চিকিৎসার সর্বশেষ ধাপ নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউ সেবা। অথচ দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে সরকারি পর্যায়ে আইসিইউ আছে ৩১ জেলায়। বাকি ৩৩ জেলায় গুরুতর অসুস্থ রোগীদের এ সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৯টিতে এই সেবা চালু করতে পেরেছে সরকার।
সরকারি পর্যায়ে চালু আইসিইউতে শয্যা আছে ১ হাজার ১৮৫টি। এর মধ্যে রাজধানীসহ ঢাকা জেলাতেই ৭৩০ শয্যা, যা আইসিইউর ৬২ শতাংশ। বাকি ৪৫৫ শয্যা ঢাকা বিভাগের অন্যান্য জেলাসহ আটটি বিভাগে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ১৩০, খুলনায় ৮৬, রংপুরে ৪৪, বরিশালে ৪১, রাজশাহীতে ৩৮, ময়মনসিংহ ও সিলেটে ২২ শয্যা করে আইসিইউ রয়েছে। এসব শয্যার মধ্যে ৩০০টিই শয্যা নষ্ট।
এসব আইসিইউতে মধ্যম থেকে নিম্নমানের সেবা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা।
অন্যদিকে, বেসরকারি পর্যায়ে আইসিইউ সেবা নিয়ন্ত্রণে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। এসব হাসপাতালের আইসিইউতে সেবা মিলছে দালালের মাধ্যমে। আইসিইউ চালানোর জন্য নিজস্ব কোনো চিকিৎসক নেই। সরকারি চিকিৎসকরাই ভরসা। সরকারি আইসিইউর মতোই এখানেও স্থাপিত যন্ত্রপাতি নিম্নমানের।
আইসিইউতে কর্তব্যরত একাধিক চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী একটি আইসিইউ শয্যার জন্য ২৪ ঘণ্টা একজন নার্স ও৬ শয্যার জন্য একজন চিকিৎসক প্রয়োজন। এসব আইসিইউ চলার কথা ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞের অধীনে। চিকিৎসক ও নার্স যারা থাকবেন, তাদের অবশ্যই এই সেবা-সংক্রান্ত শিক্ষা ও দক্ষতা থাকতে হবে। কিন্তু সরকারি বা বেসরকারি কোনো পর্যায়েই এসবের ন্যূনতম কিছুই নেই। স্বল্পসংখ্যক সাধারণ চিকিৎসক ও নার্স দিয়ে কোনোমতে চলছে আইসিইউ সেবা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের দেওয়া তথ্যমতে ও আইসিইউতে কর্তব্যরত বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে দেশের হাসপাতালগুলোয় আইসিইউ সেবার এই চিত্র পাওয়া গেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানেসথেসিয়া অ্যানালজেসিয়া অ্যান্ড ইনটেনসিভ কেয়ার মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক সরকারের আইসিইউ প্রকল্পের নীতিনির্ধারকদের একজন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা পৃথিবীতে আইসিইউতে ভর্তির যে ধরন, সে অনুযায়ী যদি আমরা রোগী ভর্তি করি, তাহলে দেশে বর্তমান আইসিইউ সেবার যে সুবিধা রয়েছে, তাতে খুব বেশি সমস্যা হওয়ার কথা না। তাই আইসিইউতে রোগী ভর্তির ধরন নির্ণয় করতে হবে। অর্থাৎ কোন ধরনের রোগীকে আইসিইউ সেবা দিতে হবে, সেটা ঠিক করতে হবে। যেসব রোগী অ্যাকুইট সাপোর্ট দিলে ভালো হয়ে যাবে, তাদের জন্যই আইসিইউ।’
আইসিইউ নেই ৩৩ জেলায়, অর্ধেক মেডিকেল কলেজে : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৩ জেলায় সরকারি পর্যায়ে আইসিইউ নেই। জেলাগুলো হলো মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর, নেত্রকোনা, শেরপুর, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, ঝিনাইদহ, মাগুরা, পিরোজপুর, বরগুনা, ঝালকাঠি, নড়াইল, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মাদারীপুর।
দেশের ৩৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে মাত্র ১৯টিতে আইসিইউ আছে। বাকি ১৮টিতে আইসিইউ নেই।
এ ছাড়া রাজধানীর সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল এবং জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) আইসিইউ নেই।
করোনা মহামারীর সময় জেলাপর্যায়ে আইসিইউ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ‘কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডামিক প্রিপেয়ারনেস’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের পরিচালক অধ্যাপক ডা. শাহ নবী গোলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত বছরের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৩টি নতুন আইসিইউ উদ্বোধন করেছেন। প্রত্যেকটা আইসিইউ ১০ শয্যার। সমসংখ্যক শয্যার আরও ৪০টি, অর্থাৎ ৪০০ শয্যার আইসিইউ চালুর কাজ প্রক্রিয়াধীন আছে। এখন সব মিলে ১৯টা মেডিকেল কলেজসহ ৩৪টা জায়গায় সরকারি পর্যায়ে আইসিইউ শতভাগ চালু আছে।
সব জেলায় আইসিইউ করবে না সরকার : স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার ‘কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডামিক প্রিপেয়ারনেস’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৮ জেলা হাসপাতালে আইসিইউ স্থাপনের পরিকল্পনা আছে। বাকি ১৬ জেলায় আইসিইউ স্থাপনে এই মুহূর্তে সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই।
এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. শাহ নবী গোলাম বলেন, ‘আমাদের প্রকল্প থেকে সব জেলায় আইসিইউ করার কথা। কিন্তু আমরা সব জেলায় হাসপাতালে জায়গা পাইনি। যেসব হাসপাতালের ভবন খুবই পুরনো, ভাঙা যাবে না, সেসব হাসপাতালে করিনি। দেশে জেলাপর্যায়ে কখনোই আইসিইউ ছিল না। কভিডের সময় নানাভাবে কিছু কিছু জায়গায় প্রথম এই সেবা চালু করা হয়।
চাপ বেশি রোগী ও তদবিরের : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে সাধারণ আইসিইউ শয্যা ৩৩টি। প্রতিদিন এখানে আইসিইউ বেডের জন্য কমপক্ষে ৩০-৪০ জন সিরিয়ালে থাকেন।
বিএসএমএমইউর আইসিইউ বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. আশরাফুজ্জামান সজিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, খরচ কম। তাই এখানে আইসিইউতে রোগীর চাপ বেশি। সবাই চায় বেসরকারি হাসপাতাল থেকে এখানে রোগী আনতে। তাই সিরিয়াল অনেক বেশি। কমপক্ষে ৩০-৪০টা সিরিয়াল থাকে একটা শয্যার জন্য। যারা পায় না বাধ্য হয়ে বেসরকারি আইসিইউতে চলে যায়।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ২০ শয্যার একটি আইসিইউ চালু আছে। রোগী অনুপাতে এ সংখ্যা খুবই নগণ্য বলে জানান ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রদীপ চন্দ্র দাস। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুই-তিন দিনে আইসিইউর কোনো শয্যা খালি হয় না। আইসিইউর অভাবে অনেক সময় রোগী মারা যায়। অন্য কোথাও যে নিয়ে যাবে, সে উপায়ও নেই। কারণ দেশের আর কোথাও বার্ন আইসিইউ নেই।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সাধারণ আইসিইউতে ৩২ শয্যা ছাড়াও বিভাগওয়ারি কিছু আইসিইউ আছে বলে জানান হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মো. আসাদুজ্জামান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন সবগুলো আইসিইউ চালু আছে। কিন্তু এই আইসিইউতে হয় না। কারণ এখানে সবচেয়ে গুরুতর অসুস্থ রোগীরাই আসে। ২৬০০ শয্যায় প্রায় ৪ হাজার রোগী থাকে। আইসিইউর জন্য খুবই চাপ। বাইরে থেকেও রোগী আইসিইউতে আনার চাপ থাকে। প্রতিদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২০-২৫ জন রোগী সিরিয়ালে থাকে।
এখানে আইসিইউ বাড়ানোর আর জায়গা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন পাঁচ হাজার শয্যার হাসপাতাল নিয়ে কাজ করছি। তখন হয়তো আইসিইউ কিছুটা বাড়াতে পারব।’
লোকবলের অভাবে বন্ধ : বিএসএমএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ১০০ শয্যার আইসিইউ আছে। কিন্তু লোকবল না থাকায় সেগুলো চালু করা যাচ্ছে না। অথচ দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় যন্ত্রপাতি নষ্ট হতে চলেছে বলে জানান এখানকার চিকিৎসকরা।
জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ১০ শয্যার একটি আইসিইউ আছে। এর মধ্যে পাঁচটি শয্যা চালু করা হয়েছে। লোকবলের অভাবে বাকি পাঁচ শয্যা চালু করা যায়নি।
আগামী জুলাই মাসে বরাদ্দ পেলে বাকি শয্যাগুলো চালু করা হবে জানিয়ে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. বাবরুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেষ্টা করছি লোকবল সংগ্রহের। একজন আইসিইউ কনসালট্যান্ট এনেছি। কিন্তু অ্যানেসথেসিয়ার লোক পাওয়া যাচ্ছে না।’
বেসরকারি আইসিইউ দালালদের দখলে : বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ সেবা নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি পর্যায়ে একটা নীতিমালা করা হয়েছিল বলে জানান অধ্যাপক ডা. দেবব্রত বণিক। তিনি বলেন, সেটা বাস্তবায়ন হয়নি। কীভাবে আইসিইউ চলবে, কোন জেলায় কী ধরনের আইসিইউ লাগবে, কোন ধরনের আইসিইউর ভাড়া কত সব নির্ধারণ করা আছে। এখন মধ্যমমানের লোকবল ও আইসিইউ সেবার জন্য আন্তর্জাতিক মানের সেবার দামই আদায় করা হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি আইসিইউ সেবা একটা অর্গানোগ্রামের মধ্যে না আনলে এই সেবায় শৃঙ্খলা আসবে না।
বেসরকারি আইসিইউ দালালদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে বলে জানান বিএসএমএমইউ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক। তারা জানান, বিভিন্ন জায়গা থেকে দালালরা রোগী ধরে এনে আইসিইউতে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। একটি বেসরকারি আইসিইউতে একজন চিকিৎসক দিনে একবার ভিজিট করে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পান। কিন্তু রোগীর প্রতিদিন বিল হচ্ছে ২০-২৫ হাজার টাকা। সেই বিলের বাকি টাকার ৫০ শতাংশই নিয়ে যাচ্ছে দালালরা।
এ চিকিৎসকরা আরও জানান, বিএসএমএমইউসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বেসরকারি আইসিইউতে ২৪ ঘণ্টায় একবার রাউন্ড দেন। অথচ আইসিইউ সাধারণ ওয়ার্ডের মতো নয় যে ২৪ ঘণ্টায় একবার রাউন্ড দিলেই হয়ে গেল।
শিশু আইসিইউ মাত্র দুই হাসপাতালে : ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিউনেটালে ২৮ দিন বয়সী শিশুদের জন্য এনআইসিইউতে ৪০টি ও এরপর থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের জন্য আছে পিআইসিইউতে ১৭টি শয্যা আছে। নিউনেটালে ৪০টি শয্যার মধ্যে আইসিইউ ভেনটিলেটর আছে ৬টি ও পিআইসিইউতে ভেনটিলেটর আছে ১০টি।
এ ব্যাপারে হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ইফফাত আরা শামসাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে শিশু বিভাগের জন্য অবশ্যই আইসিইউ বাড়ানো উচিত। গত বছর প্রত্যেক জেলায় স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন ইউনিট (স্ক্যানু) নামে এনআইসিইউ উদ্বোধন করা হয়েছে। কিন্তু সরকারি পর্যায়ে পিআইসিইউ আছে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এটা বড় সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে করতে হবে।
বার্নে একজন আইসিইউ বিশেষজ্ঞ : লোকবলের অভাবে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নামমাত্র আইসিইউ সেবা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান এখানকার চিকিৎসকরা। তারা জানান, এখানে যত রোগীর আইসিইউ লাগে, ততটা দেওয়া যায় না। এখানে যে আইসিইউ আছে, সেটা নামে চালানো হয়। ২০ শয্যার একটি আইসিইউ চালাতে মান অনুযায়ী ১০০ জন নার্স লাগে। এখানে আছে ৪৫ জন। একজন কনসালট্যান্ট, অ্যানেসথেসিয়া, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও ২৪ ঘণ্টার জন্য মেডিকেল অফিসার লাগবে। ২০ শয্যার একটি আইসিইউ চালাতে কমপক্ষে ২০-২৫ জন ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিশেষজ্ঞ দরকার, কিন্তু গোটা ইনস্টিটিউটে আছেন মাত্র একজন। অন্যান্য চিকিৎসকেরও ঘাটতি।
