সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো ডিফারেন্ট টাচে’

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ০৩:০৭ পিএম

ইংরেজি ‘Reminiscence’ শব্দটির চর্চিত ভাবানুবাদ হলো সুখস্মৃতিতে ডুব দেওয়া। তবে সবার কাছে 'শ্রেফ' সুখস্মৃতিতে ডুব দেওয়া অর্থটি নিয়ে সংকোচবোধ থাকলেও বিশেষ নস্টালজিয়ায় হারিয়ে যাওয়ার ব্যাপারটায় কারোরই দ্বিমত নেই। তেমনই এক প্রেক্ষাপট নির্ভর ‘Reminiscence’ এর কথা উঠে এলো কবি ও সাংবাদিক শিমুল সালাহ্উদ্দিনের কণ্ঠে। 

দেশ রূপান্তর ডিজিটালে মেজবাহ ভাইকে নিয়ে স্মৃতিচারণাটা আমি বেশ উৎসাহ নিয়ে উপভোগ করেছি; কারণ যাকে উদ্দেশ্য করে প্রেক্ষাপটের অবতারণা, তিনি আসলেই আমার নস্টালজিয়াতে ডুবে যাওয়ার সারথী। খুলনার একটা লোকাল ব্যান্ড যখন পুরো দেশের ব্যান্ডদল হয়ে ওঠে, দিয়ে যায় নতুন ছোঁয়া, তখন তার নাম হয় 'ডিফারেন্ট টাচ'। আমাদের আষাঢ়-শ্রাবণের প্রাক্কালে সত্যিই যার কারণে শ্রাবণের মেঘগুলো আকাশে জড়ো হয়, তিনি আমাদের প্রিয় মেজবাহ ভাই, ডিফারেন্ট টাচের মেজবাহ ভাই। ‘বৃষ্টি দেখলেই, বা বৃষ্টি পড়ার কথা ভাবলেই এই গানটা আমার কানে বাজে’— শিমুল ভাইয়ের এই কথাটা একদম সত্যি। ৯০' এর দশকের শুরুর দিকেই ডিফারেন্ট টাচের জয়জয়কার। সেটা আমাদের মতো নাইনটিজ কিডদের কাছ পৌঁছেছে ভালো মতোই। আর আমাদের বাবা কাকাদের বয়েসিদের মধ্যে যারা একটু আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছে, তারাই ডিফারেন্ট টাচের পাড় ভক্ত।

বাংলাদেশি ব্যান্ড সংগীতের একটা জোয়ারের মধ্যেই ডিফারেন্ট টাচের উত্থান। কিন্তু উত্থানটাও নামের মতোই ডিফারেন্ট। বাংলা রক গানের তুমুল কাটতির পরেও ডিফারেন্ট টাচ এনেছিলো ব্লুজ ঘরানা বা সফট রক ধাচের গান। তবে অনেকের মতো আমার কাছেও মেজবাহ ভাই বা ডিফারেন্ট টাচের পপ রক স্টাইলটাই বেশি মনে ধরে। যদিও এই পপ আবার প্রচলিত ইন্ডি পপের থেকে বেশ ভিন্ন। ইন্ডি পপের উচ্চারণ, চাকচিক্ক বা মেলডি ডিফারেন্ট টাচের সাথে যায় না। ডিফারেন্ট টাচ তার গানের কথায়, কম্পোজিশনে এবং শব্দে সুরারোপে একেবারেই যেনো ভিন্ন। ইন্ডি পপ ২০ টা মশলা দিয়ে রীচ কোনো রান্না হলে ডিফারেন্ট টাচ ৫ টা মশলায় সেরে ফেলা রান্না যার স্বাদ ইন্ডি পপের চেয়ে ভালো এবং সহজ পাচ্য। অর্থাৎ ইন্ডি পপের ভাষার ভণিতা ডিফারেন্ট টাচে নাই। বাছা বাছা হালকা শব্দে কি দারুণ অনুভবের সুখ দিয়ে যায় যেনো গানগুলো। ‘দৃষ্টি প্রদীপ জ্বেলে খুঁজেছি তোমায়’ এই হলো সর্বোচ্চ জটিল লাইন। টিপসই দেয়া মেহনতি মানুষও গানের আবেগ ধরে ফেলে। মুখে হালকা হাসির রেখা ফুটে ওঠে। 

আড্ডায় মজার ছলেই ডিফারেন্ট টাচ ব্যান্ডের নামকরণের গল্প জানা গেলো। আগের ব্যান্ড ছেড়ে দিয়ে নতুন কিছু সঙ্গী নিয়ে নাম-ধাম ঠিক না করেই সোজা রেকর্ডিং করেছিলেন। কাছের মানুষদের শুনিয়েছিলেন সেই স্টুডিও ভার্সন। তখন নাকি সবাই বলা শুরু করলো ব্যান্ডের গান হওয়া সত্ত্বেও ডিফারেন্ট কিছু একটা হয়েছে। পরপর বেশ কয়েকজনের থেকে এই রিভিউ শুনেই মেজবাহ ভাইয়ের মাথায় এলো ‘ডিফারেন্ট টাচ’ নামটা। 

শিমুল ভাইয়ের সাক্ষাৎকারটা আরেকটা কারণে উপভোগ করেছি। ক্লীশে প্রশ্ন (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কমন পাবলিক প্রশ্ন) কম রেখে ঢুকেছেন ব্যক্তি মেজবাহর দর্শন সামনে তুলে আনতে। আলাপটা তাই শুধু স্মৃতিচারণেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ফিউশন মিউজিক এবং আধুনিক রেন্ডিশন করা গানের ব্যাপারে খুবই প্রগতিশীল মন্তব্য করেছেন। গানের আসল সুর আর সিগনেচার টিউন ঠিক রেখে নতুন আয়োজনকে তিনি খারাপভাবে নেন না। বরং সেটা আগের গানকে তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার সুযোগ দেয় বলে তিনি সাধুবাদ জানান। তাই বলে যেকোনো রিমিক্স বা ফিউশন তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। অসাধারণ একটা উপলব্ধি বেরিয়ে এসেছে এই আড্ডা থেকে। মেজবাহ ভাই অকপটে স্বীকার করলেন যে সব গান ভালো হয় না কারোই। কোনো গানের সুর ভালো তো লিরিক ভালো না, কোনো গানের লিরিক ভালো তো কম্পোজিশন জমে ওঠে না। এর মাঝেই কিছু গানের সব দারুণভাবে ক্লিক করে যায়। ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ ঠিক তেমনই একটা গান। তদুপরি এই গানের গীটারের সিগনেচার টিউনটা ভয়াবহরকম জনপ্রিয় হয়েছিলো। মোটেও অস্বীকার করতে চাইলেন না যে গীটারের ওই ক্যাচি সুরটা গান জনপ্রিয় করায় বিরাট ভূমিকা রেখেছে। আমিও স্বীকার করি, গীটের শেখার হাতে খড়ির সময় যে গৎবাঁধা দু-চারটে টিউন সাধারণত সব ওস্তাদ শেখায়, শ্রাবণের মেঘগুলো সেই গোত্রীয়। নিজের ব্যান্ড জীবনে সচরাচর কোনো ব্যান্ডকে অনুসরণ করেছেন কিনা এমন প্রশ্নে অকপটে তার পছন্দের দলগুলোর নাম বললেন। সোলস এবং তপন চৌধুরীর পাড় ভক্ত মনে হলো মেজবাহ ভাইকে। কেননা, ব্যান্ড ঘরানার গায়কিতে বারবার সোলস এবং তপন চৌধুরীর যেই স্ট্যান্ডার্ডের কথা। তিনি বললেন, সেটা তিনি বিশ্বাস থেকে উচ্চারণ করেছেন। সচরাচর সফলেরা অতীত অস্বীকার করে বা ভুলে যাওয়া রোগে আক্রান্ত হয়, মেজবাহ ভাই তাদের জন্য লজ্জা বয়ে আনেন। নিজের প্রথম ব্যান্ডদল ছেড়ে আসার পর সবাই একই রকম কৃতজ্ঞ থাকে না, থাকতে পারেও না। মেজবাহ ভাই পেরেছেন। শুধু পেরেছেন তাই নয়, তিনি আগের ব্যান্ডদলের প্রতি ব্যপক কৃতজ্ঞতাও স্বীকার করেন। 

বিশ্লেষণের সময় যথেষ্ট নির্মোহ মনে হয় মেজবাহ ভাইকে। তবে যুক্তির ক্ষেত্রে যেমন নিরপেক্ষ, মতামত প্রদানের ক্ষেত্রে আবার ততটাই স্বতন্ত্র তিনি। সেখানে কোনো ভণিতা নয়। নিজে যা বিশ্বাস করেন, সঠিক মনে করেন সেটা প্রকাশে তার জড়তা নেই। ইংরেজিতে যাকে বলে একে বারেই Subjective দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে Objective সাজা মানেই ছল করা। মতামত আবার Objective হয় কীভাবে? মতামত তো এজন্যই মতামত কারণ সেটা নিজস্ব বিষয়, নিরপেক্ষ বিষয় নয়।তবে সেখানে থাকতে হবে বস্তুনিষ্ঠতা। গ্রহণযোগ্য ও যুক্তিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। আর নিজের বিচার প্রকাশে বাহুল্য বা লুকোচুরির কোনো যায়গা রাখেননি মেজবাহ ভাই। শিমুল ভাইয়ের বেশ কিছু উদ্দীপক টাইপ প্রশ্নে একেবারেই অলংকারিক তোষামোদ বিবর্জিত উত্তর দিয়ে অবাক করেছেন মেজবাহ ভাই। 

বিশেষ করে, গানের শুধুই জনপ্রিয়তা পাওয়া আর শিল্পমান উত্তীর্ণ হওয়া নিয়ে তিনি পরিস্কার লাইন টেনেছেন। তার মতে ‘বুকটা ফাইট্টা যায়’ গানটা জনপ্রিয় হতেই পারে, একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সেটা গ্রহণ করতেই পারে, তবে সেটাকে শিল্পের রুচি বিচারে সামিনা চৌধুরীর একটা সুন্দর গানের বিপরীতে পুরস্কার দিয়ে প্রমোট করা উচিত না। এখানে ভাববার বিষয় আছে। কথাটা নিছক এলিটিজম পর্যায়ের ধরে যারা চিন্তা করবেন না তারা কখনোই মেজবাহ ভাইকে, ডিফারেন্ট টাচকে বুঝবেন না। 

যারা ৮০' বা ৯০' এর দশকের স্টাইল আইকন ছিলো, যাদের দেখে দুটো প্রজন্ম বেড়ে উঠলো, তাদের কথাকে হুট করে ব্যাকডেটেড ভেবে উড়িয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ না। আমি মেজবাহ ভাইয়ের সাক্ষাৎকারটা বারবার দেখি আর ভাবি, কত সাধারণভাবেই না অসাধারণ কথাগুলো বলে যান ডিফারেন্ট টাচের মেজবাহ ভাই। তিনি কি বোঝেন, তিনি আসলেই শ্রাবণের মেঘের মতো এসে আমাদের মনকে ভিজিয়ে গেলেন? তার আলাপের শুদ্ধতা মনকে বৃষ্টিস্নাত আনন্দ দিয়ে গেলো? আমার ধারণা, তিনি বোঝেন, আর তাই তো নানা বাধা বিপত্তি ঠেলে তিন দশকের যাত্রা পথে নতুন আরো গানের মেঘ আর বৃষ্টি নিয়ে হাজির হবার ঘোষণা দিয়ে গেছেন। তখনই মনে পড়লো, স্কুলের সময় থেকে কর্মজীবনের নানা বাকে মনকে হালকা করতে কোরাসে কতবার গেয়েছি, 

‘কবিতার বই সবে খুলেছি
হিমেল হাওয়ায় মন ভিজেছে 
জানালার পাশে চাপা মাধবী 
বাগানবিলাসী হেনা দুলেছে 
আজ কেন মন উদাসী হয়ে 
দূর অজানায় চায় হারাতে’

আমি জানি, মেজবাহ ভাই তার ডিফারেন্ট টাচ নিয়ে আবারো এরকম কোরাস গানের স্মৃতি তৈরির সুযোগ করে দেবেন। এজন্যই ডিফারেন্ট টাচ আমার কাছে সেই ‘Reminiscence’ যার ভাবানুবাদ "সুখস্মৃতিতে ডুব দেওয়া"।

পুরো আলাপটি আপনিও দেখে নিতে পারেন এই লিংক থেকে


লেখক: প্রভাষক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, খুলনা। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত