ড. মুহাম্মদ ইউনূস

আদালতে লোহার খাঁচার ভেতরে ঢুকে হাজিরা দেওয়া অভিশপ্ত জীবনের অংশ

আপডেট : ০২ জুন ২০২৪, ১০:৪০ পিএম

আদালতে লোহার খাঁচার ভেতরে ঢুকে হাজিরা দেওয়া অভিশপ্ত জীবনের অংশ বলে মন্তব্য করেছেন নোবেল বিজয়ী ও গ্রামীন টেলিকমের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

তিনি আরও বলেছেন, ‘কোনো দেবদেবী আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছে। এ পর্যন্ত আমার ও আমার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ এসেছে সেটাও এই অভিশাপের অংশ।’

গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৫ কোটি টাকা আত্মসাত ও পাচারের মামলায় আজ রবিবার (২ জুন) ঢাকার সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজিরা দিয়ে সাংবাদিকদের সামনে এমন মন্তব্য করেন তিনি।

এদিন বিশেষ জজ আদালত-৪ এ হাজিরা দেন ড. ইউনূসসহ অপর আসামিরা। এ মামলায় ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন প্রশ্নে শুনানি শেষ হয়। এ বিষয়ে আদেশের জন্য ১২ জুন ধার্য করেন আদালতের বিচারক সৈয়দ আরাফাত হোসেন। আসামিদের পক্ষে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে অভিযোগ গঠনের আবেদনের ওপর শুনানি হয়। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন। দুদকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল।

এর আগে এ মামলায় গত ২ এপ্রিল আসামিদের বিরুদ্ধে দেওয়া অভিযোগপত্র শুনানির জন্য গ্রহণ করে ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত। একই সঙ্গে এই মামলাটি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত— ৪ এ বদলির আদেশ হয়। গত ৩ মার্চ ড. ইউনূস আত্মসমর্পণ করে জামিনের আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করে অন্তবর্তীকালীন জামিনের আদেশ দেয়।

দেবদেবীর অভিশাপ লেগেছে আমার ওপর: ড. ইউনূস

আদালত থেকে বেরিয়ে ড. ইউনূস উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘মহাকাব্যে কিছু দেবদেবী থাকে যারা অভিশপ্ত। তারা যাদের ওপর অভিশাপ দেয় তারা অভিশপ্ত জীবনযাপন করে। আমিও মনে হয় এরকম মহাকাব্যের অংশ হয়ে গেছি। কোনো দেবদেবী আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছে, আমাকে অভিশাপ করেছে। সেই অভিশাপের কারণে আজকে এখানে হাজির হয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘এই অভিশপ্ত জীবনের ভিতরেও আজকে একটা শীর্ষবিন্দু আছে। আজকে এরকম একটি শীর্ষ বিন্দুতে পৌঁছালাম। এ প্রথম লোহার খাঁচায় কাঠগড়াতে দাড়াতে হলো। এটা একটা দেখার মতো দৃশ্য। আমার জীবনে এটা একটা স্মরনীয় ঘটনা যে লোহার খাঁচায় দাড়িয়ে আছি। এটা অভিশপ্ত জীবনের একটা অংশ।’

ড. ইউনূস বলেন, ‘আমরা নোবেল পুরস্কারের কথা সবাই জানি। দুইটা নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে। একটা ছিলো আমার নামে, আরেকটা গ্রামীন ব্যাংকের নামে। দুইটারই সমান গুরুত্ব ও মর্যাদা। এটা যৌথভাবে দেয়া হয়েছে তাও না। দুইটায় স্বাধীনভাবে দেয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো  নজির নেই, একজন নোবেল বিজয়ী আরেকজন নোবেল বিজয়ীর বিরুদ্ধে মামলা করতে দুদকে হাজির হয়েছে। এটা আমাদের কপালে হলো। এটা অভিশাপের একটা অংশ। যে অভিশাপ আমরা গ্রহণ করে যাচ্ছি। সে অভিশাপ এমনভাবে হয়েছে, একটা নোবেল বিজয়ী এবং এ নোবেল বিজয়ী হলো খুবই সম্পৃক্ত  নোবেল বিজয়ী। এটা আমার বিরুদ্ধে এমনভাবে নিয়ে আসলো খুব কঠিন ভাষায়, রূঢ় ভাষায় আক্রমণ করে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু রূঢ় ভাষায় আক্রমণ করে অভিযোগগুলো করে এবং যে অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। এ ব্যাপারে আপনাদের জানিয়েছি ঘটনা কি ঘটেছিল। এ ঘটনার মধ্যে কোনো সত্যতা তো নাই। যে জিনিস দিয়ে দিয়েছিলাম সেটার জন্য আমাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে টাকা মেরে দিয়েছি ইত্যাদি, ইত্যাদি।’ ড. ইউনূস আরও বলেন, ‘এ পর্যন্ত যত অভিযোগ এসেছে আমার এবং সহকর্মীদের বিরুদ্ধে তারা অভিশাপের একটা অংশ। এটা আমার কাছে মোটেই গ্রহণযোগ্য হয়নি। যে আমার বাবাকে আক্রমণ করেছে, ভাই—বোনদের আক্রমণ করেছে। এই যে সেটা অভিশপ্ত জীবনের একটা অংশ বলে গেলাম।’ 

গ্রামীন টেলিকমের শ্রমিক— কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৫ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২৩ এর ৩০ মে ড. ইউনূসসহ প্রতিষ্ঠানটির ১২ জনের নামে মামলা করে দুদক। এ মামলার অভিযোগপত্রে অনুমোদন দেওয়ার পর গত ২৯ জানুয়ারি ড. ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। মামলার অপর আসামিরা হলেন— গ্রামীণ  টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. নাজমুল ইসলাম, পরিচালক ও  সাবেক এমডি মো. আশরাফুল হাসান, পরিচালক পারভীন মাহমুদ, নাজনীন সুলতানা, মো. শাহজাহান, নূরজাহান বেগম, এস এম হুজ্জাতুল ইসলাম লতিফী,  আইনজীবী মো. ইউসুফ আলী, জাফরুল হাসান শরীফ, গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক—কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসান, ইউনিয়নের প্রতিনিধি মো. মাইনুল ইসলাম ও দপ্তর সম্পাদক মো. কামরুল হাসান। এই মামলায় গত ৩ মার্চ আত্মসমর্পণ করে জামিন পান ড. ইউনূসসহ প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট ৭ জন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত