সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কঙ্গনা রানাউত, থাপ্পড় আর আইনের পাঁচালি

আপডেট : ০৯ জুন ২০২৪, ০৯:৩৩ পিএম

গুড্ডু খান আর চানমিয়া খানের নাম যদি আপনি না জেনে থাকেন তাতে খুব বেশি অবাক হওয়ার কিছু নেই। তারা ছত্রিশগড়ের দুই অতি মামুলি মানুষ। আর গুড্ডু এবং চানমিয়া মারাও গেলেন অতি ‘সাধারণ’ কায়দায়। সংবাদমাধ্যমের খবরে জানা যায়- ছত্রিশগড়ের এই দুইজনকে শনিবার পিটিয়ে হত্যা করা হয়, তাদের প্রথম অপরাধ তারা মুসলমান, দ্বিতীয় অপরাধ তারা গরু বহন করছিলেন। দুই-একটা মিডিয়াতে এ নিয়ে খবর এলেও এমন ‘তুচ্ছ’ খবর নিয়ে মাতামাতির কিছু নেই। আইনের তথাকথিত লম্বা হাতও খুনিদের ধরতে পারবে না। এর চেয়ে যা নিয়ে মাতামাতি হওয়া জরুরি তা নিয়ে আলোচনা করা যাক। সুন্দরী, গ্ল্যামার ঝলমলে নায়িকা থেকে এমপি হয়ে যাওয়া সদা বিতর্কিত একজনের নতুন বিতর্ক এবং তা থেকে আইনের কিছু কথা।

আপনার হাত চালানোর অধিকার আমার নাকের প্রান্ত সীমার আগপর্যন্ত- নানা সময় বিখ্যাত মনীষীর এই কথাটিকে পশ্চিমা তথা আধুনিক দুনিয়ায় মতপ্রকাশের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। সোজা ভাষায়, আপনি আমার সঙ্গে একমত না হতে পারেন, আমাকে যা ইচ্ছা বলতে পারেন। কিন্তু আমার গায়ে হাত দেওয়ার কোনও অধিকার আপনার নেই। কোনও অবস্থাতেই নেই। আধুনিক আইনে একেবারে প্রাথমিক ও স্পষ্ট আলাপ।

এই আলাপটাকে মেনে নিলে গত সপ্তাহে আমাদের আলোচিত নায়িকা কঙ্গনা রানাউত এয়ারপোর্টে কর্তব্যরত নারী নিরাপত্তাকর্মীর হাতে যে থাপ্পড়টি খেলেন তা নিয়ে আর কথা বাড়ানোর কিছু নেই। একে তো ওই কর্মী, কুলবিন্দর কৌর, আত্মরক্ষার কারণ ছাড়া অন্যের গায়ে হাত তুলেছেন, দ্বিতীয়ত দায়িত্বরত একজন কর্মী হয়ে একজন যাত্রীকে হেনস্থা করেছেন। কুলবিন্দরের চাকরি যাওয়া থেকে শুরু করে, মানহানি ও অন্যান্য শাস্তি নিশ্চিত বলেই মনে হয়। তাহলে এ রকম একটা বিষয় নিয়ে গত তিনদিন ধরে অনলাইনে এত চাপান-উতোর কেন? কেন একটা বড় অংশের নেটিজেন উলটো এই কৃষক পরিবারের কন্যাটির পক্ষে? এখানেই চলে আসে আইন, অধিকার এবং অবিচারের দুনিয়ার নানা অসংগতির গল্প।

ফার্নান্দা পিরি নামক অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন-নৃতত্বের এক শিক্ষক ২০২১ সালে একটা ঢাউস বই প্রকাশ করেন দ্যা রুল অফ লজ- আ ৪০০০ ইয়ার্স কোয়েস্ট অফ অর্ডারিং দ্যা ওয়ার্ল্ড। আইনের ছাত্র তো বটেই, সাধারণ মানুষের জন্যও এই বইটা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পাঠ। এখানে লেখক একদম গোড়া থেকে প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন আইন কি, কেন এবং কিভাবে। বইটার নাম থেকেই আন্দাজ পাওয়া যায় যে, আইন আসলে এমন একটা হাতিয়ার যা দিয়ে মানুষের তৈরি সমাজকে শৃঙ্খলায় রাখা হয়। লেখক অনেকগুলো অধ্যায়ে আইনের বিবর্তন নিয়ে লিখেন। কখনো আইন হাজির হয়েছে ঐশি বাণীরূপে, কখনো বা স্থানীয় চাহিদা ও বিশেষ অবস্থার কারণে, কখনো বা বৈশ্বিক ও চিরন্তন দ্বন্দ্ব মেটানোর বাহক হিসেবে।

এই বইয়ের আলাপটা কঙ্গনার থাপ্পড়ের ঘটনায় প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে, আধুনিক পশ্চিমা ব্যবস্থায় শরীরকে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হলেও, মানসিক পীড়ন ও আধ্যত্মিকতাবাদের ব্যাপারগুলোকে সেই তুলনায় খাটো করা হয়। সন্দেহ নেই, হাজার হাজার বছর ধরে বিশ্বের নানা প্রান্তে গড়ে ওঠা নানা ধরনের বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং তা থেকে উৎসারিত আইন একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে যায় বিধায় একটা সর্বজনীন বৈশ্বিক আইন কাঠামো করা দুরুহ। আর বাস্তবিক বিচারে, আপনার নাকের আগ পর্যন্ত আমার হাতের অধিকার এই ব্যাপারটা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে জরুরি এবং সহজ। কে কার কথায় আঘাত পেল, কার অনুভূতি ছিন্নভিন্ন হলো তা নির্ণয় করা কঠিন এবং জটিল বিধায় সর্বজনীন আইন সে ব্যাপারে বেশ ধোঁয়াশাচ্ছন্ন।

এই কারণে দেখা যায়, আধুনিক দুনিয়াতেও অপমানের বদলে খুন, খুনের বদলে প্রতিশোধ এগুলো দূর হয়নি। আমাদের আধুনিক পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গিতে বোঝা কঠিন হলেও, ব্লাড মানি বা খুনের প্রতিশোধের বদলে টাকা দিয়ে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যাপারটাও বহুলভাবে প্রচলিত। থাপ্পড়ের দাগ শুকায়ে যায় কিন্তু হৃদয়ে আঘাতের দাগ কখনো শুকায় না এই ধরনের আলাপ কাব্যিক শোনালেও মানুষের সমাজে তা অত্যন্ত স্বাভাবিক। শারীরিক আঘাত ছাপিয়ে মানসিক আঘাত অনেক বড় হওয়া মানুষকে অন্য প্রাণি থেকে আলাদা করে। ফলত আপনার নাক পর্যন্ত আমার অধিকার এই আপাত সরল বাক্যটি জটিল মানবমন এবং সমাজ বোঝার জন্য যথেষ্ঠ না। এরপরেও কথা থাকে।

আইনের মালিক আসলে কে? অন্যভাবে বলতে গেলে, আইন কি সকলের জন্য সমান? দুর্ভাগ্যজনকভাবে উত্তরটা হচ্ছে না। আইনের ইতিহাস পড়লে আমরা জানতে পারি, মূলত শাসকশ্রেণি নিজেদের সুরক্ষার জন্য নানাভাবে একে প্রণয়ন করেন এবং ব্যবহার করেন। যদিও জনতার চাপে, বিশেষত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়, আইন জনগণের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু দুনিয়ার ইতিহাস বড়ই নির্মম। এর বেশীর ভাগটাই অনায্য, অবিচারের। ফলে আইন বেশীরভাগ সময়েই অবহেলিতকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ। 
তাহলে, যে বিচার পেল না, যার অন্তরে অবিচার আর অপমানের দগদগে ঘা, সে কি আইনের বাধ্যগত চুপটি সন্তান হয়ে বসে থাকবে? সে যদি ‘আইন লঙ্ঘন’ করে শারীরিকভাবে আক্রমণ করে তাকে কি স্রেফ অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে? বলা হয় আইন অন্ধ। নায্যতার প্রশ্নে এই কথাটা বলা হলেও, আগাপাশতলা বিচার না করে কেবল সাদাচোখে দেখা ঘটনা দেখেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কারণেও কি একে অন্ধ বলা চলে?

পুরো দুনিয়ার অক্ষমতায় গাঁজায় যেসব শিশু মারা যাচ্ছে তাদের পিতামাতারা যদি ঘাতক হয়ে উঠে তবে সেই দায় কি আইনের নেই? যেই আইন গণহত্যাকারী দানবদের রুখতে পারল না। কঙ্গনার থাপ্পড় কাণ্ডের সূত্র ধরে মনে পড়ে যায় মুনতাদা আল জাইরের কথা। এই ইরাকি সাংবাদিক ২০০৮ সালে প্রবল প্রতাপশালী মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের দিকে জুতা ছুড়ে মেরেছিলেন। সেই কাজটি করে তিনি বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের, যারা অবিরত অনায্যর শিকার, তাদের কাছে নায়ক বনে গিয়েছিলেন।

কুলবিন্দরও সামাজিক মাধ্যমে নায়ক বনে গেছেন। তিনি জানিয়েছেন তিনি চাকরির পরোয়া করেন না। যেই কঙ্গনা তার মাকে অপমান করেছেন, কৃষক আন্দোলনে অংশ নেওয়াদের ১০০ টাকার ভাড়াটে শ্রমিক বলে অপমান করেছেন, সুযোগ পাওয়া মাত্রই তিনি এর শোধ নিয়েছেন। নেটিজেনরা তার সাথে একমত হয়েছেন। অবিচারের শিকার হওয়া কৃষকদের কটাক্ষ করা ক্ষমতাসীন কঙ্গনাকে আইন কোনও শাস্তি দিতে পারেনি, কৃষক সন্তানদের অপমানকে নেভাতে পারেনি।

নেটিজেনদের কেউ বলছেন কুলবিন্দরের চাকরি গেলে চাকরি দেবেন। কেউ বলছেন, তাকে অর্থ সাহায্য করবেন, এমনকি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে কঙ্গনা থাপ্পড় খেয়েছে এই খুশীতে লোকে রাস্তায় মিষ্টি বিলাচ্ছে। কেউ কেউ পুরনো টুইট তুলে আনছেন যেখানে কঙ্গনা নিজেই হলিউড তারকা উইল স্মিথের সমর্থন করছেন, যেই স্মিথ তার বউকে কটাক্ষ করায় অস্কারের আসরেই থাপ্পড় দিয়েছিলেন উপস্থাপক ক্রিস রককে। কেউ কেউ আবার কঙ্গনাই এক সিনেমার উদাহরণ আনছেন, যেখানে থাপ্পড় খাওয়া এক নারী একসময় বড় নেত্রী হন এই অন্যায়ের শোধ নিতে। হরেদরে আইনের শাসনের প্রতি সাধারণত শ্রদ্ধাশীল এইসব মানুষেদের আচরণ আইনপ্রণেতা ও আইনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাদের পর্যালোচনা করা জরুরি।

কারণ প্রচলিত আইনে কুলবিন্দর সাজা পাবেন নিশ্চিত, কিন্তু আইনের কাজ তো কেবল সাজা দেওয়া নয়, বরং সাজা দিতে বাধ্য হওয়া আইনের সবচেয়ে দুর্বলতম দিক। আইনের কাজ নায্যতা রক্ষা, শৃঙ্খলা রক্ষা। সবচেয়ে দুর্বলকে সবচেয়ে সবলের কবল থেকে সুরক্ষা। ফলে, কুলবিন্দরের সাজা দেওয়া নয়, আইনের মূল কাজ কুলবিন্দরদের নায্যতা দেওয়া। আরো কুলবিন্দর যাতে না হয় তা নিশ্চিত করা। নিশ্চিতভাবে এতে কঙ্গনাদেরও সুরক্ষা নিশ্চিত হবে।

গুড্ডু আর চানমিয়ার কথা বলে শুরু করেছিলাম। কঙ্গনাদের ঘৃনার বুলি আর রাজনীতি যাদের জীবনটাই কেড়ে নিয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই ঘৃণা না থামবে থাপ্পড় আর অপমানের গল্পগুলো থামবে না।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত