ মে ২০২৪, ০৮:১৩ পিএম

ফিফার শাস্তিতে জেরবার দেশের ফুটবল। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচিত প্রতিনিধি থেকে শুরুর করে বেতনভুক্ত বেশ ক'জন কর্মকর্তাকে অনিয়ম, জালিয়াতি, দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কঠোর শাস্তি দিয়েছে ফিফা। বিশ্ব নিয়ন্তা সংস্থার শাস্তির খড়গ নেমেছে বাফুফের চারবারের সিনিয়র সহ-সভাপতি সালাম মুর্শেদীর ওপরও। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দিন যাবৎ বাফুফের ভেতরকার অনিয়মের চিত্র প্রকাশিত হয়েছে। এরকম একটা পরিস্থিতিতে ফুটবলকে পুরোপুরি ধ্বংস হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে মুখ খুলেছেন সাবেক ফুটবলাররা। বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তারা বাফুফের অনিয়ম, দুর্নীতির হোতাদের অপসারণ দাবী করেছেন। 

সংবাদ সম্মেলনে আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু, সামশুল আলম মঞ্জু, দেওয়ান সফিউল আরেফিন টুটুল, আবদুল গাফফার, রুম্মন বিন ওয়ালি সাব্বির, আবু ইউসুফ, আরমান মিয়ার মতো তারকা ফুটবলাররা বক্তব্য রাখেন। মোটা দাগে তারা বাফুফের চার মেয়াদের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ও সালাম মুর্শেদীসহ শীর্ষ কর্তাদের দ্রুত সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। ফুটবলকে ধ্বংসের দাড়প্রান্ত নিয়ে যাওয়ার দায় স্বীকার করে নিতে বলেন। সামনের বাফুফের নির্বাচনে পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, বর্তমানে যারা দায়িত্বে আছেন, তারা ফের ক্ষমতায় থাকার চক্রান্ত শুরু করেছে। এটা হতে দেওয়া যাবে না। প্রয়োজনে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে তারা দাবী নিয়ে যাবেন বলে জানান বক্তারা। 

দেশের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার আরমান মিয়া বলেন, 'বাফুফের দুর্নীতি ও ব্যর্থতা নিয়ে আমরা গত ৮-১০ বছর ধরেই বিভিন্ন সময় কথা বলেছি, প্রতিবাদ করেছি। সংবাদ মাধ্যমে সবসময় সত্যটা আমরা বলে এসেছি। আজকে ফিফাও আমাদের অভিযোগগুলোর সত্যতা খুঁজে পেয়ে অনিয়ম ও জালিয়াতির হোতাদেরকে শাস্তি ও আর্থিক জরিমানা করেছে। এই ঘটনায় কেবল ফুটবল নয়, গোটা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। বাফুফের বসদের সম্পৃক্ততা যে অনিয়ম, জালিয়াতিতে আছে, তা তো ফিফার রায়েই পরিস্কার।'

আরেক তারকা রুম্মন বিন ওয়ালি সাব্বির বলেন, 'প্রায় ১৬ বছর হয়ে গেলো তারা ক্ষমতা আকড়ে আছে। ৮-৯ বছর ধরে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে তাদের অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে বলেছি। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করেও তাদের এসব অনিয়মের কথা বলেছি। আমাদের র‌্যাংকিং তারা যেখানে নিয়ে নামিয়েছে, এভাবে আর চলতে পারে না। একটা পরিবর্তন ভীষণ দরকার। আশি ও নব্বইয়ের দশকে আমাদের ফুটবল একটা ভালো পর্যায়ে ছিল। এশিয়ান পর্যায়ে আমাদের একটা মান ছিল। একটা সময় বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আমরা ১২-১৫ তে থাকতাম। সেখান থেকে নামতে নামতে আমরা ১৯৭ র‌্যাংকিংয়ে নেমে এসেছি। বুধবার আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ হয়েছে। এটা নিয়ে মানুষের মধ্যে কোন উন্মাদনা নেই। কেন এমনটা হবে? এখন যারা জাতীয় দলে খেলছে, তাদের নাম অনেকেই বলতে পারবে না। এটা আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি। এখনও মানুষ আমাদের কথা, আগের প্রজন্মের কথা বলে। তাহলে কী উন্নতি হলো? অনেক হয়েছে, আর নয়। ফুটবলের ধ্বংসের মুখে চলে এসেছে। যারা ক্ষমতায় আছে, তাদের অনুরোধ করবো আপনারা ব্যর্থতার দায় নিয়ে চলে যান।'

আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু জেলার ফুটবলকে অবহেলার কারণেই ভালোমানের ফুটবলার উঠে না আসার কথা বলেছেন, 'আমরা এতদিন ধরে যে ব্যাপারগুলো বলে এসেছি, মানববন্ধন করেছি, সেটাই ফিফার রায়ে প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের অভিযোগগুলোই ফিফা অনুসন্ধান করে, সত্য বের করে এনেছে। এতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি, আমাদের ভাবমূর্তি ভীষণভাবে নষ্ট হয়েছে। সারা দেশের মানুষ এখন জানতে চায়, ফুটবলের এই দুরাবস্থা কেন? ১৬ বছর ধরে তারা ফুটবল পরিচালনা করছে। তারা ঢাকার ফুটবল নিয়মিত করেছে। অথচ ঢাকার বাইরের ফুটবল থমকে আছে। সারা দেশের ফুটবলের দিকে তারা তাকায় না। ফিফার যে সিদ্ধান্ত এসেছে, এরপর তাদের আর ক্ষমতা আকড়ে রাখা উচিত নয়। সসম্মানে তারা সরে গেলে ফুটবল বেঁচে যাবে। তাদের হাতে ফুটবল একেবারেই নিরাপদ নয়।'

জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত সাবেক ফুটবলার সামসুল আলম মঞ্জু বেশ কয়েক বছর আগে বাফুফের দুর্নীতির বিষয় জানিয়ে ফিফার কাছে চিঠি দিয়েছিলেন। তিনি মনে করেন, কেবল চিঠি দিলে, সংবাদ সম্মেলন করলে হবে না। ফুটবলের পরিবর্তন আনতে হলে সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ সংগঠকদের আনতে হবে। পাশাপাশি ভোট বানিজ্য বন্ধ করতে হবে, 'কেবল সংবাদ সম্মেলন করলেই হবে না, সবসময় ফিফা-এএফসি'র সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। ফলো-আপ করতে হবে। বাফুফের যতজন কাউন্সিলর আছে, তাদের মধ্যে বড়জোড় ৫ থেকে ১০ শতাংশ কোন দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। বাকীরা সবাই নগদ টাকায় বিক্রি হয়ে যান। বাফুফের সভাপতি সবসময় কোন না কোন ব্যবসায়ীকে সঙ্গে নিয়ে ভোট বানিজ্য করেন। টাকার কাছে আমাদের ফুটবল জিম্মি।'

দেওয়ান শফিউল আরেফিন টুটুল দীর্ঘদিন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে জড়িত ছিলেন। তিনি অবাক হন বাফুফের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের একনায়কতন্ত্র দেখে, 'আমি মনে করি ফিফার এই শাস্তিটা সবার বিরুদ্ধেই হওয়া উচিত। বাফুফেতে আমাদের অনেক পরিচিত আছেন। তাদের বলি, তোমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করো না কেন? তখন ওরা বলে সভাপতির রুলিং থাকে, তাই কিছুই করার নেই! কিন্তু বাফুফের গঠণতন্ত্র আমি দেখেছি, এখানে সভাপতির রুলিং দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। দুর্নীতির কারণে যারা সাজা পেয়েছে, তাদের উচিত নৈতিক কারণে পদত্যাগ করা। বাফুফে প্রধান হিসেবে সভাপতির একই শান্তি পাওয়া উচিত। দুর্নীতি আপনারা প্রশ্রয় দিয়েছেন, দুর্নীতি থামাতে পারেনি। অবশ্যই তার দায় আছে। ১৬ বছর পরে তার থাকতে চাওয়াটা কারণ কী? এর পেছনে অন্য কিছু যে আছে বোঝাই যায়।'

সংবাদ সম্মেলনের সঞ্চালক ও সোনালী অতীত ক্লাবের সভাপতি আবদুল গাফফার বিশ্বাস করেন সরকারের শীর্ষ কর্তারা একদিন ঠিকই বাফুফের বর্তমান কর্তাদের অনিয়ম, দুর্নীতি রুখতে সোচ্চার হবেন, 'ফুটবল ফেডারেশনের দুর্নীতির সব প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। সালাম মুর্শেদীকে ফিফা দোষী স্বাব্যস্ত করেছে, ৫১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে প্রমাণ হয়েছে তিনি অনেক কোটেশন, অনেক ক্রয়াদেশে সাক্ষর করেছেন। তিনি একজন সাংসদ, ধনাঢ্য ব্যক্তি, বাফুফের সিনিয়র সহ-সভাপতি। তার কী অভাব আছে? তারা ফুটবলার পরিচয় কাজে লাগিয়ে সংসদ সদস্য হয়েছে, যাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে পারে। তারা ফুটবলের জন্য কিছু করেনি।'

তিনি আরো যোগ করেন, 'আমরা প্রতিবাদ করতেই এখানে এসেছি। এটা নিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবো। আমাদের ক্রীড়া মন্ত্রী মহোদয় যারা আছেন, তাদের কাছে যাবো। সালাউদ্দিন সাহেব বিভিন্ন সময় একেকজনকে ধরেন। ওনার পরিচয় কী? উনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাইয়ের দলে খেলেছেন। এটাই ওনার পরিচয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেমন ভালোবাসেন, আবার খারাপ হতেও সময় নেন না। দুর্নীতির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্স। উনি কিন্তু সাবেক আইজিপি, সাবেক সেনাপ্রধানকেও ছাড়েননি। তাই ওনার কাছ থেকে কেউ পাড় পাবেন না। ফুটবলের দুর্নীতিবাজরাও ধরা পড়বেন।'

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত