মুহাররম ইসলামী বছরের প্রথম মাস। অর্থাৎ হিজরি বছর শুরু হয় মুহাররম থেকে এবং হিজরি বছর শেষ হয় জিলহজ মাসে। এছাড়াও আল্লাহ তাআলা যে চারটি মাসকে পবিত্র মাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন তার মধ্যে মহররম অন্যতম। এ মাসকে মহানবী (সা.) আল্লাহর মাস হিসেবে ঘোষণা করেছেন। সুতরাং সমস্ত দিন ও মাস আল্লাহ তাআলার। আর এ কারণেই আল্লাহ তাআলার সাথে এ মাসকে সম্পৃক্ত করা তার শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় বহন করে।
মুহাররম মাসের আরো একটি ফজিলত হল রমজানের পর এ মাসের রোজা সবচেয়ে উত্তম। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত যে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন: রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং- ১১৬৩)
প্রশ্ন হলো কেন মুহাররম মাস থেকে ইসলামী বছরের সূচনা করা হলো? যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) রবিউল আউয়াল মাসে মদিনায় হিজরত করেন। উত্তর জানার পূর্বে আসুন এমন কিছু বিষয় দেখি যে সব বিষয়ে প্রায় সমস্ত ইতিহাসবিদ একমত।
এক. মহানবী (সা.)-এর সময়ে হিজরি সনের প্রচলন ছিল না। হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর খিলাফতকালে সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শে ১৭ হিজরিতে এর সূচনা হয়।
দুই. যদিও হিজরি বর্ষ পঞ্জিকা হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর সময়ে চালু হয়েছিল, কিন্তু সবকটি ইসলামিক মাসের নাম ও তাদের ক্রম কেবল মহানবী (সা.)-এর সময় থেকেই নয় বরং বহুকাল আগে থেকেই চলে আসছে। বারো মাসের মধ্যে চারটি পবিত্র মাস (জিলকদ, জিলহজ, মহররম এবং রজব) প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন: প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে আল্লাহর কিতাবে (অর্থাৎ লাওহে মাহ্ফূজে) মাসের সংখ্যা বারোটি। সেই দিন থেকে, যে দিন আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। এর মধ্যে চারটি মাস মর্যাদাপূর্ণ। (সুরা আত-তাওবা, আয়াত নং- ৩৬)
তিন. ইসলামি বর্ষপঞ্জি (হিজরি) চালু হওয়ার আগে আরবরা বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে বছরের নামকরণ করত। যার কারণে আরবদের মধ্যে বিভিন্ন ক্যালেন্ডার ব্যবহৃত হতো এবং প্রতিটি ক্যালেন্ডার শুরু হতো মহররম থেকে। উল্লেখ্য যে, সে সময় পৃথিবীতে চার ধরনের তারিখ প্রচলিত ছিল :
এক. চন্দ্র তারিখ। অর্থাৎ চাঁদ অনুযায়ী তারিখ দেখে।
দুই. খ্রিষ্ট্রীয় তারিখ। অর্থাৎ খ্রিষ্টানদের তারিখ, যা সৌরজগতের তারিখ তথা বর্তমান ইংরেজি তারিখ।
তিন. হিব্রু তারিখ। অর্থাৎ ইহুদি তারিখ।
চার. জুলিয়ান তারিখ।
এখন উত্তর হলো, হজরত উমর ফারুক (রা.)-এর খিলাফতকালে যখন নতুন ইসলামী ক্যালেন্ডার চালু করার কথা উঠে তখন সাহাবায়ে কেরাম রাসুল (সা.)-এর জন্ম, নবুওয়াত বা মদীনায় হিজরতের পর থেকে ইসলামী ক্যালেন্ডার শুরু করার বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছিলেন। অবশেষে সাহাবায়ে কেরামের পরামর্শে রাসুল (সা.)-এর মদীনায় হিজরতের সনকে ভিত্তি করে একটি নতুন ইসলামী ক্যালেন্ডার চালু করা হয়। অর্থাৎ মদীনায় হিজরতের পূর্বের সমস্ত বছর শূন্য মনে করে মদীনায় হিজরতের বছরকে প্রথম বছর হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আর মাসগুলোর ক্রমবিন্যাস, সেগুলি আরবদের মধ্যে ব্যবহৃত বিভিন্ন ক্যালেন্ডার অনুসারে রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ মুহাররম থেকে বছর শুরু।
উল্লেখ্য, মুহাররম মাস প্রাচীনকাল থেকেই আরবদের বছরের প্রথম মাস ছিল, তাই ইসলামী বছর শুরু করার সময় এতে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। আর এভাবেই রাসুল (সা.)-এর মদিনায় হিজরতের পর থেকে নতুন ইসলামী ক্যালেন্ডার তথা হিজরি সনের সূচনা হয়। তবে মাসের ক্রমানুসারে কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।
সৌরজগতের হিসেব মতে খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারে ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিন রয়েছে। তবে হিজরি ক্যালেন্ডারে ৩৬৪ দিন। প্রতিটি ক্যালেন্ডারেই ১২টি মাস রয়েছে। হিজরি ক্যালেন্ডারে মাস ২৯ বা ৩০ দিনে হয়। তবে খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারে ৭ মাস ৩১ দিনে, ৪ মাস ৩০ দিনে এবং ২৮ বা ২৯ দিনের একটি মাস রয়েছে। সূর্য ও চন্দ্র উভয়ের ব্যবস্থাই আল্লাহর সৃষ্টি।
ইসলামী শরীয়তে ইবাদত হিজরি ক্যালেন্ডারের সাথে সম্পর্কিত। দুটি ক্যালেন্ডারের মধ্যে ১০ বা ১১ দিনের পার্থক্যের কারণে নির্দিষ্ট কিছু ইবাদতের সময় এক ঋতু থেকে অন্য ঋতুতে পরিবর্তিত হয়।
ক্যালেন্ডার গণনার কিছু নীতিমালা রয়েছে। নিচে তা সংক্ষিপ্তাকারে আলোচনা করা হলো-
চাঁদ এবং সূর্যের দুটি গতিপথ রয়েছে, একটি দ্রাঘিমাংশে এবং অন্যটি অক্ষাংশে। প্রত্যেক দিনে চাঁদ ও সূর্য যে দূরত্ব অতিক্রম করে তা দ্রাঘিমাংশ এবং বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে তা হলো অক্ষাংশ। চাঁদের এই আবর্তন, যা তার দূরত্ব অক্ষাংশে অতিক্রম করে, ইসলামিক ক্যালেন্ডার অনুসারে বছরে ৩৫৪ দিন এবং ৯ ঘন্টা হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ অক্ষাংশ থেকে চাঁদ তার অবস্থানে আসতে ৩৫৪ দিন এবং ৯ ঘন্টা সময় লাগে, তবেই এক বছর হিজরি হিসেবে গণ্য।
অক্ষাংশে সূর্যের আবর্তন, যা তার দূরত্বকে অতিক্রম করে তা এক বছরে ৩৬৫ দিন এবং ৬ ঘন্টা হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ অক্ষাংশ থেকে সূর্য তার অবস্থানে পৌঁছাতে সময় লাগে ৩৬৫ দিন এবং ৬ ঘন্টা, তারপরই এক বছর খ্রিষ্টাব্দ হিসেবে গণ্য। তথা এক বছরে হিজরি ও খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে ১০ দিন ২১ ঘন্টার পার্থক্য। এই পার্থক্য কেবল বছরের। কিন্তু হিজরি ও খ্রিষ্টাব্দ উভয়ের দিনই সমান্তরাল চলমান থাকায় উভয়ের এক দিনের পার্থক্য এক দিনই বোঝা যায়।
সুতরাং ১০ দিন ২১ ঘন্টার এই পার্থক্য হিজরি মোতাবেক খ্রিষ্টাব্দের ১০০ বছর মানে ১০৩ বছর ২৫ দিন। কিন্তু দিনের পরিসংখ্যানের মধ্যে উভয়ের সংখ্যা সমানই হবে। এজন্য সামঞ্জস্যতায় কোনো পার্থক্য থাকবে না। উদাহরণস্বরূপ : খ্রিষ্টীয় ১০০ বছরে ৩৬৫২৫ দিন অনুরূপ হিজরির ১০৩ বছরেও ৩৬৫২৫ দিন।
অতএব রাসুল (সা.)-এর মদীনায় হিজরতের বছর থেকে ইসলামী বছরের শুরু অর্থাৎ হিজরি সনের সূচনা এবং মুহাররম থেকে ইসলামী মাসের সূচনা। আল্লামা মুফতি শফি উসমানী (রহ.) বলেন : ইসলামে চান্দ্র মাসের যে বিন্যাস পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে, তা আল্লাহ তাআলা কর্তৃক সুবিন্যস্ত। কেননা তিনি নির্দিষ্ট মাসগুলোর নির্দিষ্ট নির্দেশাবলী এ চান্দ্র হিসেবেই নাজিল করেছেন। এ থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ তাআলার কাছে ইসলামের বিধি-বিধান পালনের ক্ষেত্রে চান্দ্র বছর-ই গ্রহণীয় এবং পছন্দনীয়। অতএব চন্দ্র হিসাব তথা আরবি বর্ষপঞ্জি স্মরণ রাখা ও হেফাজত করা ফরজে কিফায়া। তাই সমগ্র উম্মাহ যদি চান্দ্র হিসাব স্মরণ না রাখে বা পরিহার করে চলে তাহলে তারা গুনাহগার হবে। সুতরাং চান্দ্র গণনা সংরক্ষিত থাকলে তবেই সৌর তারিখ ব্যবহার করা জায়েজ।
আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে ইসলামী হিজরি বছরের গুরুত্ব উপলব্ধি করার এবং ইসলামী তারিখ অনুযায়ী যাবতীয় ইবাদত ও অন্যান্য কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক : ইসলাম বিষয়ক গবেষক, আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম।
