৪৪০০০ কোটির পশুর বাজার

আপডেট : ১২ জুন ২০২৪, ০১:৪৯ এএম

এক দশক আগেও কোরবানির গরুর জন্য প্রতিবেশী দেশ ভারত ও মিয়ানমারের ওপরই অতি নির্ভরশীলতা ছিল। বিশেষ করে ভারত থেকে অবৈধ পথে গরু না এলে কোরবানির সময় চাহিদা-সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি দেখ দিত। সময়ের ব্যবধানে অবৈধ আমদানির এই পশু কোরবানি থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। কোরবানির পশু উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। বছরে এখন এক কোটিরও বেশি পশু কোরবানি হয় বাংলাদেশে, যার বাজার মূল্য প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর ১ কোটি ৩০ লাখ কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত রয়েছে, যার পুরোটাই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত। এর মধ্যে ৫৩ লাখ ৬০ হাজার ৭১৬টি গরু ও মহিষ, ৭৬ লাখ ১৭ হাজার ৮০১টি ছাগল-ভেড়া ও ১ হাজার ৮৫০টি অন্যান্য পশু রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত গড়ে প্রায় এক কোটি করে পশু কোরবানি হয়। এই হিসাবে এবার কোরবানির চাহিদা পূরণ করে আরও প্রায় ৩০ লাখ কোরবানির জন্য প্রস্তুত পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।

গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, বছরে কোরবানির পশুর চাহিদা ১-২ শতাংশ করে হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। ২০২৩ সালে ১ কোটি ৪১ হাজার পশু কোরবানি দেওয়া হয়েছিল। এ বছর ১ কোটি ১ লাখ থেকে ১ কোটি ২ লাখ পশু কোরবানি হতে পারে। তবে দেশে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে এ সংখ্যা কিছুটা কমেও যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য গত ৯ জুন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মো. আবদুর রহমান এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, দেশে এবার ১ কোটি ৭ লাখ কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালে ৪৬ লাখ ৮৯ হাজার গরু ও মহিষ কোরবানি দেওয়া হয়েছিল। চলতি বছরও প্রায় একই পরিমাণের গরু-মহিষ কোরবানি হতে পারে। কোরবানির জন্য প্রস্তুত প্রতিটি গরুর গড় মূল্য ৮০ হাজার টাকা করে বিবেচনায় নেওয়া হলে চলতি কোরবানির গরুর বাজার মূল্য দাঁড়াবে ৩৭ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। গত বছর প্রায় ৫৩ লাখ ৫২ হাজার ছাগল ও ভেড়া কোরবানি হয়েছিল। গড়ে ১২ হাজার টাকা করে এসব পশুর বিক্রয় মূল্য বিবেচনায় বাজার মূল্য দাঁড়ায় ৬ হাজার ৪১২ কোটি টাকা। গরু-মহিষ-ছাগল-ভেড়া মিলিয়ে কোরবানির পশুর বাজার মূল্য দাঁড়াচ্ছে ৪৩ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা।

তবে খামারিরা জানিয়েছেন, খাবারের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় এবার পশু উৎপাদনের খরচও বেশি। সে ক্ষেত্রে এবার কোরবানির পশুর দামও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও পশুর হাট থেকে বিক্রি হওয়া জবাইকৃত কোরবানির পশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৪২ হাজার। এর মধ্যে ৪৫ লাখ ৮১ হাজার ৬০টি গরু, ১ লাখ ৭ হাজার ৮৭৫টি মহিষ, ৪৮ লাখ ৪৯ হাজার ৩২৮টি ছাগল, ৫ লাখ ২ হাজার ৩০৭টি ভেড়া এবং ১ হাজার ২৪২টি অন্যান্য পশু কোরবানি হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের গত আট বছরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৭ সালে দেশে প্রায় ১ কোটি ৪ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল। পরের দুই বছর গড়ে প্রায় এক লাখ করে বেড়েছে কোরবানি হওয়া পশু। কিন্তু ২০২০ করোনা মহামারীর কারণে স্থবির হয়ে পড়ে বাংলাদেশসহ বিশ্ব। করোনার প্রথম বছরে কোরবানি হওয়া পশুর সংখ্যা প্রায় ১০ শতাংশ কমে ৯৪ লাখ ৫০ হাজারে নেমে আসে। ২০২১ সালে এ সংখ্যা আরও কমে ৯১ লাখের নিচে নেমে আসে। তবে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলেও দেশে কোরবানি হওয়া পশুর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। সে বছর দেশে ৯৯ লাখ ৫৪ হাজারেরও বেশি পশু কোরবানি হয়। আর ২০২৩ সালে ১ কোটি ৪১ হাজার ছাড়িয়ে যায়।

বাংলাদেশে কোরবানির হাটগুলোই পশু বিক্রির প্রধান মাধ্যম। তবে কয়েক বছর ধরেই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোরবানির পশু বিক্রি হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কোরবানির সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে গ্রাহকের দোরগোড়ায় কোরবানির মাংস পৌঁছে দিচ্ছেন। এতে কোনো ধরনের ঝক্কি-ঝামেলা ছাড়াই সামর্থ্যবানরা কোরবানি দিতে পারছেন। ২০২৩ সালে ৯৬টি প্ল্যাটফর্মে ১ হাজার ১০৪টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ৩৮৭টি সরকারি উদ্যোগে অনলাইন মাধ্যমে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৯৬টি গবাদি পশু বিক্রি হয়েছে। যার বাজার মূল্য ছিল ৪ হাজার ২৩১ কোটি ৫৯ লাখ টাকার। চলতি বছর এ ধরনের উদ্যোগ আরও বেড়েছে।

সাদিক এগ্রোর মালিক মোহাম্মদ ইমরান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেনে-বুঝে করতে পারলে গরুর খামার গড়ে তোলা একটি লাভজনক ব্যবসা। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আপনাকে বৈজ্ঞানিক উপায় খামার গড়ে তুলতে হবে। উন্নত বিশ্বের অনেকে দেশে কৃষিবিজ্ঞান মেনে কম খরচে গরুর মাংস ও দুধ উৎপাদন করছে। কিন্তু আমাদের দেশ এখনো পুরোপুরি সেই পরিস্থিতিতে পৌঁছায়নি। কেননা, খামার গড়ে তুলতে ও পশু লালন পালনের জন্য যত উপকরণ রয়েছে সবটাই করপোরেট ব্যবসায়ীদের হাতে চলে গেছে। যার ফলে আমাদের জন্য পশু লালনপালন ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।’

তিনি বলেন, লাভজনক গরুর খামার গড়ে তুলতে হলে আপনাকে খামার বিষয় জানতে হবে, পাশাপাশি প্রশিক্ষণ নিতে হবে। বিশ্বের অনেকে দেশে এখন দানাদার খাদ্যের ব্যবহার কমিয়েছে। ফলে তারা কম খরচে মাংস ও দুধ উৎপাদন করতে পারছেন।

মোহাম্মদ ইমরান আরও বলেন, ‘লাইভ স্টকের ব্যবসায় সব সময় ঝুঁকি থাকেই। অনেক ছোট কারণে গরু মারা যায়। আমাদের সরকার যেই গরু লালন করতে উৎসাহিত করে, তা আমাদের আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই না। এর জন্য সব সময় বলে আসছি আমাদের হিট টলারেট গরু এনে দেওয়ার জন্য। সব মিলিয়ে খামার ব্যবসার বাজার চাঙ্গা করতে সরকারের কাছ থেকে আরও বেশি নীতি-সহায়তা প্রয়োজন।’

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ঢাকা বিভাগে ২৫ লাখ ৪৮ হাজার ১৮৪, চট্টগ্রাম বিভাগে ২০ লাখ ৫১ হাজার ৭৭৭, রাজশাহী বিভাগে ২১ লাখ ৩২ হাজার ৪৬৯, খুলনা বিভাগে ৯ লাখ ৪৯ হাজার ৫৮১, বরিশাল বিভাগে ৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৭৩, সিলেট বিভাগে ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৩৯, রংপুর বিভাগে ১১ লাখ ৪৯ হাজার ১৮৭ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৯০২টি গবাদি পশু কোরবানি হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘এবার নিশ্চয়ই কোরবানির পশুর বাজার বাড়বে। কেননা, পশু পালনে ব্যবহৃত সব ধরনের খাদ্য উপকরণের দাম বেড়েছে। সেই অনুযায়ী গরুর দাম ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়তি থাকবে। তা ছাড়া দেশের প্রেক্ষাপট অনুযায়ী প্রতি বছর কোরবানির পশুর চাহিদা বেড়ে থাকে। পাশাপাশি আমাদের কৃষকরাও পাল্লা দিয়ে গরু উৎপাদন করছেন। অর্থাৎ স্থানীয় পর্যায়ের উৎপাদন দিয়ে আমাদের চাহিদা মিটিয়ে ২০-২৫ লাখ কোরবানির পশু উদ্বৃত্ত থাকে।’

এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (উৎপাদন) ড. এ বি এম খালেদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, চাহিদার দিক থেকে বছর বছর ৪-৫ শতাংশ পশু বেশি কোরবানি হয়। ৫-৭ বছর আগেও এর আনুমানিক বাজার মূল্য ছিল প্রায় ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা। তবে আমরা দেখেছি পশু পালনের সমস্ত উপকরণের দাম কয়েক বছর ধরেই বাড়ছে। তার একটা হিসাব করে দেখা গেছে, এর বাজারটা আমাদের দিন দিন বাড়ছে।’

একটা সময় কোরবানির পশুর চাহিদার অন্তত ৬০-৭০ শতাংশ মেটানো হতো ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসা গরু দিয়ে। তবে গত এক দশকে সেই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে। ২০১৪ সালের পর ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ হওয়ার পর থেকেই স্থানীয় পর্যায়ের খামারিদের প্রচেষ্টায় পশু উৎপাদনে এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ। ফলে কোরবানির চাহিদার পুরোটা দেশীয় উৎপাদিত পশু দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে। ২০১৪ সালে ভারত থেকে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের কোরবানির গরু অনানুষ্ঠানিক পথে আসত। সেই বাজার এখন ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান হিসাব অনুযায়ী, দেশে গত সাত বছরে গবাদি পশু উৎপাদন বেড়েছে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত। ২০১৭ সালে দেশে উৎপাদিত কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৫ লাখ ৫৭ হাজার, যা ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৩০ লাখের কাছাকাছি। প্রতি বছর শুধু কোরবানির জন্যই এক কোটিরও বেশি পশুর সরবরাহ দিচ্ছেন স্থানীয় খামারিরা।

এদিকে ৭ বছরে রেকর্ড গড়ে পশু উৎপাদন হলেও এর চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে ভোক্তাকে। সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ বছরে প্রতি কেজি গরুর মাংসের দাম বেড়েছে ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ, ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রতি কেজি গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে ৫৬০ টাকায়, যা ৩ বছরের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ২৪০ টাকা বেড়ে বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৭৫০-৮০০ টাকায়।

এদিকে আসন্ন কোরবানির ঈদ সামনে রেখে রাজধানীসহ সারা দেশে বসছে কোরবানির পশুর অস্থায়ী হাট। বিশেষ করে ঢাকার হাটগুলো আগামী ১৩ জুন থেকে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এরই মধ্যে একাধিক হাটে গরু উঠতে শুরু করেছে। ঢাকায় এবার পশুর হাট বসছে ২২টি। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ১১টি অস্থায়ী ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) ৯টি অস্থায়ী পশুর হাট বসছে। ক্রেতা-বিক্রেতায় মুখরিত এই হাটগুলোয় বেচাকেনাও শুরু হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত