দাবার বোর্ডেই বিদায় গ্র্যান্ডমাস্টারের

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৪, ১১:০৩ পিএম

গেল ১ মে পঞ্চাশ পেরিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান। কে জানত সেটিই ছিল স্বল্পভাষী এই গ্র্যান্ডমাস্টারের শেষ জন্মদিন। প্রিয় দাবা খেলাটা খেলতে খেলতেই শুক্রবার সন্ধ্যায় অনন্তলোকে পাড়ি দিয়েছেন দেশের দ্বিতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার। চিরতরে যাওয়ার আগে দেশকে দিয়ে গেছেন অনেক সম্মান; যা তাকে দাবা অঙ্গনে অমর করে রাখবে। 

১৯৮৭ সালে দেশ পেয়েছিল প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টারের দেখা। কেবল দেশ নয়, উপমহাদেশের প্রথম দাবাড়ু– হিসেবে মর্যাদার গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব অর্জন করেন নিয়াজ মোরশেদ। এর ঠিক দেড় দশক পর এই খেতাব লাভ করেন জিয়াউর রহমান। ১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক মাস্টার খেতাব লাভ করেছিলেন তিনি। গ্র্যান্ডমাস্টারের তিনটি নর্ম পেতে তার সময় লাগে নয় বছর। কালে কালে আরও তিনজন গ্র্যান্ডমাস্টার পেয়েছে দেশ। কোনো বড় আসর এলেই এত দিন ক্রীড়া সাংবাদিকদের আগ্রহ ছিল পাঁচ গ্র্যান্ডমাস্টার খেলবেন তো? নিয়াজ, জিয়া এবং সর্বকনিষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজিব ছিলেন নিয়মিত মুখ। অপর দুই জিএম রিফাত বিন সাত্তার ও আব্দুল্লাহ আল রাকিব অনিয়মিত অংশ নিতেন।

এখন আর পাঁচ গ্র্যান্ডমাস্টারের খোঁজ করতে হবে না। জিয়াই সেই কষ্ট থেকে মুক্তি দিয়ে গেলেন খেলতে খেলতেই। শুক্রবার জাতীয় দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের ১২তম রাউন্ডের খেলা চলছিল। জিয়ার প্রতিপক্ষ ছিলেন জিএম রাজিব। খেলায় জিয়াই ছিলেন ভালো অবস্থায়। আচমকাই দাবা ফেডারেশনের সভাকক্ষে চেয়ার থেকে পড়ে জ্ঞান হারান। সংকটাপন্ন অবস্থায় অন্যান্য দাবাড়–, ফেডারেশনের কর্মকর্তা, কর্মচারীরা তাকে দ্রুত নিয়ে যান শাহবাগের ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালে। সেখানে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসকরা তাকে পরীক্ষা করে মৃত ঘোষণা করেন। আকস্মিক হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তার মৃত্যু হয় বলে জানান চিকিৎসকরা।

দাবা পরিবারে জন্ম জিয়ার। ১৯৭৪ সালের ১ মে দাবাড়– বাবা পয়গাম উদ্দিন আহমেদ ও মা জেরিন আহমেদের ঘর আলো করে জন্ম হয় জিয়ার। বাবা পয়গাম ছিলেন জাতীয় দাবাড়–। বাবার হাত ধরেই ১০ বছর বয়সে দাবায় হাতেখড়ি তার। শৈশবেই খেলার জটিল সমীকরণগুলো বেশ ধরে ফেলেছিলেন জিয়া। তাই কম বয়সেই প্রতিযোগিতামূলক দাবা খেলা শুরু। শৈশবেই নিজের জাত চেনাতে শুরু করেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় জিতে নেন প্রথম জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। এই সাফল্যই তাকে নিয়ে আসে পাদপ্রদীপের আলোয়।

১৯৮৮ থেকে শুরু করে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিন দশকে ১৪ বার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়ে রেকর্ড গড়েন জিয়া। ছাড়িয়ে যান সবাইকে। এ ছাড়া ঘরোয়া অসংখ্য টুর্নামেন্টে শিরোপা জিতেছেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও জিয়ার ছিল দৃপ্ত পদচারণ। ১৯৮৮ সালে বিশ্ব দাবা অলিম্পিয়াডে প্রথম অংশগ্রহণ। এরপর আর থেমে থাকেননি। প্রায় সব অলিম্পিয়াডেই তিনি ছিলেন বাংলাদেশ দলের সদস্য। ১৯৯৩ সালে কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত এশিয়ান জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে রানারআপ হন। ১৯৯৯ সালে ব্রিটিশ চ্যাম্পিয়নশিপেও হন দ্বিতীয়। ২০০১ সালে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত রোডস আন্তর্জাতিক ওপেনে রানারআপ হয়ে গ্র্যান্ডমাস্টারের তৃতীয় ও চূড়ান্ত নর্ম অর্জন করেন জিয়া। এশিয়ান ব্যক্তিগত দাবা চ্যাম্পিয়নশিপের আট আসরে খেলেছেন তিনি। পাঁচটি ফিদে ওয়ার্ল্ড কাপে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এশিয়ান জোনাল দাবায় চারবার চ্যাম্পিয়ন হন। এশিয়ান দলগত দাবায় খেলেছেন তিনবার। গেল দেড় দশকে এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ দলের নিয়মিত মুখ ছিলেন জিয়া। 

দাবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশি-বিদেশি অনেক পুরস্কার পেয়েছেন জিয়া, যার মধ্যে অন্যতম জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার; যা তিনি পেয়েছিলেন ২০০১ সালে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতি ১৯৯৮ ও ২০০২ সালে জিয়াউর রহমানকে বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদের স্বীকৃতি দেয়। 
খেলা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কোচিংও করাতেন জিয়াউর রহামন। তার কোচিং ক্যারিয়ারও যুগ ছাড়িয়েছে। দেশে-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কোচিং করিয়েছেন। ২০১০ সালে তিনি মালয়েশিয়া জাতীয় দলের কোচ ছিলেন। তার কোচিংয়ে বিভিন্ন দেশের একাধিক দাবাড়ু– গ্র্যান্ডমাস্টারে পরিণত হয়েছেন। ফিদের অফিশিয়াল ট্রেনার হিসেবে বিভিন্ন দেশে কাজ করেছেন তিনি।

এনামুল হোসেন রাজিব ২০০৮ সালে গ্র্যান্ডমাস্টার খেতাব জয়ের পর দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ পায়নি কোনো জিএমের দেখা। জিয়ার জন্য এটা ছিল বড় এক আক্ষেপ। তাই চেয়েছিলেন নিজের ছেলে তাহসিন তাজওয়ার জিয়াকে তার মতোই বড় দাবাড়ু– বানাতে। তাহসিন ইতিমধ্যে পেয়েছেন ফিদে মাস্টার খেতাব। যে পথে এগোচ্ছেন তাতে তাহসিনকে ঘিরেও আরেকজন জিএমের স্বপ্ন দেখতেই পারে বাংলাদেশ। হয়তো জিয়ার সেই স্বপ্ন একদিন পূরণ করবেন তাহসিন। তবে সেটা আর দেখে যাওয়া হলো না অমিত প্রতিভা নিয়ে আসা জিয়ার। অকালেই মৃত্যু কিস্তিমাত করে দিল তার।

 

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত