মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন ইউপি চেয়ারম্যান, পেছন থেকে পর পর ৫ গুলি

  • মামলা হয়নি, গ্রেপ্তার নেই
  • আতঙ্কে অন্য চেয়ারম্যানরা
  • আগেও হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ৫ চেয়াম্যান
আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৪, ১১:৩৭ পিএম

স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জেরে খুলনায় ইউপি চেয়ারম্যান শেখ রবিউল ইসলাম রবিকে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের পরিবারের সদস্য, সংশ্লিষ্ট ইউপির কয়েকজন মেম্বার ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। তারা হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ হিসেবে সবশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ও বানিয়াখালী মাওলানা ভাসানী মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনকে দায়ী করেছেন।

অন্যদিকে, এর আগেও উপজেলাটি পাঁচজন ইউপি চেয়ারম্যান হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। সঙ্গতকারণে এই হত্যাকাণ্ডের পর অন্য চেয়ারম্যানদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাই তারা হত্যাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার দাবি করেছেন। তবে হত্যাকাণ্ডের পর একদিন অতিবাহিত হলেও এখনো থানায় কোনো মামলা হয়নি। পুলিশ হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

নিহত ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবির ভাগ্নে এম এম সাইফুর রহমান রাজু, চাচাতো ভাই মো. মোতাহার শেখ, গ্রামের বাসিন্দা মতিয়ার রহমান, আবু বক্কার জানান, রবিউল ইসলাম শরাফপুর ইউনিয়নে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি গত তিনটি ইউপি নির্বাচনে শরাফপুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থন না পেয়েও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে জয়লাভ করেন। তার কাছে আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থী বৃত্তি ভুলবাড়িয়া গ্রামের ওবায়দুল্লাহ হাওলাদার ২৬২ ভোটে পরাজিত হন। এরপর নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে ওবায়দুল্লাহ আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালতে মামলাটি এখনো বিচারাধীন রয়েছে।

তারা আরও জানান, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইউপি চেয়ারম্যান রবি আওয়ামী লীগের প্রার্থী নারায়ণচন্দ্র চন্দ এবং ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাচনে গাজী এজাজ আহম্মেদের পক্ষে কাজ করেন। ওই দুটি নির্বাচনেই তার সমর্থিত প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। অন্যদিকে রবির কাছে পরাজিত ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী শরাফপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক ওবায়দুল্লাহ হাওলাদার আওয়ামী লীগ থেকে দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত পরাজিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী শেখ আকরাম হোসেন ও ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাচনে পরাজিত আজগর আলী বিশ্বাসের (তারা বিশ্বাস) পক্ষে কাজ করেন। তাছাড়া বানিয়াখালী মাওলানা ভাসানী মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনে তাদের উভয়ের পৃথক প্যানেল ছিল। সে নির্বাচনেও রবির প্যানেল জয়ী হয়। এসব জয়—পরাজয়ের কারণে তারা বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। ফলে এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ওবায়দুল্লাহ হাওলাদার জড়িত এমন তাদের অভিযোগ।

তারা দাবি করেন, ওবায়দুল্লাহ হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করে রিমাণ্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই এই হত্যাকাণ্ডের অর্থযোগানদাতাসহ হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন ও হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা সহজেই সম্ভব হবে।

রবিউল ইসলাম রবির বড় ভাই শেখ মঞ্জিরুল ইসলাম বলেন, সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিরোধেই আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। তার সঙ্গে ব্যক্তিগত কারো বিরোধ ছিল না।

ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান খান, মো. হাবিবুল্লাহ, রোকেয়া বেগম ও শেখ আব্দুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে  জানান, বৃত্তি ভুলবাড়িয়া গ্রামের ওবায়দুল্লাহ হাওলাদার ইউপি নির্বাচন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও উপজেলা নির্বাচনসহ সকল ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবির প্রতিপক্ষ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে ইউপি নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর থেকে সে ভোট কারচুপির অভিযোগ করাসহ রবির বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন সময় সে রবির বিরুদ্ধে হুমকি-ধামকিও প্রদান করেন।

তবে গত শনিবার রাতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে রবিউল ইসলাম রবি নিহত হওয়ার পর থেকে ওবায়দুল্লাহ হাওলাদার আত্মগোপন করেছেন। ফলে তার মোবাইল নম্বরে একাধিবার যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

এদিকে, বানিয়াখালী মাওলানা ভাসানী মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের একটি সূত্র জানায়, বিগত ২০২২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ডুমুরিয়া উপজেলার বানিয়াখালী মাওলানা ভাসানী মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচনে রবিউল ইসলাম রবির প্যানেলের কাছে ওবায়দুল্লাহ হাওলাদারের প্যানেল পরাজিত হয়। ওই নির্বাচনের পর কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি রবিউল ইসলাম রবি কলেজের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস এম আমিনুল ইসলামকে বাদ দিয়ে সিনিয়র শিক্ষক সুরঞ্জন বিশ্বাসকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দেন। এ ঘটনা নিয়েও ওবায়দুল হাওলাদার ইউপি চেয়ারম্যান রবির বিরুদ্ধে ভীষণ ক্ষিপ্ত ছিলেন।

এ ব্যাপারে মাওলানা ভাসানী মেমোরিয়াল ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সুরঞ্জন কুমার বিশ্বাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, কলেজে সব নিয়ম মাফিক হয়েছে। ইউপি নির্বাচন নিয়ে বিরোধ শোনা যায়। তবে কলেজ নিয়ে কোনো বিরোধ নেই।

এদিকে গতকাল রবিবার দুপুরে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নিহত ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবির লাশের ময়নাতদন্ত করা হয়। পরে তার লাশ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাদ আছর শরাফপুর ইউনিয়নের ভুলবাড়ীয়া গ্রামে জানাজা শেষে ইউপি চেয়ারম্যান রবির লাশ পারিবারিক কবরস্থানে তার পিতা শেখ ফজলল করিমের (হাবিবুর রহমান) কবরের পাশে দাফন করা হয়। হাসপাতাল সূত্র জানায়, পেছন থেকে রবির কোমর থেকে পিঠ পর্যন্ত ৫টি গুলি করা হয়েছে। প্রতিটি গুলিই তার শরীরে বিদ্ধ হয়েছিল।

গুটুদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ তুহিনুল ইসলাম তুহিন বলেন, হত্যাকান্ডটি সংঘটিত হওয়ার পর থেকে অন্যান্য ইউপির চেয়ারম্যানরা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তাই দ্রুত খুনের ক্লু উদ্ধার, খুনি ও অর্থ যোগানদাতাদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানান তিনি।

ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকান্ত সাহা বলেন, হত্যাকাণ্ডের রহস্য (ক্লু) উদঘাটনে পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। নিহতের পরিবার থেকে রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। ঘটনাস্থল থেকে ইউপি চেয়ারম্যানের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।

খুলনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাঈদুর রহমান বলেন, আমরা ইউপি চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবির হত্যা রহস্য উদঘাটনে চেষ্টা করছি। আশা করছি, খুব তাড়াতাড়িই এই হত্যা রহস্য উদঘাটন হবে। তখন আপনাদের বিস্তারিতভাবে জানানো হবে।

এর আগে গত শনিবার রাত পৌঁনে ১০টার দিকে ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ওয়াপদার মোড় নামকস্থানে দুর্বৃত্তদের গুলিতে শরাফপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ রবিউল ইসলাম রবি (৪৬) নিহত হন। ওই দিন তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্য নারায়ণচন্দ্র চন্দের সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। সন্ধ্যায় তিনি ডুমুরিয়া উপজেলা সদরের শহিদ জোবায়েদ আলী মিলনায়তনে উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা শেষে মোটরসাইকেলে খুলনার বাসার উদ্দেশে রওনা দেন। রাত পৌঁনে ১০টার দিকে তিনি খুলনা—সাতক্ষীরা সড়কের গুটুদিয়া ওয়াপদার মোড় নামকস্থানে পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা তাকে লক্ষ্য করে পেছন দিক থেকে বেশ কয়েকটি গুলি করে পালিয়ে যায়। এ সময় তার পিঠে ৫টি গুলি বিদ্ধ হয়ে রাস্তার ওপর লুটিয়ে পড়েন। গুলির শব্দ শুনে পরে স্থানীয় লোকজন তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে রাত সোয়া ১০টার দিকে ডুমুরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠালে  কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত বলে ঘোষণা করেন।

প্রসঙ্গত, ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত ডুমুরিয়া উপজেলায়। ১৯৮০ সালের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত শুধুমাত্র ডুমুরিয়া উপজেলাতেই ৫ জন চেয়ারম্যান হত্যকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। তারা হলেন মাগুরখালি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুল সানা, খর্ণিয়া ইউপির চেয়ারম্যান শেখ মোকশেদ আলী, সদর ইউপির চেয়ারম্যান শেখ মজিদ ও শেখ কবিরুল ইসলাম ও রুদাঘরা ইউপির চেয়ারম্যান শেখ তুজাম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত