হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর ৪০ দিনের মাথায় শুক্রবার নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য ভোট দিতে যাচ্ছে ইরানি জনগণ। শিয়া মুসলিম অধ্যুষিত দেশটির ১৪তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে ইচ্ছুক ৮০ জন রাজনীতিবিদ নিবন্ধন করেছিলেন। যাচাই-বাছাই শেষে মাত্র ছয়জনের প্রার্থিতা অনুমোদন করে দেশটির গার্ডিয়ান কাউন্সিল। এই ছয় প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজনই কট্টরপন্থি এবং একজন মধ্যমপন্থি হিসেবে পরিচিত।
তবে শেষ মুহূর্তে গতকাল বুধবার ছয় প্রার্থীর মধ্যে দুইজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। একজন হলেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট গাজিজাদেহ হাশেমি এবং আরেকজন রাজধানী তেহরানের মেয়র আলিরেজা জাকানি।
কট্টরপন্থী প্রার্থীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ইরানের পার্লামেন্টের বর্তমান স্পিকার ও প্রভাবশালী রেভল্যুশনারি গার্ডের সাবেক প্রধান মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং দেশটির হয়ে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর সঙ্গে পারমাণবিক বিষয়ক আলোচনায় প্রতিনিধিত্ব করা সাঈদ জালিলি।
একমাত্র মধ্যপন্থী প্রার্থী মাসুদ পেজেশকিয়ান ইরানের রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা সংস্কারবাদী শিবিরের সমর্থন পেয়েছেন। এই সংস্কারবাদী শিবির পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বৈরিতার অবসানের পক্ষে কথা বলে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এ নির্বাচনে প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেননি। কিন্তু মঙ্গলবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক ভাষণে খামেনি বলেছেন, যিনি মনে করেন আমেরিকার আনুকূল্য ছাড়া কিছুই করা সম্ভব না তিনি এই দেশকে সামলাতে পারবেন না।
তার উপদেষ্টা ইয়াহিয়া রহিম সাফাভি ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এমন একজন প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করুন যার মতামত সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না। জনগণের উচিত এমন একজনকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেওয়া, যিনি নিজেকে সেকেন্ড ইন কমান্ড মনে করবেন। প্রেসিডেন্টের উচিত হবে না বিভেদ সৃষ্টি করা।
আগামীকাল শুক্রবার অনেকটা নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতে যাচ্ছেন ইরানের জনগণ। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ কেউ এই নির্বাচনে জয় পাবেন। অর্থাৎ এ নির্বাচনের ফল খামেনির উত্তরাধিকারকে প্রভাবিত করবে।
খামেনির বর্তমান বয়স ৮৫ বছর। ধারণা করা হচ্ছে, যিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট হবেন, তিনি পরবর্তী সময়ে খামেনির উত্তরসূরি নির্বাচনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকবেন। এবারের নির্বাচনের আগে খামেনি তাই প্রার্থী হিসেবে তার রক্ষণশীল ধারণা পোষণ করে এমন ব্যক্তিদের আধিপত্য নিশ্চিত করেছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের প্রেসিডেন্টের ভূমিকা বড় করে দেখা হলেও দেশের প্রকৃত ক্ষমতা থাকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে। পররাষ্ট্র বা পারমাণবিক নীতি ও সরকারের বিভিন্ন শাখার নিয়ন্ত্রণ, সামরিক, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন আর্থিক সম্পদের বিষয়ে তিনিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেন।
এর আগে ২০২১ সালের নির্বাচনে ইরানীরা ইব্রাহিম রাইসিকে ক্ষমতায় এনেছিল এবং তিনিই আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পর দেশটি সর্বোচ্চ নেতা হবেন বলে বিবেচনা করা হতো। তবে গত ১৯ মে ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ পূর্ব আজারবাইজানের খোদা আফারিন অঞ্চলে একটি বাঁধ উদ্বোধনের পর ফিরে আসার সময় হেলিকপ্টার দুর্ঘটনার কবলে পড়ে নিহত হন।
হেলিকপ্টারটিতে প্রেসিডেন্ট ছাড়াও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আবদুল্লাহিয়ান, তাবরিজের জুমার নামাজের ইমাম আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ আলী আল-ই-হাশেম, ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের গভর্নর মালিক রহমেতিসহ মোট ৯ জন আরোহী ছিলেন।
প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরপরই দেশটির প্রথম ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোখবারকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। তিনি দুই মাস এ দায়িত্ব পালন করবেন।
ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কাল, শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ালেন দুজন