৭০ টাকা দৈনিক বেতন পাওয়া ঝাড়ুদার এয়াকুব এখন কোটিপতি

আপডেট : ০৫ জুলাই ২০২৪, ১০:৫১ পিএম

চায়ের দোকানের কর্মচারী থেকে এখন তিনি সীতাকুণ্ড উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের কোটিপতি ঝাড়ুদার। ঝাড়ু দেন না অফিসে, অথচ পদবিতে তিনি একজন অস্থায়ী ঝাড়ুদার। তার সঙ্গে বনিবনা না হলে কোনো জমি রেজিস্ট্রি হয় না। মাত্র ৭০ টাকা দৈনিক বেতনে চাকরি করলেও সাব রেজিস্ট্রারদের সাথে ভালো সম্পর্কের কারণে পাত্তা দেন না অফিসের অন্য কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে চায়ের দোকানের কর্মচারী থেকে হয়ে গেছেন কোটি টাকার মালিক। শ্বশুর, নানি-শাশুড়িসহ কয়েক আত্মীয়ের নামে কিনেছেন কয়েক কোটি টাকার সম্পদ। তিনি মো. এয়াকুব। বাড়ি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়া উপজেলার কোদালা গ্রামে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, এয়াকুব আলী ঝাডুদারের কাজ করতেন দৈনিক ৭০ টাকা মজুরিতে। প্রতিদিন সকালে অফিসে ঝাড়ু দিতেন। ধীরে ধীরে তিনি সাব—রেজিস্ট্রারের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন। যখন যে সাব-রেজিস্ট্রারই আসেন, তিনি তার ওপর আস্থা রাখেন। বৈধ-অবৈধ কাজ সম্পাদনের জন্য সাব-রেজিস্ট্রার ও অন্য কর্মচারীকে ম্যানেজ করে এয়াকুব গড়ে তুলেন বিশাল ঘুষ বাণিজ্যের সিন্ডিকেট। এখন তিনি আর ঝাড়ু দেন না। দলিল অনুযায়ী দরদাম করে ঘুষের অঙ্ক ঠিক করেন তিনি। সাব রেজিস্ট্রারদের ভাগ বুঝিয়ে দিয়ে বাকিটা নিজে রেখে দেন।

কমিশনে দলিল রেজিস্ট্রেশন করার ক্ষেত্রেও ঘুষ আদায়ের অভিযোগ আছে ঝাড়ুদার এয়াকুবের বিরুদ্ধে। ঝাড়ুদারের কমিশন রেজিস্ট্রি করার এখতিয়ার না থাকলেও সাব রেজিস্ট্রারদের আস্থাভাজন হওয়াতে তাকেই কমিশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। যার সুবাদে প্রতিটি কমিশন রেজিস্ট্রি থেকেও তিনি মোটা অঙ্কের ঘুষ নেন।

জানা গেছে, উপজেলা পরিষদের সামনে একটি হোটেলে (ভাতের দোকানে) চাকরির সুবাদে এয়াকুব সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দুপুরে ভাত নিয়ে যেতেন। এরপর ২০০৬ সালে তিনি ঝাড়ুদার হিসেবে কাজ শুরু করেন সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে। ঝাড়ুদার থেকে সাব-রেজিস্ট্রারদের অঘোষিত পিএস হয়ে উঠেন তিনি। সেই ক্ষমতাবলে সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয় জুড়ে চলে তার শাসন। হোটেল মালিক শাহ আলমের দোকানে কর্মচারী থাকাকালীন তার মেয়ের সঙ্গে এয়াকুবের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অবশেষে অল্পদিনে কোটিপতি বনে যাওয়া এয়াকুবের সঙ্গেই তার মেয়ের বিয়ে হয়।

রাঙ্গুনীয়া থানার কোদালা গ্রামের মোহাম্মদ ইউছুফের ছেলে এয়াকুব। সেখানে তার বাবা-মা থাকেন বলে জানা গেছে। রাঙ্গুনীয়ায় আলিশান বাড়িও তৈরি করেছেন। কিনেছেন বিশাল সম্পত্তিও। এছাড়াও সীতাকুণ্ড পৌর সদরসহ উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় তার শ্বশুর-শাশুড়ি, শালী, নানি-শাশুড়ির নামে নিয়েছেন জমি। পরে সেসব তার স্ত্রীর নামে হেবা দলিল করেন তিনি। সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে কাজ করেন তার চাচাতো শ্যালিকা নাসরিন। এয়াকুবের রয়েছে দুটি প্রাইভেট কার। চলাফেরা করেন বড় কর্মকর্তাদের মতো। জায়গাজমি নিয়ে রেখেছেন নানি-শাশুড়ি সকিনা বিবির নামেও।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সীতাকুণ্ড উপজেলার আমিরাবাদ মৌজায় ২০২৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তাজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৮০ লাখ টাকায় ৬ শতক জমি কিনেছেন এয়াকুব। দলিল রয়েছে সকিনা বিবি নামে নব্বই বছর বয়সী এক নারীর নামে। ওই মহিলা সম্পর্কে ঝাড়ুদার এয়াকুবের নানি-শাশুড়ি হন। এর আগে ২০১৬ সালে মহাদেবপুর মৌজায় কেনেন ১০ শতক জমি। যার বর্তমান মূল্য ৭০ লাখ টাকা। এছাড়াও নডালিয়া মৌজায় শাশুড়ির নামে এক একরের অধিক জমি কিনেছেন বলে জানা যায়।

এ বিষয়ে মো. এয়াকুব দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার কোনো অবৈধ সম্পদ নেই। আমি চাকরি ছেড়ে দেব।

সীতাকুণ্ড উপজেলা ভূমি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান হাবিব বলেন, আগে যারা সাব-রেজিস্ট্রার ছিলেন তারা এয়াকুবকে কমিশনে পাঠাতেন। সেই জন্য আমিও তাকে পাঠাই।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত