বাঁধ নির্মাণে ব্যয় বাড়ে, দুর্ভোগ কমে না এলাকাবাসীর

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৪, ০৪:৩৪ পিএম

ফেনীর মুহুরী-কহুয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে যেন ভাঙা-গড়ার খেলা চলছে। সাত বছরে ১২২ কিলোমিটার এই বাঁধের ৭০ স্থানে ভাঙনের ঘটনা ঘটে। একই জায়গায় বারবার ভাঙনের ঘটনাও ঘটছে। গত ১৪ বছরে ১৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারে ব্যয় হলেও দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পায়নি ফুলগাজী ও পরশুরামবাসী।

স্বাধীনতার পর থেকে প্রবল বর্ষণ ও ভারতীয় পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হতো এ দুই উপজেলার হাজার হাজার মানুষ। এসব মানুষের জানমাল ও কৃষি সম্পদ বাঁচাতে মুহুরী-কহুয়া-সিলোনিয়া নদীর ওপর ২০০৪-০৫ অর্থবছরে ১৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২২ কিলোমিটার ‘মাটির বাঁধ’ নির্মাণ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০১১ সালে বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ হলে পরের কয়েক বছর বন্যামুক্ত ছিল স্থানীয়রা। ২০১৩ সালে আকস্মিক বাঁধের ৩টি অংশ ভেঙে যায়। পরে ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ভাঙন অংশ মেরামত করা হয়। এরপর প্রতি বছর ভাঙে বাঁধের বিভিন্ন স্থান।

গত ছয় বছরে মুহুরী নদীর ভাঙা বাঁধ মেরামতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের খরচের হিসাবে দেখা যায়, ২০১৮ সালে ২২টি অংশে মেরামতে ২ কোটি ৪৪ লাখ, ২০১৯ সালে ১৫টি মেরামতে ১ কোটি ৭৯ লাখ, ২০২০ সালে ২২টি মেরামতে ১ কোটি ৫০ লাখ, ২০২১ সালে ২১টি স্থানে মেরামতে ২ কোটি ১৩ লাখ, ২০২২ সালে ৬টি মেরামতে ৭১ লাখ, ২০২৩ সালে ৯টি মেরামতে ১কোটি ৩৩ লাখ ব্যয় করেছে। চলতি বছর ঘূর্ণিঝড় রেমালের ক্ষতিগ্রস্ত ৮টি স্থানে মেরামতের জন্য ১ কোটি ২৫ লাখ বরাদ্ধ দেওয়া হয়েছে।

২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফেনীর মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৭৭ স্থানে ভাঙনের ঘটনা ঘটেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, বাঁধ সংস্কারে গত সাত বছরে ১১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। তবুও ভাঙন রোধ করা যায়নি।

তবে স্থানীয়রা বলছেন, জলের টাকা জলেই গেছে। এতে বাঁধ ভাঙন রোধ হয়নি, তাদের দুর্দশাও কাটেনি। বরং বর্ষা মৌসুমে আসলেই নতুন নতুন স্থানে বাঁধে ভাঙনের দেখা দেয়।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবারই বাঁধ সংস্কারের কাজ পেয়েছে নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তাদের মধ্যে রয়েছে, মেসার্স কাশেম ট্রেডার্স, মেসার্স ফেনী ইউনাইটেড কনস্ট্রাকশন, মেসার্স ইমেজ এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স শাহ সুফি এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বিল পেতে দীর্ঘ সময়ের কারণে অন্য প্রতিষ্ঠান কাজ করতে চায় না বলে জানান পাউবো-ফেনীর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. আবুল কাশেম।

স্থানীয় বাসিন্দা জহিরুল ইসলাম রাজু ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বন্যা থেকে রক্ষা পেতে বাঁধ নির্মাণ করলেও তা স্থানীয়দের কোনো কাজে আসছে না। ভাঙন কবলিত স্থানসহ নতুন নতুন জায়গায় প্রতি বছরই বাঁধ ভাঙে। প্রতিবছর এসব ভাঙন মেরামতের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বছর ঘুরে সে টাকা পানিতে ভেসে যায়। স্থায়ী সমাধান না করে প্রতিবছর নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় মানুষের।

আরেক বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম মজুমদার বলেন, বেড়িবাঁধ নির্মাণের পর থেকে আশীর্বাদ নয়, প্রতি বছরই এই বাঁধের একাধিক স্থানে ভেঙে অভিশাপই বয়ে আনছে স্থানীয়দের জন্যে। এর একটি স্থায়ী সমাধান করা হোক।

ফুলগাজীর উত্তর দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কর বলেন, আমরা ত্রাণ চাই না, বাঁধের স্থায়ী সংস্কার চাই। প্রতিবছর আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সরকার নামমাত্র ত্রাণ দিয়ে দায়সারা কাজ করে। নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের দুঃখ কেউ বুঝতে চায় না।

ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বলেন, একই জায়গায় বারবার ভাঙে। এর জন্য বরাদ্দও দেওয়া হয়। আবার একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ পায়। বন্যা হলে কিছু অসাধু কর্মকর্তার কপাল খুলে যায়। পাউবো কর্মকর্তাদের উদাসীনতায় খামখেয়ালিভাবে ঠিকাদার যেনতেনভাবে মেরামতের কাজ করেন। এ কারণেই একই জায়গা বারবার ভাঙছে।

বাঁধ ভাঙনের বিষয়ে জানতে চাইলে মেসার্স কাশেম ট্রেডার্সের সত্ত্বাধিকারী আবুল কাশেম বলেন, বাঁধের যেসব স্থানে মেরামত করা হয় সেখানে ভাঙে না, নতুন জায়গায় ভাঙে। একই প্রতিষ্ঠান বারবার কাজ পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিল বাকি পড়ায় অন্যরা কাজ করতে চায় না।

নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৩১ কোটি টাকার টেকসই মুহুরী বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্মাণ কাজ শুরু হলে শেষ হতে ৪ থেকে ৫ বছর সময় লাগবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত