ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার খুন হয়েছেন জানানো হলেও তার মরদেহ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। গুম করার জন্য মরদেহ টুকরো টুকরো করার কথা বলা হয়েছে। কিছু মাংসখণ্ড, হাড় উদ্ধার করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এতদিনেও জানা যায়নি এসব আলমত আনারের কি না। খুনের পেছনে থাকা মূল পরিকল্পনাকারী কারা সেটা কবে জানা যাবে বা আদৌ জানা যাবে কি না তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।
কারণ এমপি আনার হত্যাকাণ্ডের তদন্তকারী সংস্থাগুলো একেক সময় একেক ধরনের তথ্য পাওয়ার কথা জানাচ্ছে। প্রথম দিকে বলা হচ্ছিল, চোরাচালানের লেনদেন নিয়ে বিরোধে আনারকে হত্যা করা হয়েছে। আবার বলা হচ্ছে রাজনৈতিক কারণে তাকে খুন করা হয়েছে। এতে জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার ইন্ধন রয়েছে। তবে সর্বশেষ ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুকে রিমান্ড শেষ না হতেই আদালতে সোপর্দ করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গ্রেপ্তারের আগে তিনি একজন প্রভাবশালী নেতার বাসায় ছিলেন এমন তথ্যও জানা গেছে। তাকে আটকের পর আনার হত্যার মূল পরিকল্পনায় প্রভাবশালীদের জড়িত থাকার কথাও তদন্তকারী সূত্রে জানা গেছে।
এছাড়া আনারের ছোট মেয়ে মুমতারিন ফেরদৌস ডরিনের ভারতের ভিসা পেতে দেরি হওয়া ও আবার ভিসা হওয়ার পরও কলকাতায় না যাওয়ায় কানাঘুষা হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। এর মধ্যে মাস্টারমাইন্ড হিসেবে পরিচিতি পাওয়া আকতারুজ্জামান শাহীনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিস জারি হয়নি এখনো। এমনকি পুলিশ সদর দপ্তরের তিন দফা আবেদনও আমলে নেয়নি ইন্টাপোল। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায় যাদের নাম ঘুরেফিরে আসছে তাদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় না আনায় তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সব মিলিয়ে আসল পরিকল্পনাকারীরা চলে যাচ্ছেন পর্দার আড়ালে। মামলার ভবিষ্যৎ নিয়েও সন্দিহান অনেকেই। তবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলেছেন, সঠিক পথেই তদন্ত হচ্ছে। যেসব রাঘববোয়াল আনার হত্যাকাণ্ডে জড়িত আছে তাদের কিছুতেই ছাড় দেওয়া হবে না।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, গত ১২ মে সড়কপথে চিকিৎসার নামে কলকাতায় গিয়ে নিখোঁজ হন সংসদ সদস্য (এমপি) আনোয়ারুল আজীম আনার। ১৩ মের পর থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না এমন অভিযোগ করেন পরিবারের সদস্যরা। আনারের মেয়ে ডরিন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের শরণাপন্ন হন। ১৮ মে কলকাতার বরাহনগর থানায় নিখোঁজের ডায়েরি করেন কলকাতার ১৭/৩ মণ্ডলপাড়া লেনের বাসিন্দা গোপাল বিশ্বাস নামের এক ব্যক্তি। গোপাল আনানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবেই পরিচিত। জিডিতে বলা হয়, আনারের সঙ্গে তার ২৫ বছর ধরে পারিবারিক সম্পর্ক। ১২ মে সন্ধ্যা ৭টার দিকে তার বাড়িতে আসেন। ১৩ মে স্থানীয় সময় দুপুর পৌনে ২টার দিকে ডাক্তার দেখানোর জন্য তার বাড়ি থেকে বের হন আনার। যাওয়ার সময় তিনি গোপালকে বলে যান, দুপুরে খাবেন না। সন্ধ্যায় ফিরে আসবেন। পরে তিনি কলকাতা পাবলিক স্কুলের সামনে এসে নিজেই ভাড়া করা গাড়িতে করে চলে যান। তারপর থেকে আনার আর আসেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে গোপালকে একটি বার্তা পাঠিয়ে জানানো হয়, বিশেষ কাজে তিনি দিল্লি যাচ্ছেন।
এরপর ২২ মে আনারকে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হন বাংলাদেশের পুলিশের গোয়েন্দারা। পাশাপাশি কলকাতার সিআইডিও হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করে। এরপর বাংলাদেশে তিনজন ও ভারতে একজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয়। আরেকজনকে নেপালে আটক করে কলকাতায় নেওয়া হয়। তারা সবাই আনার খুনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন এবং কীভাবে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে সে কথা জানিয়েছেন, যা তদন্তকারীদের সূত্রে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) জানায়, তাদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজন হলেন খুনি দলের নেতৃত্ব দেওয়া চরমপন্থি নেতা আমানুল্লাহ সাইদ ওরফে শিমুল ভূঁইয়া, শিলাস্তি রহমান ও তানভীর ভূঁইয়া ওরফে ফয়সাল আলী। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে বিশদ তথ্য পাওয়ার কথাও জানায় ডিবি। তিনজনই ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন আদালতে। তাদের তথ্যর ভিত্তিতে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগ নেতা কাজী কামাল আহম্মেদ ওরফে গ্যাস বাবুকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনিও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। রিমান্ডে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল করিম মিন্টুকে গ্রেপ্তার করে ৮ দিনের রিমান্ডে নেয় ডিবি পুলিশ। মিন্টু ও গ্যাস বাবু আনার হত্যাকাণ্ডে জড়িত অনেক রাঘববোয়াল জড়িত বলে তথ্য দিয়েছে। মিন্টুর রিমান্ড শেষ না হতেই আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। আবার ডিবির তিন কর্মকর্তা কলকাতা ও নেপালে গিয়ে মামলার তদন্ত করে এসেছেন। কলকাতা পুলিশও বাংলাদেশে এসে ঘুরে গেছে।
কলকাতায় জিহাদ হাওলাদার নামের বাংলাদেশের এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি মুম্বাইয়ে কসাই হিসেবে কাজ করেন। সেখান থেকে তাকে কলকাতায় আনার কথাও তদন্তকারীরা জানান। নেপালে গ্রেপ্তার করা হয় সিয়াম নামের আরেকজনকে। কলকাতা পুলিশ তাকে হেফাজতে নিয়েছিল।
মিন্টুর জবানবন্দি না দেওয়ায় বিতর্ক : নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, মিন্টু যদি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতেন, তাহলে বিতর্ক হতো না। আসলে মিন্টুকে ধরা নিয়ে তারা ঝামেলায় ছিলেন। শেষমেশ তাকে ধরার পর নানা জায়গা থেকে চাপও আসে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মিন্টু যে জড়িত তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তিনি আরও বলেন, আনার হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি তালগোল পাকিয়ে যাওয়ার দিকেই যাচ্ছে বলে তার মনে হচ্ছে। গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে রাঘববোয়ালদের নাম জানা গেলেও তাদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা যাচ্ছে না। তাদের বিষয়ে ‘অচেনা’ বাধা আসছে।
ফরেনসিকের প্রতিবেদন না পাওয়ায় বিস্ময় : মাংসের টুকরো ও হাড়গোড় উদ্ধার করা হয়েছে প্রায় বিশ দিনের মতো হয়ে গেছে। ফরেনসিক প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। আর এই প্রতিবেদন পেতে এতদিন লাগারও কথা নয় বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, মামলাটি নিয়ে কলকাতা পুলিশ বেশ আন্তরিক। কিন্তু ফরেনসিক প্রতিবেদন কেন পাওয়া যাচ্ছে না তা বোঝা যাচ্ছে না।
একই কথা বলেছেন আনারের স্বজনরা। তারাও এ নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, এসব মাংসখণ্ড বা হাড় এমপি আনারের কি না এখনো জানা যায়নি। মামলাটি কোন দিকে যাচ্ছে তাও বোঝা যাচ্ছে না। মরদেহ না পেলে বা মরদেহের কোনো আলামত না পেলে কোনো ধরনের মৃত্যু সনদও পাওয়া যাবে না। কলকাতার আইন অনুযায়ী, মৃত কোনো ব্যক্তির লাশ পাওয়া না গেলে মৃত্যু সনদ জারি করতে সাত বছর সময় লাগতে পারে।
মূল পরিকল্পনাকারীদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ : পুলিশ সূত্র জানায়, মূল পরিকল্পনাকারীদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশ ও কলকাতা পুলিশ। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী কারা তাদের নামও উদঘাটন করা হয়েছে। কী নিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে সেই তথ্যর বিষয়েও তদন্তকারী সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে। সোনা ও হুণ্ডির টাকা আত্মসাৎ করা নিয়ে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে বিরোধ থাকায় আনারকে হত্যা করার হয়েছে এমন তথ্য পাচ্ছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। ওই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে একজন যশোর ও দুজন ঝিনাইদহের বাসিন্দা। আবার তাদের মধ্যে একজন মাস তিনেক আগে দেশের বাইরে চলে গেছেন। প্রায় ৬ মাস আগ থেকে আনারকে হত্যা করার ছক আঁকেন পরিকল্পনাকারীরা। গ্যাস বাবু ও মিন্টুকে ধরার পর ঢাকার কয়েকজন ব্যবসায়ীর নামও পেয়েছেন তদন্তকারীরা।
পুলিশ সূত্র জানায়, পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৩ মে ব্যবসার কথা বলে আনারকে কলকাতার নিউটাউনের সঞ্জিভা গার্ডেন নামের আবাসিক এলাকার ফ্ল্যাটে নিয়ে যায় খুনিরা। ফ্ল্যাটে প্রবেশের ত্রিশ মিনিটের মাথায় তাকে হত্যা করে খুনিরা এবং লাশ গুম করে।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে সোনা চোরাচালান ও হুণ্ডিব্যবসার প্রায় দেড়শ কোটি টাকার বিরোধ। তার মধ্যে শাহিনের হুণ্ডির ৫০ কোটি টাকা ও যশোর এলাকার প্রভাবশালীর সোনা পাচারের একশ কোটি টাকা। যশোরের শার্শা, চুয়াডাঙ্গার দর্শনা, কালীগঞ্জ, শৈলকুপার সীমান্ত এলাকার চোরাচালানসহ সব কারবারের একক নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিলেন কয়েকজন রাঘববোয়াল। তাদের কর্মকা- চিহ্নিত হলেও নেওয়া হয়নি কোনো ধরনের ব্যবস্থা।
ডরিনের না যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন : আনারের মেয়ে ডরিন কলকাতায় যাওয়ার জন্য ঘটনার পরপরই ভিসার জন্য আবেদন করেন। বেশ কয়েকদিন ঘুরে ভিসা পেয়েছেন। কিন্তু তিনি এখনো যাননি কলকাতায়। কেন যাননি এই বিষয়ে জানতে চাইলে ডরিন কিছুদিন আগে বলেছিলেন, কলকাতা পুলিশ যেতে বললে তিনি যাবেন। আনারের ব্যক্তিগত সহকারী আব্দুর রউফও বলেছেন, এমপির পরিবারের তিন সদস্য ও তিনি ভারত যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন। গত ২৪ মে থেকে তারা ভিসা পাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ভিসা পাওয়া গেছে কিছুদিন আগে।
জিজ্ঞাসাবাদই করা হয়নি গোপাল বিশ্বাসকে : কলকাতায় গোপাল বিশ্বাসের বাড়ি থেকে বের হয়ে আনার নিখোঁজ হন। এ বিষয়ে জিডি করেন গোপাল। কিন্তু আলোচিত এই ব্যক্তিকে কলকাতা পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনেনি। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পুলিশ কর্মকর্তারাও তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি বলে জানা গেছে। পুলিশ তথ্য পেয়েছে, সোনা কারবারের সূত্র ধরেই আনারের সঙ্গে ২৫ বছরের বন্ধুত্ব গোপালের। একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, তদন্তের শুরু থেকে গোপাল তাদের সন্দেহের ঊর্ধ্বে ছিলেন না।
