দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা কি সত্যিই বেড়েছে

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৪, ১০:৫২ পিএম

চট্টগ্রামসহ সারা দেশে দুই-তিন দিন ধরে শিশু ‘নিখোঁজের’ তথ্য ভাসছে ফেসবুকে। কয়েকটি পেজ ও ও গ্রুপে শিশু নিখোঁজের স্ট্যাটাস ছড়িয়ে পড়েছে। হারিয়ে যাওয়া এসব শিশুদের বেশিরভাগই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী বলে দাবি করা হচ্ছে।

দেশটিতে হঠাৎ করেই শিশু নিখোঁজের ঘটনা বেড়ে গেছে দাবি করে ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ এবং গ্রুপের পোস্টে বলা হচ্ছে, গত দুই দিনে সারা দেশে না কি প্রায় ৩৫ জন শিশু নিখোঁজ হয়েছে।  যাচাই না করে এসব ঘটনাকে সত্য ধরে অনেকেই শেয়ার দিচ্ছেন নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে। এতে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা।

কিন্তু বাংলাদেশে বাস্তবেই কী শিশু নিখোঁজের ঘটনা বেড়েছে? 

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন হালিশহর এলাকার বাসিন্দা তৌহিদুল ইসলাম। গত বৃহস্পতিবার দুপুরের পর তার স্কুলপড়ুয়া ছোট ভাই বাড়ি থেকে কোচিংয়ের উদ্দেশ্যে বের হয়। এরপর গত তিন দিন ধরে ভাইয়ের কোনো খোঁজ পাচ্ছেন না বলে জানান তৌহিদুল। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও সন্ধান না মেলায় সেই রাতেই স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে নিখোঁজ কিশোরের পরিবার।

কিন্তু পরের দুই দিনেও ভাইয়ের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য না পাওয়ায় শেষমেশ এ বিষয়ে সাহায্য চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট করেন তারা। ফেসবুকে প্রথমে নিজেদের অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি বেশ কয়েকটি গ্রুপ এবং পেজেও ‘নিখোঁজ সংবাদ’ শিরোনামে পোস্ট দেন তৌহিদুল এবং তার স্বজনরা। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পোস্টগুলো অন্যান্য গ্রুপ এবং পেজেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

এছাড়া ঢাকার বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবী ইকরামুল হক (ছদ্মনাম)। শনিবার বিকেলে খেলতে বের হওয়ার পর তার এক আত্মীয়র মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলে নিখোঁজ হয়। এক পর্যায়ে সেই আত্মীয়ের অনুরোধেই শিশুটির সন্ধান চেয়ে ফেসবুকে একটি বার্তা পোস্ট করেন তিনি। তার ক্ষেত্রেও পোস্টটি দ্রুতই বিভিন্ন গ্রুপ এবং পেজে ছড়িয়ে পড়ে। পরে রাতেই শিশুটিকে পাশের একটি এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায়। জানা যায়, সে পথ হারিয়ে ফেলেছিল। এরপর শিশুর সন্ধান পাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে ফেসবুকে আরেকটি বার্তা পোস্ট করেনে ইকরামুল।

কিন্তু শুরুতে যারা ‘নিখোঁজ সংবাদে’র পোস্টটি শেয়ার দিয়েছিলেন বা পুনরায় পোস্ট করেছিলেন, তাদের বেশির ভাগই পরবর্তীতে সন্ধান পাওয়ার বার্তাটি সেভাবে প্রচার করেননি। ফলে মাদ্রাসাপড়ুয়া ওই শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার খবরটি এখনও বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে।

ফেসবুকে ব্যক্তিগত বিভিন্ন ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের পাশাপাশি এক ডজনেরও বেশি গ্রুপ এবং পেজ থেকে শিশুদের নিখোঁজ হওয়ার খবরগুলো প্রচার হতে দেখা যাচ্ছে। এই ফেসবুক গ্রুপগুলোর ক্ষেত্রে বেশির ভাগই দেখা যাচ্ছে ঢাকা এবং চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক। চট্টগ্রাম কেন্দ্রিক একাধিক পেজ ও গ্রুপে দাবি করা হয়েছে যে, গত ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগ-সহ সারা দেশে প্রায় ৩৫ জন শিশু নিখোঁজ হয়েছে।

আরেকটি পেজে নিখোঁজের এই সংখ্যা ৫০ জন ছাড়িয়ে গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। ওই সব নিখোঁজ বার্তায় শিশুদের কারও কারও ছবি প্রকাশ করা হলেও থানায় সাধারণ ডায়েরির অনুলিপি খুব কম ক্ষেত্রেই প্রকাশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রামের পুলিশ কর্মকতার্রা বলছেন, ফেসবুকে ‘ভিকটিম’ শিশুর ছবি ও তথ্য-দিয়ে বিভিন্ন গ্রুপ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইলে নিখোঁজের স্ট্যাটাস দেওয়া হচ্ছে। বাস্তবে এসব গুজব। যারা হারিয়েছে তার কয়েকঘণ্টা পর বাড়ি ফিরে এসেছে। এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রামে ৪৮ ঘণ্টায় ৩৫ শিশু নিখোঁজের গুজব ছড়ানো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কিছু গ্রুপের এডমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ।

সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আবদুল মান্নান মিয়া রবিবার (৭ জুলাই) দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুমের এডমিনরা ভুল স্বীকার করেছেন। মুচলেকা দিয়েছেন। এ বিষয়ে পুলিশ সতর্ক আছে। গুজবে বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই।’

স্ক্রিনশট থেকে প্রাপ্ত চারজন অভিভাবকদের মোবাইলে আজ রবিবার (৭ জুলাই) কথা হয় দেশ রূপান্তরের। এর মধ্যে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, ঢাকার শাহজাহানপুর থানা ও লক্ষীপুর এলাকা থেকে ‘নিখোঁজ’ হওয়া চার শিশুর অভিভাবক। তারা জানান, শিক্ষক থেকে ছুটি নিয়ে মাদ্রাসা পড়ুয়া এক শিশু চলে যায় খালার বাড়িতে, আরেক মাদ্রাসা ছাত্র পরিবারকে না জানিয়ে চলে যায় ফুফুর বাড়িতে। 

পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া এক শিশু বন্ধুর সঙ্গে ট্রেনে চড়ে চলে যায় কিশোরগঞ্জে, সপ্তম শ্রেণির আরেক ছাত্র বন্ধুকে নিয়ে ঘুরতে চলে যায় কক্সবাজারে। তাদের কেউ কেউ সকালে ‘নিখোঁজ’ হয়ে সন্ধ্যায়, আবার কাউকে পরিবার উদ্ধার করেছে দুই বা তিনদির পর। এসব ঘটনায় ‘ভিকটিমের’ বাবা-মা নিজেরাই ফেসবুকে ছেলে ‘নিখোঁজের’ স্ট্যাটাস দিয়েছেন। অবশ্য কয়েকঘণ্টা পর ‘নিখোঁজ’ ছেলে ফিরে আসায় ফেসবুকের স্ট্যাটাস ডিলিট করে দেন।

চট্টগ্রাম নগর ও জেলা পুলিশের অন্যতম শীর্ষ কর্মকতার্দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে নগরের আকবর শাহ, পাঁচলাইশ ও হালিশহর থানা এলাকায় তিনটি নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে। তবে ভিকটিম শিশু নয়, তরুণ ও প্রাপ্ত বয়স্ক। এর মধ্যে একজন ঋণের, অন্যজন প্রেমঘটিত এবং বাকি একজন অভিমান করে বাড়ি ছাড়েন। নিখোঁজ ওই তিনজনের মধ্যে দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে আজ (৭ জুলাই) উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিএমপির এক কর্মকর্তা।

গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে জেলার ১৬ থানা এলাকায় বিশেষ করে সাতকানিয়া থেকে তিনজন শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি করেছেন অভিভাবকেরা। এর মধ্যে দুই শিশুকে উদ্ধার করা গেলে একজনকে এখনো উদ্ধার করা যায়নি বলে রবিবার বিকালে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন।    

ঢাকা-চট্টগ্রামে ৩৫ শিশু নিখোঁজ’ এর ঘটনা ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার বিষয়টি গুজব বলে মন্তব্য করে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আবদুল মান্নান মিয়া বলেন, ‘ফেসবুকে শিশু নিখোঁজের গুজব ছড়ানো হচ্ছে। আতঙ্ক সৃষ্টি উদ্দেশ্যেই এটা করা হচ্ছে। গুজব ছড়ানোর অভিযোগে তিনটি গ্রুপের এডমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। তারা ভুল স্বীকার করেছেন। ক্ষমা চেয়ে মুচলেকা দিয়েছেন। তবে এখনকার শিশুরা অনেক আবেগপ্রবণ ও স্বাধীনচেতা। অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলি তারা যেন শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে।’

ফেসবুকে শিশু নিখোঁজের খবর ভাইরাল হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে বলে মন্তব্য করে চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন  বলেন, ‘শিশু নিখোঁজের তিনটি ঘটনায় পেশাদার কোনো অপরাধ চক্র জড়িত থাকার আলামত পাওয়া যায়নি। সমাজে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য ফেসবুকে গুজব চালানো হচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে পুলিশের সতর্ক দৃষ্টি আছে।’    

এ বিষয়ে  ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মুখপাত্র মো. ফারুক হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, শিশুদের নিয়ে যে পরিমাণ ‘নিখোঁজ সংবাদ’ ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ এবং পেজে দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর বেশির ভাগেরই কোনো ভিত্তি নেই। মাঝে মধ্যে হয়তো দু-একটি ঘটনা ঘটছে এবং আমরা দ্রুত তাদের খুঁজেও বের করছি। ফলে বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই।

এসব গুজব ছড়ানোর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবেই এসব মিথ্যা খবর ছড়ানোর চেষ্টা করা হতে পারে। তবে কারা এটি করছে, সেটি জানার জন্য ইতোমধ্যেই আমাদের সাইবার টিম কাজ শুরু করেছে। আশা করি শিগগিরই তাদেরকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত