আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে হলে দুর্নীতিটাকে আগে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। মঙ্গলবার (২৫ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে এ কথা বলেন তিনি।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বাজেট অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, দুর্নীতি সরকারের সমস্ত অর্জন ম্লান করে দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বারবার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। তারপরেও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। আজকে বাজারে অস্থিতিশীল দেখা যায়, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। বাজার কখনো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না, যদি বাজারে দুর্নীতির অবাধ প্রবাহ থাকে, সেটি কখনো নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, এবার দুটি ঘটনা সারাদেশে আলোচিত হয়েছে। একটা গরু এক কোটি টাকা বিক্রি হয়েছে। যার মাংস হবে ১৪শ কেজি। প্রতি কেজি ৭ হাজার টাকা করে। এটা কারা কিনল? কেন কিনল? বৈধ উপায়ে আয়ে এটা কিনতে পারে না। অবৈধ উপায়ে যাদের আয় তারা এভাবে কিনতে পারে। একটা ছাগল কিনল ১৫ লাখ টাকা দিয়ে। এটা কারা করতে পারে। যাদের অবৈধ আয় আছে তারা। বৈধ আয়ে কখনো টাকা পানিতে ফেলতে পারে না।
মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, মূল্যস্ফীতি প্রয়োজন ছিল সংকোচনমূলক মূদ্রানীতি ও রাজস্বনীতি। বাজেটে প্রতিফলন দেখেছি। উন্নয়ন ঋণ বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণভাবে ধার্য করা হয়েছে। এতে ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে দেশে ব্যাংক ঋণ বেড়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক ও আন্তর্জাতিকভাবেও ঋণের সুদের হার বেড়েছে। চড়া সুদে ঋণ নিয়ে যদি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করতে হয় তাহলে অর্থনীতির উপর চাপ সৃষ্টি হবে। এ ক্ষেত্রে অনুৎপাদনশীল খাতে কাঁটছাট করে ঋণের পরিমাণ কমানোর প্রস্তাব করেন তিনি। ঋণ কমানোর ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা না করে ১ লাখ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার অনুরোধ করেন হানিফ। যদি ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয় তাহলে দেশের শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ রুদ্ধ হবে।
আমদানির ক্ষেত্রে অ্যাডভান্স ইনকামট্যাক্স কাটা হয়। যা পরবর্তীতে ট্যাক্স রিটার্নের সময় সমন্বয় করা হয়। দেখা যায় অবশিষ্ট যেটা বেঁচে থাকে রিফান্ড করা হয়। কিংবা পরবর্তী বছরে ট্যাক্সের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। কিন্তু গত দুই বছরে কিছু অসাধু কর্মকর্তা অনেক কারচুপি করার কারণে ট্যাক্স রিফান্ড বন্ধ করে দেয় এনবিআর। এটা ভালো সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে ক্যারিফরওয়ার্ডও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কালো টাকা সাদা করার বিধান অনেক আগে থেকে এসেছে। বিএনপিসহ অনেক দল এর সমালোচনা করছে। তারা কোন মুখে সমালোচনা করে। আয়নায় চেহারা দেখে বিএনপির লজ্জা হওয়া উচিত ছিল। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় ৩৩ লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করেছিলেন। তাদের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান ৩১ লাখ টাকা দিয়ে কালো টাকা সাদা করেছিল। যে দলের প্রধান কালো টাকা সাদা করেছিল তাদের পক্ষে সমালোচনা করা শোভন নয়।
১৫ শতাংশ কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগের বিরোধিতা করে হানিফ বলেন, আমি বৈধভাবে আয় করলে ৩০ শতাংশ কর দিতে হয়, আরেকজন অবৈধ, অপ্রদর্শিত আয় করে ১৫ শতাংশ কর দিয়ে বৈধ করবে এটাকে যৌক্তিক মনে করি না। এতে অনেকেই ট্যাক্স দিতে অনিহা প্রকাশ করবে। তারা ভাববে এই বছর অপ্রদর্শিত রেখে আগামী বছর ১৫ শতাংশ কর দিয়ে বৈধ করব। সে কারণে এক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ কর দিয়ে বৈধ করার সুযোগ দেওয়ার দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, আমরা দেখি দফায় দফায় বিদ্যুৎমূল্য বৃদ্ধি করা হয়। যার ফলে সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে তা করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে আছে। আমাদের এখন দরকার ব্যক্তিগত যেসব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের চুক্তি আছে সেগুলোর পুনর্মূল্যায়ন করা হোক। ১০ বছর আগে যে ট্যারিফ দেওয়া হয়েছিল, এখন আবার যে ট্যারিফ আছে সেটার তুলনায় অনেক কম। সেক্ষেত্রে বিদ্যুৎ মূল্য অনেক কমে যাবে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, সরকারি কর্মচারীদের দফায় দফায় বেতন বাড়ানো হয়েছে। তাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তারপরও কেন দুর্নীর্তি হবে? আজকে দুর্নীতি কথা উঠলে সকলে প্রথমে আঙ্গুল দেখায় রাজনীতিবিদদের দিকে। রাজনীতিবিদরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। এটা দেশে প্রচলন আছে। অথচ সংসদ সদস্যদের মধ্যে মন্ত্রী ছাড়া কারও নির্বাহী ক্ষমতা নেই। তারা কীভাবে দুর্নীতি করবে? দুর্নীতি হয়তো সরকারের উন্নয়ন ও কেনাকাটায়। সেখানে একজন রাজনীতিবিদদের সুযোগ কোথায়? যদি সরকারি কর্মকর্তারা তার সঙ্গে জড়িত না থাকে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার পরে এ যাবতকালে সবচেয়ে বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন সরকারি কর্মজীবীদের। দফায় দফায় বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। তারপরেও দুর্নীতি কমানো সম্ভব হয়নি। দুর্নীতির বিধি-বিধানকে বরং আরও নমনীয় ও শিথিল করে দেওয়া হয়েছে। সরকারি-চাকরির নতুন বিধি অনুযায়ী দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের শুধু চাকরিতে বহালই নয়, পদোন্নতি, সসম্মানে অবসর, পেনশন সুবিধার সুযোগ রাখা হয়েছে। বিধিমালায় একাধিকবার দুর্নীতির সুযোগ রাখা হয়েছে। দুর্নীতির প্রবণতার পরেও ঘুষ গ্রহণকে দুর্নীতির বিধিমালায় সংজ্ঞাভুক্ত করা হয়নি। এছাড়া নামমাত্র দণ্ড দিয়ে তাদের চাকরিতে বহাল রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে।
অপরদিকে নন-ক্যাডার চাকরিজীবীদের দুর্নীতি প্রমাণিত হলে চাকরিতে বহাল রাখার সুযোগ রাখা হয়নি। অথচ আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে বাধ্যগত অবসর এবং পেনশনের সুযোগ রাখা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় পর্যায়ে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা হলে তাদের গ্রেপ্তারে অনুমতি নেওয়া লাগে না। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে একই ধরনের মামলা হলে তাকে গ্রেপ্তার করতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি নিতে হয়। সরকারি কর্মচারী আইন-২০১৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতি করতে উৎসাহিত করেছে। সরকারি চাকুরিজীবীরা ১ বছরের কম শাস্তি পেলে চাকরি থেকে অব্যাহতি পাবেন না। তাকে তিরষ্কার, বিভাগীয় শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। যা সুশাসনের সহায়ক না। অথচ স্থানীয় প্রতিনিধিদের এরাই তাৎক্ষণিক বরখাস্ত রাখার ক্ষমতা রাখে। এই আইনের কারণে দুর্নীতি দমন কমিশন তাদের আইনের আওতায় আনতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এটা কার্যত অপরাধী সুরক্ষা আইন হিসাবে বিবেচিত। তিনি আইনটি পুর্নবিবেচনা করার অনুরোধ করেন।
হানিফ আরও বলেন, দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে প্রথমে ভোগের রাস্তা বন্ধ করতে হবে। রেজিস্ট্রি অফিস, গাড়ির শো-রুম, স্বর্ণালংকার দোকান এখানে প্রতি মাস শেষে যারা জমি, বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট রেজিস্ট্রি করেছেন তাদের তালিকা নিয়ে বিশেষ টিম পাঠিয়ে আয়ের বৈধ উৎস জানার কৈফিয়ত চাওয়া হোক। একইভাবে গাড়ি ও স্বর্ণালংকারের দোকান থেকে তালিকা নিয়ে বৈধ আয়ের উৎস জানতে চাওয়া হোক।আমার বিশ্বাস তাহলে অবৈধ আয়কারীদের ভোগ বিলাস বন্ধ হবে। চাকরি নিয়োগের সময় হলফনামা দিতে হবে। আগে এ বিধান ছিল। নির্বাচনের আগে আমাদের হলফনামা দিতে হয়, সমস্ত সম্পদের বিবরণ দিতে হয়। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের হলফনামা দিতে হয় না। আমার প্রস্তাব থাকবে চাকরিতে নিয়োগের সময় হলফনামা বাধ্যতামূলক এবং প্রতি পাঁচ বছর পর বা পদোন্নতির সময় হলফনামা দিতে হবে। যাতে তার সম্পত্তির পরিমাণ জাতি জানতে পারে।
তিনি বলেন, তৃতীয়ত স্কুল শিক্ষা কারিকুলামে সরকারি চাকরির বেতন স্কেলের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হোক। যাতে আমাদের প্রজন্মরা জানতে পারে তার বাবা, ভাই, আত্মীয় স্বজন সরকারি চাকরি করে কত টাকা বেতন পান এবং কি খরচ করছে। এটা কারিকুলামে অন্তভর্তুক্ত করলে তাদের মধ্যে লজ্জা হবে পরিবারের কাছে হেয় প্রতিপন্ন হবে। তাহলে দেশের দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব।
