বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০২৪, ৩ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আফগানিস্তান ক্রিকেট দলের প্রতি বাংলাদেশিদের অদ্ভুত এক অশ্রদ্ধা 

আপডেট : ২৩ জুন ২০২৪, ১২:৩১ পিএম

আফগানিস্তান ক্রিকেট দল আরও একটা দারুণ জয়ের ইতিহাস লিখল। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সুপার এইটের গুরুত্বপূর্ণ খেলায় অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে নিজেদের সেমিফাইনালে যাওয়ার আশা বাঁচিয়ে রাখল। ব্যাটিং, বোলিং এমনকি ফিল্ডিং ডিপার্টমেন্টেও আফগানিরা এদিন ছিল অনেক এগিয়ে। 

আর এই জয়টিকে আপসেট বলেও আখ্যা দেওয়া যাচ্ছে না। বরং গত ওয়ানডে বিশ্বকাপে প্রায় জেতা ম্যাচ আফগানিস্তান হেরে গিয়েছিল গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের এক অতিমানবীয় ইনিংসে। এর আগের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাত্র চার রানে হারে আফগানিস্তান। গত ওয়ানডে বিশ্বকাপে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ডকে হারায়। চলমান বিশ্বকাপেও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অনেক বড় ব্যবধানে জেতে। মোদ্দা কথা, আফগানিস্তান এখন বিশ্ব ক্রিকেটের এক সমীহ জাগানো নাম। বিপক্ষ যেই হোক, এই দলটার শরীরী ভাষায় থাকে জয়ের আকাঙ্ক্ষা। 

একেতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, তায় সুযোগ-সুবিধা খুবই সীমিত। নিজেদের দেশে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার পর্যন্ত সুযোগ নেই দলটার। অথচ শুধু ক্রীড়াশৈলি না, হার না মানার মানসিকতার কারণে এরা রূপকথার গল্পের মতো সিরিয়াল উইনার হয়ে উঠছে। স্পোর্টসের দুনিয়া যেইরকম গল্প দেখতে চায় সেইরকম গল্পই লিখে চলেছে আফগানিস্তান। তাই সমস্ত ক্রিকেট বিশ্বে, নিরপেক্ষ দর্শকদের কাছে এরা হয়ে উঠছে ভালোবাসার একটি দল।

ব্যতিক্রম বাংলাদেশে। আফগানিস্তানের জয়ে বাংলাদেশের কিছু মানুষ এদের অভিনন্দন জানায়, খুশি হয় কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই বেজার হয়। আর আফগানিস্তান হেরে গেলে এরা দারুণ উদ্যমে ঠাট্টা রসিকতা করে। দলটাকে ছোট করে। রশিদ খানের মতো বিশ্বসেরা বোলারকে বয়স নিয়ে খোঁচা দেয়। এমন না যে সিনিয়র লেভেলে বয়স লুকালে কোন বাড়তি ফায়দা হয়। তবুও আফগানিদের অপছন্দ করা বাংলাদেশি ক্রিকেট ভক্তরা এই আমোদে গা ভাসিয়ে তাঁকেসহ গোটা দলকে অপমান করতে চায়। 

কিন্তু কেন? যেই দলটা বছর পনেরো আগেও ক্রিকেটের পঞ্চম স্তরে খেলতো, যাদের উত্থান যে কোন ক্রিকেট ভক্তকে আমোদিত করবে, তাঁদের প্রতিই এত ক্ষোভ কেন? 

বলা হয়, এ দেশের বড় অংশের মানুষ যে কোন ব্যাপারেই ধর্মকে টেনে আনে। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর প্রতি ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি কাজ করে। এমনকি আফগানিস্তান যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন আর যুক্তরাষ্ট্রের দখলে ছিল, তাঁদের হয়ে লড়াই করার জন্য, দখলদার হতে মুক্ত করার জন্য এ দেশ থেকেই বহু মানুষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। আফগান মুজাহিদদের প্রতি এ দেশের বড় অংশের লোকের সমর্থন ও ভালোবাসা তো আছেই। ব্যতিক্রম আফগান ক্রিকেট দলের বেলায়। 

অথচ পাকিস্তানের বেলায় এর উল্টোটাই দেখা যায়। সে দেশের সঙ্গে এক তিক্ত অতীত,গণহত্যার স্মৃতি থাকা সত্ত্বেও ক্রিকেট মাঠে বাংলাদেশিরা অকাতরে পাকিস্তানকে সমর্থন দেয়। পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের রোল মডেল ও নায়ক ভাবে। তাঁরা ম্যাচ পাতানো সহ নানারকম অপকর্ম করলেও ভিলেন হন না, ট্রলের শিকার হন না। কেউ কেউ দাবি করেন, পাকিস্তান দারুণ খেলে বলেই তাঁরা এ দলের ভক্ত, ধর্ম ব্যাপার না। 

কিন্তু, এ যুক্তি বড় মাজুল। ইমরান খান, ওয়াসিম আকরামের মতো ক্রিকেটিং কিংবদন্তি পাকিস্তান দলে খেলেছেন ঠিকই, তবে দলটা কোনকালেই বিশ্ব ক্রিকেটে ছড়ি ঘোরাননি। একটা ওয়ানডে বিশ্বকাপ আর একটি টি টুয়েন্টি বিশ্বকাপ এদের অর্জন। আমরা যদি সত্তর আর আশির দশক ধরি তখন ক্রিকেটের অবিসংবাদিত রাজা ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর নব্বইয়ের পর থেকে অস্ট্রেলিয়া। ভালো খেলাই যদি যুক্তি হতো এ দেশে এই দুই দলের সমর্থকই বেশি থাকার কথা। কিন্তু পাকিস্তানের তুলনায় এদের সমর্থকের সংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা। ফলে ‘সেরা দলের’ যুক্তি ধোপে টিকে না। ধর্মই বড় ব্যাপার, সচেতনে বা অচেতনে। ব্যাপারটা অবশ্য দোষের কিছু না। ক্রীড়া সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, মানুষ কেবল গ্ল্যামার দেখেই সমর্থন করে না, এর পেছনে হাজারটা কারণ আছে। মুসলিম ভ্রাতৃত্ব তার একটা হতেই পারে। কিন্তু, সমস্যা হচ্ছে সেই লেন্সে তো আবার আফগানরা বাদ পড়ছেন। 

এই রহস্য ভেদ করতে হলে আরেকটা ব্যাপার মাথায় নিতে হবে। বিশ্ব ক্রিকেটে পাকিস্তান অনেক আগে থেকেই পরাশক্তি, কিন্তু আফগানিস্তানের উত্থান অনেক পরে। যদ্দিনে এই দলটা ক্রিকেট বিশ্বে স্থান করে নিল তদ্দিনে বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই টেস্ট দল। এ দেশে ক্রিকেটের উন্মাদনা আকাশচুম্বী। কেবল এক নম্বর খেলাই নয়, প্রায় সমস্ত সুযোগ-সুবিধাই পায় এই খেলাটি। রীতিমতো জাতীয়তাবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে। যদিও মাঠের সাফল্য তাঁর ছিটে ফোটাও নাই। 

এইখানেই পরিচয়ের রাজনীতির আরেকটা দিক উন্মোচন হয়। মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ খুব শক্তিশালী, কিন্তু তা নিজের সত্তাকে ছাপায়ে যেতে পারে না বেশির ভাগ সময়। নতুন প্রজন্ম ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ দলের মধ্যে আত্মপরিচয় খোঁজার একটা চেষ্টা করে, আর জাতীয়তাবাদী প্রভাব তো ছিলই। ফলে, বাংলাদেশ বাদে অন্য দল এমনকি পাকিস্তানের প্রতিও ভালোবাসা কমতে থাকে। 

কিন্তু, কথা হচ্ছে, ভালোবাসা না থাক,মুসলিম দেশ আফগানিস্তানের প্রতি এত বিদ্বেষই থাকবে কেন? এইখানে চলে আসে জাতিগতভাবে ইগো আর ছোটবড় করে দেখার প্রবণতা। আমাদের সংস্কৃতিতে বড়দের ইজ্জত করা বাধ্যতামূলক। স্কিলের চেয়ে বয়স এইখানে প্রাধান্য পায়। আর ছোটরা যদি দারুণ কিছু করে বড়দের ছাপিয়ে যায় তাঁকে দেখা হয় বেয়াদবি হিসেবে। ব্যাপারটাকে ক্ষমতার প্রতি অসীম মাথা নোয়ানোও বলা যেতে পারে, অন্যদিকে আফগানিরা ঐতিহাসিকভাবেই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে। যা হোক, সে আরেক বিশাল আলোচনা। 

আফগানিস্তানকে বাংলাদেশিরা ছোট আর বড়র সেই দণ্ড দিয়ে মাপে। একেতো বাংলাদেশের ক্রিকেট সমস্ত রকম সুবিধা নিয়ে আগায় না,বরং ক্রমাগত হারে ক্রিকেট বিশ্বের হাসির খোরাক হয় অন্যদিকে এই ‘পুচকেরা’ শুধু আগায়ই না, ক্রিকেট বিশ্বের ভালোবাসা পেতে থাকে। এই যুগল প্রভাবে সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে আফগানদের ওপর। 

আফগানদের দারুণ উত্থান অনেকের গায়ে জ্বালা ধরায়, রশিদদে আচরণকে বেয়াদবি বলে গণ্য করে। অথচ স্পোর্টসে বড় ছোট বা বেয়াদবি বলে কিছু নাই। পরম শক্তিশালী দৈত্য গোলিয়াথের বিরুদ্ধে ডেভিডের সাহস করে দাঁড়ানোটাই স্পোর্টসকে গ্রেট করে। প্রবল শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে জেতার ইচ্ছা নিয়ে নামাটাই খেলোয়াড়দের গৌরব বাড়ায়। 

বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নাই, বাংলাদেশি সমর্থকেরাই প্রবল উল্লাসে, গর্বে ফেটে পড়ে যখন এ দেশের ক্রিকেটাররা ভারতের মতো মহাশক্তিধরদের বিরুদ্ধে চোখে চোখ রেখে কথা বলে, খেলে, জেতে। ধরে দেয়নি তখন বেয়াদবি বলে বিবেচিত হয় না। 

আমরা বড় দুঃখী জাতি। আমাদের সেই উদ্ধত শির আমরা ধরে রাখতে জানি না। আমাদের উন্নতি তো দূর, স্বপ্ন দেখার সাহসও আমাদের নাই। শুধু তাই না, আমরা সেই হতাশা ভুলতে পরশ্রীকাতর হয়ে উঠি। অন্যর খুশিতে ভাগ বসাতে পারি না, অন্যর বিপদে পাশবিক আনন্দ লাভই আমাদের নারকীয় জীবনের সম্বল হয়ে উঠে। 

এ কারণে ঠোঁট কাটা কবি, ভদ্রতার সীমারেখা না মানা কবি নবারুণ ভট্টাচার্য পুরন্দর ভাটের মুখ দিয়ে বলেন,
“উড়িতেছে ডাঁস, উড়িতেছে বোলতা, উড়িতেছে ভীমরুল,
নিতম্বদেশ আঢাকা দেখিলে ফুটাইবে তারা হুল।
মহাকাশ হতে গু-খেকো শকুন হাগিতেছে তব গায়
বাঙালি শুধুই খচ্চর নয়, তদুপরি অসহায়।”

আফগানদের দারুণ সাফল্যর দিনে আমাদের মনমরা হয়ে থাকা এক অসহায় অবস্থাকেই দেখায়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত