৪ জুনের পর অন্যরকম ভারত

আপডেট : ০৩ জুন ২০২৪, ১২:৪৫ এএম

আগামী চৌঠা জুন, নিশ্চিতভাবেই ভারতের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিন। সেদিনের পর এ দেশের কিছুই আর আগের মতো স্বাভাবিক থাকবে না। ওপর ওপর সবই ঠিকঠাক থাকবে। লোকে শপিংমলে যাবে। ফেস্টিভ্যালে লোকের ভিড়ে উপচে পড়বে। দেশের মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে বসবে বৈদেশিক নীতি নির্ণয় করতে। পাশের দেশ উদ্বিগ্ন হবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজকর্ম নিয়ে। জোটনিরপেক্ষ, ধর্মনিরপেক্ষ নীতি ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে জায়গা পাবে।

জিডিপি বা দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে মিডিয়া মাথা ঘামাবে না। বেশি মাথা ঘামাতে গেলে শাস্তি হতে পারে। এক নেতা, এক দল, এক পতাকার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে ভক্তদের দল অহোরাত্র নেতা বন্দনায় মাতবে। নতুন নতুন জেল হবে, আইন হবে বিরোধী কণ্ঠস্বর ও মতকে স্তব্ধ করতে। অখণ্ড ভারতের দাবি তীব্র হবে।

এক্সিট পোল কী বলছে না বলছে তাতে কান দেওয়ার যদি দরকার নাও হয়, তবুও এটা নিশ্চিত, ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নরেন্দ্র মোদি ফের তৃতীয়বারের জন্য দিল্লির ক্ষমতায় বসতে চলেছেন। আপনি প্রশ্ন তুলতেই পারেন যে, তাহলে যে বলা হচ্ছিল এবার ভোটে বিজেপি আগের তুলনায় কম আসন পাবে।

আমরা যখন অনেকেই ভাবছিলাম যে, বিজেপির ফল খারাপ হবে, তখনই ভোটে জেতার নীলনকশা তৈরি হচ্ছিল নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ প্রমুখদের নেতৃত্বে। বিজেপিকে ধন্যবাদ দিতেই হবে। শুধু জেতার জন্য নয়, গোটা সিস্টেমকে কবজা করার জন্য। নোয়াম চমস্কি একবার বলেছিলেন, হিটলারের ফ্যাসিবাদ নিয়ে একাধিক কারণের কথা বলা হয়, অথচ কেউ একবারও উল্লেখ করেন না যে, গ্যাস চেম্বারে আবালবৃদ্ধবনিতাকে ঠান্ডা মাথায় যখন নাৎসি গেস্টাপোরা খুন করছিল, তখন শিক্ষিত, ভদ্রলোক জার্মান নাগরিকদের ভূমিকা কী ছিল!

হিটলারের মূল কৃতিত্ব ছিল জনমনে জার্মান জাতির গৌরবগাথা জাগিয়ে তোলা। এবং পাশাপাশি ইহুদিবিদ্বেষ তীব্র করা। অদ্ভুত মিল আজকের ভারতের সঙ্গে। ধর্মীয় মেরুকরণ এবার দেশের যাবতীয় সমস্যাকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনমনে অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন নরেন্দ্র মোদি হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা হয়ে মোদি কোটি কোটি লোককে বুঁদ করে রেখেছেন।

কিন্তু এ কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ১৯২৫ সালে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের জন্মলগ্ন থেকেই মনুবাদী রাষ্ট্রের যে তত্ত্ব নির্মিত হয়েছিল, আজ তা বাস্তব হতে চলেছে আরএসএসের রাজনৈতিক ফ্রন্ট বিজেপির নেতৃত্বে। দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা চলছিল। লেনিনের ওয়ান স্টেপ ফরোয়ার্ড টু স্টেপ ব্যাকওয়ার্ড নীতি বামেরা ঠিকঠাক অনুসরণ না করলে কী হবে, অক্ষরে অক্ষরে তা মেনে চলেছে সংঘ পরিবার। তার কাজ সহজ হয়ে গেছে আজকের বিশ্বব্যবস্থায়। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের আপাত পতন, ধনবাদের রমরমা, গ্লোবাল ইকোনমির দাপট, দক্ষিণপন্থি রাজনীতির অগ্রণী ভূমিকা সবমিলিয়ে অনুকূল পরিবেশে আগ্রাসী চেহারা নেওয়া সহজ হয়ে গেছে ভারতীয় জনতা পার্টির জন্য।

অন্য অনেক পশ্চিমা দেশগুলোর মতো চরম ইসলাম ফোবিয়া নিঃসন্দেহে ভারতের শাসকদের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র। নিও লিবারেল অর্থনীতির দৌলতে যে মিডল ক্লাস এ দেশে গড়ে উঠেছে তাদের বিরাট সংখ্যক মানুষ চরম ইসলামবিদ্বেষী। নরেন্দ্র মোদির উপদেষ্টাদের পরিস্থিতি বুঝতে ভুল হয়নি বলেই প্রধানমন্ত্রী খোলাখুলিভাবে ধর্মের কার্ড খেলতে দ্বিধা করেননি। সেই পুরনো জার্মানির নাজিদের মতো তিনিও হিন্দু জাতির শ্রেষ্ঠত্বের মায়া কাজল পরিয়ে দিয়েছেন জনমনে। কৃষক আত্মহত্যা যে দেশে রোজকার ঘটনা, লাখ লাখ বেকার হতাশাগ্রস্ত, সেখানে মোদির স্বপ্ন গ্রাস করে ফেলে বুঁদ করে রেখেছে গ্রাম ও শহরের জনসংখ্যার বড় অংশকে। ত্রিশ দশকের জার্মানির দেয়ালে দেয়ালে লেখা হতো ‘হিটলার তুমি আমাদের রুটি দাও, না হলে আমরা আবার কমিউনিস্ট হয়ে যাব।’ এ দেশের বুভুক্ষু জনতাও বিশ্বাস করতে বাধ্য হয়েছেন নরেন্দ্র মোদির গ্যারান্টি। আমি জানি এই গ্যারান্টি কখনো, কোনোদিনই পালিত হবে না। এ শুধুই মিথ্যার বেসাতি। তবুও এই সাময়িক আশ্বাস মেনে বাস্তব মানতে দোষ কোথায়!

কে কী ভোট দিয়েছেন তা নিয়ে জল্পনা চলুক। ভারতের তথাকথিত গণতান্ত্রিক কাঠামোর বেআব্রু চেহারা সামনে আনার কৃতিত্ব বিজেপির এটা মানতেই হবে। নেহরুর ইউটোপীয় সমাজবাদী রাজনীতি এখন অতীত। ভারত নতুন এক কর্তৃত্ববাদী শাসনের অপেক্ষায়। আগামী দিন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির জন্য ভয়ংকর হতে চলেছে। আমরা যারা বহুত্ববাদে বিশ্বাসী তাদের পরিণতি কী হতে চলেছে তা ভাবলেও শিউরে উঠতে হচ্ছে। বাকস্বাধীনতা পুরোপুরি বিপন্ন হবে। নাগরিক অধিকার কথার কথা হয়ে থেকে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো দেশ থেকে বিদায় নেবে। মোদি নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পাবে, সিদ্ধান্ত হয়েই ছিল। গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে তা পাস করিয়ে নেওয়া হলো মাত্র। পুরনো ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সঙ্গে আধুনিক ভারতের এটুকুই যা তফাৎ।

ভাববেন না এক্সিট পোল দেখে মোদি সরকার ফের আসবে বলে এত উদ্বিগ্ন হচ্ছি। প্রথমত, এক্সিট পোল সবসময় সঠিক হয় না। ২০০৪-এ বাজপেয়ি জমানায় যাবতীয় হিসাব-নিকাশ ভুল হয়েছিল। দোর্দণ্ড প্রভাবশালী অটল বিহারি বাজপেয়ি ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন। তবে সেবারের ভুল থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলেই নরেন্দ্র মোদি এবার বৈতরণী সহজে পার করবে বলে অনুমান করা যায়। তা ছাড়া মোদি অনেক চতুর। তিনি ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের সব কটা স্তম্ভ কবজা করে ফেলেছেন। করপোরেট পুঁজির সহায়তা নিয়ে সংবাদমাধ্যম, আদালত, নির্বাচন কমিশন, একে একে সব নিজের দলের কবজায় নিয়ে ভোটের রণদামামা বাজিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। নিজের দলের গণতান্ত্রিক কাঠামোটিও সুকৌশলে ধ্বংস করেছেন তিনি। ফলে নরেন্দ্র মোদিই বিজেপি, বিজেপিই নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি।

মানুষের মনে যে ঘৃণার বীজ তিনি রোপণ করেছেন দুই হাজার দুই সালে গুজরাট গণহত্যার মধ্য দিয়ে, আজ তা মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তার বিপরীতে রাহুল গান্ধী ও অন্যদের শান্তি ও প্রেমের বাণী হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে বলেই আপাতত মনে হচ্ছে। তবে যদি ধরেও নিই যে, নরেন্দ্র মোদির সরকার তৃতীয়বারের মতো নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসছে। তাহলেও সব কিছু শেষ হয়ে যাবে তা মোটেও ধরে নেবেন না। হিটলার, মুসোলিনি বাদ দিন। ফ্র্যাঙ্কো, পিনোচেত এ রকম অজস্র কর্তৃত্ববাদী শাসকের পতন ঘটেছে কুর্সি দখলের কিছু মাস, বছরের মধ্যে। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, কয়েক বছর আগে শ্রীলঙ্কার গণ-অভ্যুত্থান নিশ্চয়ই কেউই এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাননি।

ভোট বিশেষজ্ঞ প্রশান্ত কিশোর আগেভাগেই জানিয়েছেন যে, নরেন্দ্র মোদির বিপুল জয় এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। পাশাপাশি এও সতর্ক করেছেন, ভারতে এরপর গণ-আন্দোলন তীব্র হবে। শাসক যত স্বৈরাচারী পথ নেবে তত গণবিদ্রোহ বাড়বে। মোদির ভারতে ক্ষমতা দখলের রাস্তা কখনোই আর একমাত্রিক থাকবে না। সংসদীয় পথের বিকল্প গণসংগ্রাম মাথা তুলবে। বিভিন্ন রাজ্যে একাধিক লড়াই বিকশিত হবে। হবেই। পুরনো বামপন্থার পাশাপাশি নতুন বামপন্থি রাজনীতি দৃশ্যমান হবে। তবে আপাতত নিশ্চিত সামনে কঠিন সময়। অন্ধকার কাল। ১৯৪৯ সালে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট সাম্যবাদী চীন এশিয়ার বৃহৎ শক্তিধর দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০২৪-এ চরম দক্ষিণপন্থি শক্তি এশিয়ায় মাথা তুলল। বলেছিলাম যে, ঠিক একশ বছর আগে বিজেপির থিঙ্কট্যাঙ্ক আরএসএসের জন্ম হয়েছিল। সামনের বছর আরএসএসের শতবর্ষ। মনুবাদী রাষ্ট্রের সূচনাকাল হিসেবে চিহ্নিত হলো ২০২৪।

ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সাহস। ফ্যাসিস্ট শক্তি সবার আগে আপনার মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করবে। ভয় পাইয়ে দেবে। অনেক প্রগতিশীলরা ভয়ের চোটে ও ক্ষমতার লোভে দলে দলে বিজেপিতে যোগ দিলে অবাক হব না।

তৃণমূল কংগ্রেস কম আসন পেলে ওই দলে ভাঙন দেখা দেবে। কর্মী-সমর্থকদের বড় অংশ বিজেপি করবে। বামপন্থি রাজনীতির সমর্থকদের কেউ কেউ একই কাজ করলে অবাক হবো না।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন-উত্তর রাজনীতির কথা বলতে গেলে বলব, আমি মনে করি প্রথম দিকে সবাই পরস্পরের শক্তি যাচাই করে নতুনভাবে রণকৌশল ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করবে। এমনকি আগামী দিনে এ রাজ্যে তৃণমূল-বামেরা কাছাকাছি এলেও অবাক হব না। সব মিলিয়ে নতুন কোনো ফ্রন্টের জন্ম হতে পারে। যে ফ্রন্ট গণ-আন্দোলন বিকশিত করতে সক্রিয় ভূমিকা নেবে। চরম দক্ষিণপন্থি দলকে ঠেকাতে গণজোয়ার ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। তবে সব নির্ভর করছে ৪ জুন। আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী ফলাফলের ওপর।

লেখক: ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত