স্মরণে কবি আহসান হাবীব 

আপডেট : ১০ জুলাই ২০২৪, ০৮:১৪ পিএম

১৯৮৫ সালের ১০ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন কবি ও সাংবাদিক আহসান হাবীব। তিনি ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি পিরোজপুর জেলার শংকরপাশা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিরোজপুর থেকে ১৯৩৫ সালে প্রবেশিকা পাস করে কিছুদিন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে আইএ ক্লাসে পড়াশোনা করেন তিনি। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে লেখাপড়া ত্যাগ করে কলকাতা যান এবং সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। কলকাতায় তিনি তকবীর, বুলবুল ও সওগাত পত্রিকায় কাজ করেন।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ঢাকায় এসে বিভিন্ন সময় আজাদ, মোহাম্মদী, কৃষক, ইত্তেহাদ ইত্যাদি পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। পরে কিছুদিন দৈনিক পাকিস্তানে কাজ করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। আহসান হাবীব আধুনিক কাব্যধারার কবি। সপ্তম শ্রেণিতে পড়াকালে ১৯৩৩ সালে স্কুল ম্যাগাজিনে তার প্রথম প্রবন্ধ ‘ধর্ম’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৪ সালে প্রথম কবিতা ‘মায়ের কবর পাড়ে কিশোর’ ছাপা হয় পিরোজপুর গভর্নমেন্ট স্কুল ম্যাগাজিনে। তার প্রথম কবিতার বই ‘রাত্রিশেষ’ ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয়।

অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ : ছায়াহরিণ, সারা দুপুর, আশায় বসতি, মেঘ বলে চৈত্রে যাব, দু’হাতে দুই আদিম পাথর, প্রেমের কবিতা, বিদীর্ণ দর্পণে মুখ ইত্যাদি। এ ছাড়া দুটি উপন্যাস : অরণ্য নীলিমা ও রাণীখালের সাঁকো, শিশুতোষ গ্রন্থ : জ্যোৎস্না রাতের গল্প, বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর, ছুটির দিনদুপুরে ইত্যাদি। মধ্যবিত্তের সংকট ও জীবনযন্ত্রণা আহসান হাবীবের কবিতার মূল বিষয়। তার ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিতে রয়েছে নাগরিক মননের ছাপ। সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ইউনেসকো সাহিত্য পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, একুশে পদকসহ নানা পুরস্কার লাভ করেন।

আহসান হাবীব

আহসান হাবীবের কয়েকটি কবিতা 

আনন্দ

আনন্দরে আনন্দ, তুই
                         কোথায় থাকিস বল।
তুই কি ভোরে ফুলের বুকে
                                  শিশির টলমল?
তুই কি সারা দুপুর জুড়ে
                          খাঁ খাঁ রোদের খেলা?
নাকি সবুজ ঘাসের বুকে
                          প্রজাপতির মেলা?
অথবা তুই বিকেল বেলা
                            পাখির ওড়াউড়ি?
নাকি আকাশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে
                           গোত্তা খাওয়া ঘুড়ি?
নাকি গাঁয়ের খেলার মাঠে
                           লাফিয়ে চলা বল?
আনন্দ রে আনন্দ, তুই
                           কোথায় থাকিস বল?
আনন্দ রে আনন্দ, বল
                       কোথায় রে তোর বাসা,
তুই কি আমার মা, নাকি তুই
                              মায়ের ভালবাসা?
বাবার হাতে তুই কি উথাল
                              মাটিতে ধান বোনা?
মায়ের হাতে কুলোয় ভরা
                                ধানের মতো সোনা?
তুই কি আমার ঘরের চালে
                                 ফুরিয়ে যাওয়া রাত?
তুই কি আমার সানকি ভরা
                                   ফুলের মতো ভাত??


রূপকথা

খেলাঘর পাতা আছে এই এখানে,
স্বপ্নের ঝিকিমিকি আঁকা যেখানে।
এখানে রাতের ছায়া ঘুমের নগর,
চোখের পাতায় ঘুম ঝরে ঝরঝর।
এইখানে খেলাঘর পাতা আমাদের,
আকাশের নীল রং ছাউনিতে এর।
পরীদের ডানা দিয়ে তৈরি দেয়াল,
প্রজাপতি রং মাখা জানালার জাল।
তারা ঝিকিমিকি পথ ঘুমের দেশের,
এইখানে খেলাঘর পাতা আমাদের।
ছোট বোন পারুলের হাতে রেখে হাত,
সাতভাই চম্পার কেটে যায় রাত।
কখনও ঘোড়ায় চড়ে হাতে নিয়ে তীর,
ঘুরে আসি সেই দেশ চম্পাবতীর।
এই খানে আমাদের মানা কিছু নাই,
নিজেদের খুশি মত কাহিনী বানাই।

স্বদেশ

এই যে নদী
নদীর জোয়ার
নৌকা সারে সারে,
একলা বসে আপন মনে
বসে নদীর ধারে
এই ছবিটি চেনা।
মনের মধ্যে যখন খুশি
এই ছবিটি আঁকি
এক পাশে তার জারুল গাছে
দু’টি হলুদ পাখি,
এমনি পাওয়া এই ছবিটি
কড়িতে নয় কেনা।
মাঠের পরে মাঠ চলেছে
নেই যেন এর শেষ
নানা কাজের মানুষগুলো
আছে নানান বেশ,
মাঠের মানুষ যায় মাঠে আর
হাটের মানূষ হাটে,
দেখে দেখে একটি ছেলের
সারাটাদিন কাটে।
এই ছেলেটির মুখ
সারাদেশের সব ছেলেদের
মুখেতে টুকটুক।
কে তুমি ভাই,
প্রশ্ন করি যখন,
ভালবাসার শিল্পী আমি,
বলবে হেসে তখন।
এই যে ছবি এমনি আঁকা
ছবির মত দেশ,
দেশের মাটি দেশের মানুষ
নানান রকম বেশ,
বাড়ি বাগান পাখ-পাখালি
সব মিলে এক ছবি,
নেই তুলি নেই রং তবুও
আঁকতে পারি সবই।

যে পায় সে পায়

তুমি ভালো না বাসলেই, বুঝতে পারি, ভালোবাসা আছে।
তুমি ভালো না বাসলেই, ভালোবাসা জীবনের নাম
ভালোবাসা ভালোবাসা বলে
দাঁড়ালে দু’হাত পেতে
ফিরিয়ে দিলেই
বুঝতে পারি ভালোবাসা আছে।

না না বলে ফেরালেই
বুঝতে পারি ফিরে যাওয়া যায় না কখনো।

না না বলে ফিরিয়ে দিলেই
ঘাতক পাখির ডাক শুনতে পাই চরাচরময়
সুসজ্জিত ঘরবাড়ি
সখের বাগান
সভামঞ্চে করতালি
জয়ধ্বনি পুষ্পার্ঘ্য ইত্যাদি
সব ফেলে
তোমার পায়ের কাছে অস্তিত্ব লুটিয়ে দিয়ে
তোমাকে না পেলে, জানি
যে পায়, সে পায়
কি অমূল্য ধন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত