বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

আইনি পথে সমাধান সন্ধান

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৪, ০৬:০৯ এএম

কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থামাতে আপাতত আইনি পথেই এগোনোর চিন্তা করছে সরকার। মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় আপিলে স্থগিত করার আইনি ফাঁকফোকর বের করার পথ খুঁজতে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এজন্য প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করার সুযোগ রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পেনশন স্কিম নিয়ে আন্দোলনরত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কথা শোনার পর যৌক্তিক সমাধান বের করতে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও প্রতিমন্ত্রী শামসুন নাহার চাঁপাকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনীভূত করা ও তাদের কাজে লাগানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক বৈঠকে দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এসব পরামর্শ দেন।

এর আগে দুপুরে সেখানে বৈঠক করেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, প্রতিমন্ত্রী শামসুন নাহার এবং তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত। দুটি ইস্যুতে প্রায় এক ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন তারা। সেখানে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়াও উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং নতুন পেনশন স্কিম নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন সামাল দেওয়া নিয়ে কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ। বৈঠক শেষে সেখানে উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী ও তথ্য প্রতিমন্ত্রী অল্প কিছু কথা বলেন। তবে বাকিরা গণমাধ্যমের মুখোমুখি হননি। এর আগে সেখানে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক।

বৈঠকে অংশ নেওয়া এক নেতা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে দেশে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষার্থীরা কোটাবিরোধী আন্দোলন করছে আর শিক্ষকদের আন্দোলন হচ্ছে সর্বজনীন পেনশন স্কিমে যুক্ত থাকার বিধান বাতিলের। আন্দোলন থামিয়ে বিষয় দুটির কীভাবে সমাধান করা যায় সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দলের সাধারণ সম্পাদক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ডেকেছিলেন। বৈঠকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় করণীয় ও সমাধানের বিকল্প পথ বের করা নিয়ে আলোচনা করেন তারা। এ ছাড়া কোটাবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীদের আদালতে বিচারাধীন বিষয়টির পক্ষভুক্ত করার কোনো পথ পাওয়া যায় কি না, সেটিও বের করার উপায় খুঁজছে সরকার।

বৈঠকে অংশ নেওয়া আরেক নেতা জানান, কোটাবিরোধী আন্দোলন থামাতে আইনগতভাবে কী করার সুযোগ আছে, তা জানতে ও বুঝতে আইনমন্ত্রীকে ডাকা হয়। আর শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের বিষয়টির সমাধান কীভাবে করা যায় এবং তারা কী ভাবছেন, তা নিয়ে আলোচনার জন্য ডাকা হয় শিক্ষামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে। দুটি আন্দোলন নিয়েই বিস্তারিত আলোচনা হয় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বৈঠকে।

বৈঠকে উপস্থিত থাকা একজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুটি আন্দোলন নিয়ে তারা কয়েকটি বিকল্প মাথায় রেখে সামনে এগোনোর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। তবে বিকল্প সিদ্ধান্তগুলো আপাতত না প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বৈঠকে। যে কারণে বৈঠক শেষ করে সেখানে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে তেমন কোনো কথা বলেননি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সরকারি চাকরিতে কোটা একটি ‘যৌক্তিক’ পর্যায়ে রাখার ব্যাপারে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের কোটা কীভাবে সংস্কার করা যায়, তা নিয়ে আরও পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এ নিয়ে আদালতের রায় যেহেতু দেওয়া হয়েছে, তাই বিষয়টি নিয়ে এলোমেলো কথা না বলার নির্দেশনা দিয়েছেন ওবায়দুল কাদের।

এ ছাড়া কোটাবিরোধী আন্দোলন থামাতে বিচারালয়ের সঙ্গে আইন মন্ত্রণালয়ের আলোচনা ও পরামর্শ গ্রহণ করার পথ বের করতে আইনমন্ত্রীকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আপাতত আন্দোলন থামাতে হাইকোর্টের রায় স্থগিত করা ও শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরানোর ব্যবস্থায় ইতিবাচক পথ বের করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে আইনমন্ত্রীকে। সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের নির্বাহী আদেশের ২০১৮ সালের পরিপত্র হাইকোর্টে অবৈধ ঘোষণার রায় আপিলে স্থগিত হওয়ার আইনি কোনো রাস্তা থাকলে সেদিকে এগোনোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বৈঠক সূত্র আরও জানায়, আপাতত শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে সরাতে চায় ক্ষমতাসীনরা। পরে চাকরিতে কত শতাংশ কোটা রাখা যায়, তা নিয়ে আলাদা একটা কমিশন করারও চিন্তাভাবনা সরকারের আছে। কমিশন গঠনের ব্যাপারটি মাথায় রেখে তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে চাকরিতে কোটা নির্ধারণ এবং কত শতাংশ রাখা হবে ভবিষ্যতে তা আইন করেই নির্ধারণ করতে চায় সরকার। তবে আপাতত আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরানোই লক্ষ্য। কমিশন গঠন ও কমিশনের পরামর্শ এ প্রক্রিয়ায় সময় নেবে সরকার। এখন যেহেতু বিষয়টি বিচারাধীন তাই আইনমন্ত্রীকে বিষয়টির আপাতত সমাধানে আইনি পথ বের করার বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন বলেন, ‘আমি এটাকে কোটাবিরোধী আন্দোলন বলব না, এটাকে বলব কোটা সংস্কারের আন্দোলন। এই আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের সমর্থন রয়েছে। ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী আদেশে কোটা বাতিল করে যে পরিপত্র জারি করা হয়েছিল, সেটাই প্রমাণ করে আমরা এর পক্ষে। কিন্তু এখন বিষয়টি আইনি পথে চলে যাওয়ায় সেই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সরকারের যা পদক্ষেপ নেওয়ার সেটা আমরা করব।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন যে আন্দোলন চলছে আমি নিশ্চিত তারা কোটাবিরোধী আন্দোলন করছে না, তারা কোটা সংস্কারের আন্দোলন করছে। এ ব্যাপারে সরকার নিশ্চিত হয়েছে। আর শিক্ষকদের যে আন্দোলন সে বিষয়ে শিক্ষক নেতাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর এর চূড়ান্ত সুরাহা হবে।’

সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় গত ৪ জুলাই আপাতত বহাল রাখে আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হলে রাষ্ট্রপক্ষকে লিভ টু আপিল (নিয়মিত আপিল) করতে বলে সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে ছয় বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। শুনানিতে আপিল বিভাগ রাষ্ট্রপক্ষের উদ্দেশে বলে, ‘আপাতত হাইকোর্টের রায় যেভাবে আছে, সেভাবে থাকুক। রায় প্রকাশিত হলে আপনারা নিয়মিত আপিল দায়ের করুন। আমরা শুনব।’ এ ছাড়া প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আন্দোলন হচ্ছে হোক। রাজপথে আন্দোলন করে কি হাইকোর্টের রায় পরিবর্তন করবেন?’

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের গতকালের বৈঠকে উপস্থিত একজন জানান, কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণার রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে নিয়ে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া এবং দ্রুত উচ্চ আদালতে শুনানির মাধ্যমে সমাধান করার চেষ্টা করবেন আইনমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে রায়ের লিখিত কপি যাতে দ্রুত হাতে পাওয়া যায় সে ব্যাপারে আইনমন্ত্রীকে তাগিদ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক।

বৈঠকে অংশ নেওয়া নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, ‘আপাতত আন্দোলন সামাল দেওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে সরকার। ভবিষ্যতে কোটা সংস্কারের বিষয়টি হোমওয়ার্ক করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সুবিধাজনক সময়ে কোটা সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যদিকে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে শিক্ষামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে পরামর্শ দিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক। এ আন্দোলনের যৌক্তিক সমাধানের পথে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে তাদের। দুটি আন্দোলনই স্পর্শকাতর বিষয়। ফলে চিন্তাভাবনা করে পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে বৈঠকে একমত হয়েছেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা।’

বৈঠক শেষে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আদালতে যে বিষয়টি বিচারাধীন আছে, আমরা সে বিষয়ে এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করব না। এটা আদালতের বিষয়। আদালত থেকে যেভাবে সিদ্ধান্ত আসবে, আমাদের অবস্থান হচ্ছে, যেহেতু আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন আছে সে বিষয়ে আমরা মন্তব্য করব না। অপেক্ষা করতে হবে। সরকার তো আপিল করেছে।’

তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত বলেন, ‘সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। রাজনৈতিক, সাংগঠনিক বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে, এটা রুটিন একটা বিষয়।’

কোটা নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্দিষ্ট এক বা দুটি বিষয় নিয়ে নয়, সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আজকের (গতকাল) বৈঠকের বিষয়টা আপনারা জেনেছেন, এই বৈঠক নিয়মিত হয়। বিভিন্ন জায়গায় বসা হয়।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত