সবসময় ধোপদুরস্ত। জ্যোতির্ময় চেহারা। কথা বলেন মৃদুলয়ে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ডা. অরূপরতন চৌধুরী। একুশে পদকপ্রাপ্ত এই শব্দসৈনিক এলেন ঠিক ৪টায়। বেশ কিছুক্ষণ সম্পাদক মোস্তফা মামুনের রুমে আড্ডা হলো। এরপর গেলেন ছবি তুলতে। সঙ্গে আলোকচিত্র সাংবাদিক এবং আরও কয়েকজন। একটু পর এলেন ডিজিটাল রুমে। শুরু হলো কথা বলা। আড্ডায় ছিলেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, আলোকচিত্র সম্পাদক সাহাদাত পারভেজ, হেড অব সেলস মিজানুর রহমান এবং প্রতিবেদক নাসিমুল শুভ। ক্যামেরায় ছিলেন কনটেন্ট এডিটর নুরুস সাফা।
প্রথম যৌবন থেকেই কণ্ঠে গান। সেই সঙ্গে সংগ্রামী পথচলা। একাত্তরে তিনি পড়তেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। মাত্র ১ম বর্ষে। কথা বলছেন নানা বিষয়ে। যুক্ত ছিলেন ডাকসুর সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে। বললেন আমি, ফকির আলমগীর, কাদেরী কিবরিয়াসহ আরও কয়েকজন প্রায়ই গণসংগীতের আসর বসাতাম। ৭১ বছর বয়সী ডা. অরূপরতন চৌধুরী একসময় সাহাদাত পারভেজের সঙ্গে মেতে উঠলেন আলোকচিত্র শিল্পী সাঈদা খানমকে নিয়ে। সাহাদাত পারভেজ বললেন একসময় সাঈদা আপার আলাকচিত্র প্রদর্শনীতে আপনার মাকে (ড. মঞ্জুশ্রী চৌধুরী) প্রধান অতিথি করা হয়েছিল। সাঈদা আপা আপনার মাকে নিয়ে লিখেছিলেন বেগম পত্রিকায়। ডা. অরূপরতন চৌধুরী বললেন বাবা, তার যে অবদান! তিনি তো প্রথম মহিলা ফটোসাংবাদিক ছিলেন। আমাদের বাসায় মায়ের কাছে প্রায়ই আসতেন। বললেন আমার দাদু ছিলেন সিলেট বিশ্বনাথ আকিলপুরের রায়বাহাদুর। এখনো গ্রামে নামফলক আছে। এরপর শুরু হলো আনুষ্ঠানিক কথা বলা।
তাপস রায়হান : আপনি মেডিকেলের ছাত্র থাকা অবস্থায় কোন পরিস্থিতিতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হলেন?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : ডাকসুর সাংস্কৃতিক আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। রথীন্দ্রনাথ রায়, কাদেরী কিবরিয়া, আমিসহ অনেকেই গণসংগীতের আসর বসাতাম। নেতৃত্ব দিতেন অজিত রায়, শেখ লুৎফর রহমান। দেশের গণ-আন্দোলনের সঙ্গে গণসংগীতের একটা নিবিড় সম্পর্ক ছিল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, ২৫ মার্চের কালরাত আমাকে ভীষণ নাড়া দেয় স্বাধীনতার জন্য কিছু একটা করার। এরপর মে মাসের শেষের দিকে আমি দেশ ছেড়ে যাই। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হই জুন মাসে। প্রথমে এটা ছিল আগরতলায়। এরপর জুন মাসে কিন্তু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পুরোপুরি শুরু হয়। ঠিক ওই সময় আমি ছিলাম আগরতলার একটি ক্যাম্পে। প্রথমেই আমাকে নেওয়া হয়নি। প্রমাণ করতে হয়েছে, আমি শিল্পী এবং স্বাধীনতার সপক্ষের একজন। সে সময় আগরতলার শরণার্থী ক্যাম্পে অনেক শিল্পী ছিলেন। এরপর তাদের নিয়ে যাই। একটা কথা বলা দরকার, ৭ মার্চের ভাষণ না হলে কিন্তু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতো না। যাই হোক, অনেক কিছু পার করে যখন বেতার কেন্দ্রে যাই তখন আপেল মাহমুদ, আব্দুল জব্বার, রথীন দা, সমর দাস, অজিত দাসহ অনেককে পেলাম। কিন্তু সেই বেতার কেন্দ্রের ভেতরে কিন্তু কেউ থাকত না। আমি বললাম, আমার তো থাকার জায়গা নেই। কোথায় থাকব? তখন অনেকের সঙ্গে ওপর তলার মেঝেতে সুযোগ হয় থাকার। সেটা সত্যিকার অর্থেই মেঝে। কোনো বালিশ নেই। মেঝেতে শুধু শুয়ে থাকা। নিচতলায় ছোট্ট রুমে একটা হারমোনিয়াম, একটা তবলা, একটা দোতারা আর এটা মন্দিরা দিয়ে আমাদের গান করতে হতো। আর কোনো যন্ত্র নেই। কিন্তু দেখেন, গানগুলো কিন্তু কালজয়ী। বিকালে সমর দা, গৌরী প্রসন্ন মজুমদাররা আসতেন। খুবই অল্প সময়ে গান লেখা, সুর করা আর গাওয়া। এভাবেই চলত। রেকর্ডিং হতো সারা রাত। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, কোত্থেকে এটা সম্প্রচার হচ্ছে কেউ জানতেন না। এটা এখন পর্যন্ত গোপন। একটা ঐতিহাসিক ঘটনা বলি। আমাকে দিয়ে একটা গান করালেন হরলাল রায়। মানে রথীন দার বাবা। তখন তো সব কোরাস গান গাচ্ছি। আমি তাকে বললাম, তাহলে একটা ডুয়েট গান করেন। তখন সংবাদ পাঠ করতেন নাসরিন আহমেদ মানে শিউলি আপাকে পেয়ে গেলাম। তিনি গান করতেন। ২১ অক্টোবর দ্বিতীয় অধিবেশনে সেটা প্রচারিত হলো।
সাহাদাত পারভেজ : আপনার জন্য আপনার মাকে অনেক বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। জানতে চাইছি, আপনি কি মাকে বলে গিয়েছিলেন?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : তখন ভেবেছিলাম, এটা বললে একটা করুণ পরিবেশে তৈরি হবে বাসায়। শুধু বড় বোন জানত। মা তখন ইডেন কলেজের অধ্যাপক। আমরা থাকতাম আজিমপুর কলোনিতে। সেখান থেকে নীলক্ষেত হয়ে দাউদকান্দি চলে যাই। বাস থেকে যখন নামলাম, দেখি পাক আর্মিরা সারিবদ্ধ করে পাখির মতো মানুষ গুলি করে মারছে। দৈবক্রমে আমরা ৪-৫ জন বেঁচে যাই। এরপর কুমিল্লায় ১ রাত থাকি। তারপর তো অনেক ঘটনা। পরে স্বাধীন দেশে আবার মেডিকেলে পড়া শুরু করি। বের হই ’৭৫ সালে। তখন কোর্স ছিল ৪ বছরের।
নাসিমুল শুভ : ’৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু পরিবারের হত্যাকা-ের পর দেশের অবস্থা কেমন দেখেছেন?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : এই ঘটনা জানার পর আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ভাবলাম এখন যাব কোথায়? অনেক বাধা পেরোতে হয়েছে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার কারণে। ভীষণ কষ্টে কেটেছে সেই সময়। ভারতে যাওয়ার অনেক আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছি। কিন্তু কখনো মনে হয়, ঠিক হয়নি। হয়তো দেশত্যাগই ভালো হতো। আবার সেই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি, আবার সেই জামায়াতে ইসলাম। সে সময় অনেক কষ্ট-যন্ত্রণার মধ্যে কেটেছে। মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার কারণে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিতও ছিলাম। এরপর তো নিজের একান্ত প্রচেষ্টায় এই পর্যন্ত আসা।
নাসিমুল শুভ : আমরা একটু চিকিৎসা পেশার দিকে যাই? ছোটবেলায় টিভিতে আপনাকে দেখেছি। সেই গানটা এখনো মনে আছে। ‘সিগারেট থেকে শুরু/ শেষকালে হিরোইন/ মাঝখানে মাদকের/ দাসত্ব প্রতিদিন।’ এই পেশায় থেকে আপনি যে জায়গাটা ফোকাস করেছেন সেটা একটু বলবেন?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : সাবিনা ইয়াসমিন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তখন কবীর সুমন ঢাকায়। উঠেছিল সাবিনা ইয়াসমিনের বাসায়। একদিন বলল দাদা, কবীর সুমনের দাঁতে সমস্যা। আপনাকে দেখাবে? আমি বললাম নিয়া আসো। সমস্যা কী? সুমন তো প্রচ- সিগারেট খায়। ওর সব ভাঙা দাঁত আমি ঠিক করে দিলাম। বললাম কোনো পারিশ্রমিক আমি নেব না। এরপর বললাম আমাকে মাদকের ওপর একটা গান লিখে, সুর করে দিতে হবে। তখন সুমন এই গানটা লিখেছিল। আমি, সাবিনা ইয়াসমিন, তপন চৌধুরী, কাদেরি কিবরিয়া গানটা রেকর্ড করলাম। এটা একটা ঐতিহাসিক গান। ধূমপানের ওপর একটা তথ্যচিত্রও বানালাম। সেটাও আরেক কাহিনি। বিটিভি প্রথমে এই অনুষ্ঠান প্রচার করতে চায়নি। বলেছিল, এটা কোনো অনুষ্ঠানের বিষয় নাকি! তখন তো সিগারেট খাওয়াটাই ফ্যাশন। একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তারা অনুমতি দিলেন। বিভিন্ন ফুটেজ নিয়ে বানানো ‘নেশা সর্বনাশা’ তথ্যচিত্রটি প্রচার হওয়ার পর, বিশাল সাড়া পেলাম। বিটিভিতে হাজার হাজার ফোন এলো। আর অনেক চিঠি। সবারই এক কথা। এ ধরনের অনুষ্ঠান আরও দরকার। এরপর বিটিভি কর্তৃপক্ষ এটিকে ফিলার করল। প্রতিটি অনুষ্ঠানের আগে-পরে এটা প্রচার হতো। এই যে ওর এটা এখনো মনে আছে, এর কারণ সেটাই। আমার পরিচিতিও অনেক বেড়ে গেল। বলতে গেলে, কণ্ঠশিল্পীর চেয়েও এটা ছাপিয়ে গেল।
সাহাদাত পারভেজ : এ ধরনের আইডিয়া মাথায় কেন এলো? আপনি কি তখন ধূমপান করতেন?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : হাহাহাহাহা। হ্যাঁ, আমি খেতাম। ‘চারমিনার’ সিগারেট দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। এটা একাত্তর সালেই ধরেছিলাম। আমাদের দেশে যেমন একসময় ‘স্টার’ সিগারেট নাম করেছিল, কলকাতাতেও এই ‘চারমিনার’ নাম করেছিল। সিগারেট যারা নিয়মিত খেত, তারা এই ব্র্যান্ড ছাড়া খেত না।
সাহাদাত পারভেজ : সিগারেট ছাড়লেন কেন?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : লন্ডনে যখন পড়াশোনা করতে গেলাম, সেখানে দেখলাম টোব্যাকোর ওপর অনেক রিসার্চ। সেগুলো দেখার পর আমি ছেড়ে দিয়েছি। এরপরই তো দেশে এসে এই অনুষ্ঠান করলাম। তখন থেকেই তওবা করেছিলাম। এই বিষাক্ত জিনিস তো খাবই না, বরং মানুষকে বলব এটা মানুষকে কী ভয়ংকর ক্ষতি করে। ছেড়ে দিই সেই ’৮৪ সালে। আমি কিন্তু চেইন স্মোকার ছিলাম। এরপর তো ‘মানস’ করি। পুরো নাম হচ্ছে ‘মাদকদ্রব্য নেশা নিরোধ সংস্থা’। এটা হয় ’৮৯ সালে। আসলে প্রতিটা জিনিসই আমাকে একটা ইঙ্গিত দেয়। অনুষ্ঠানটা করলাম, লন্ডন ঘুরে আসার পর। আর ‘মানস’ করলাম, আমেরিকা ঘুরে আসার পর।
তাপস রায়হান : ডক্টরেট কীসের ওপর করেছেন?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : ডক্টরেট করি নিউট্রেশন অ্যান্ড ডেন্টাল হেলথের ওপর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড অ্যান্ড নিউট্রেশন থেকে পিএইচডি করেছি । আমার মাও তো পিএইচডি করেছেন বাংলায়। আসলে মায়ের ইচ্ছা পূরণ করার জন্যই এটা করা।
মিজানুর রহমান : চলচ্চিত্রে কেন এলেন?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : এটার একটা কাহিনি আছে। চিন্তা করলাম, এই যে মাদকের ওপর হাজার হাজার অনুষ্ঠান করলাম, এগুলো টিকে থাকবে কত দিন? কোনো আর্কাইভ নেই। কিন্তু একটা চলচ্চিত্র লাইফ টাইম আর্কাইভে থাকে। আপনি কিন্তু এখনো ‘মুখ ও মুখোশে’র কথা বলেন। কেন এই ছবির কথা বলেন? এই যে আব্দুল জব্বার খান প্রথম সবাক ছবি বানিয়েছিল, এটা আমরা জানলাম কীভাবে? কারণ এখনো এটা আর্কাইভে আছে। টিভি অনুষ্ঠানের এ রকম নেই। আসল কথা হচ্ছে, সন্তান মাদকাসক্ত হলে তাকে ঘৃণা করা যাবে না। তাকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে নিতে হবে। দিতে হবে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা। ধীরে ধীরে ফলোআপের মাধ্যমে সে সুস্থ হবে। এখানে পরিবারের সাপোর্ট জরুরি।
নাসিমুল শুভ : বাজেটে প্রতি বছর সিগারেটের দাম বাড়ছে। এর ফলে সরকারের ট্যাক্স বাড়ছে। সবারই লাভ হচ্ছে। কিন্তু যারা সিগারেট খায়, তারা কিন্তু ছাড়ছে না। আদতে কোনো লাভ হচ্ছে সিগারেটের দাম বাড়িয়ে?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : এর কারণ দুটো? একটি হচ্ছে তামাক কোম্পানির সরকারের সঙ্গে বিরাট সম্পর্ক আছে। তারা বছরে সবচেয়ে বেশি ট্যাক্স দেয়। সরকার এটা বুঝেও না বোঝার ভান করে। বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ হিসাব করে তাদের দেখিয়েছেন। আমরা বলেছি এই যে আপনারা বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকা পান, প্রতি বছর যে ১২ লাখ মানুষ তামাকের কারণে অসুস্থ হচ্ছে, ৪ লাখ মানুষ পঙ্গু হচ্ছে, ১ লাখ ৬৫ হাজার মানুষ মারা যায়, তার যে অর্থনৈতিক ক্ষতি এটা ৬০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
তাপস রায়হান : এই যে সিগারেটের দাম প্রতি বছর বাড়ছে সরকার কী চাইছে তাদের ট্যাক্স বাড়ুক নাকি মানুষ সিগারেট থেকে দূরে থাকুক এটা চাইছে?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : দুটোই। সরকারের এখানে কোনো কমিটমেন্ট নেই। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে কিন্তু নিষেধ করা হয়েছে সরকারিভাবে। আমরা শুনেছি, সরকারের একজন সচিবের সঙ্গে তামাক কোম্পানির শেয়ার আছে। সবকিছু আইওয়াশ। সরকার কোনোভাবেই চায় না, ধূমপান বন্ধ হোক।
নাসিমুল শুভ : ২০৪০ সালের মধ্যে ধূমপানমুক্ত দেশ গড়া সম্ভব?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : (খেতে খেতে বললেন) সরষে ক্ষেতে ভূত থাকলে কোনো দিনই ভূত তাড়াতে পারবেন না। এখানে তো সরকারের লোকজনই তামাক কোম্পানির শেয়ারে আছে। কীভাবে করবেন? আমরা তো জানি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্স আছে। প্রশাসনের সবার তো নেই। তার সঙ্গে জিরো টলারেন্স নীতিতে কেউ যাচ্ছে না। আমি তো নিজের পকেটের পয়সা দিয়ে, তামাকবিরোধী আন্দোলন শুরু করেছিলাম। এখনো করে যাচ্ছি। এখন তামাকবিরোধী সংগঠনের অভাব নেই। কিন্তু লাভ কী হচ্ছে? ধূমপান আরও বেড়েছে। মেয়েরাও প্রকাশ্যে খাচ্ছে। তারা রিকশা, হোন্ডায় বসে এসব খাচ্ছে। আবার সীসা ক্লাবেও তাদের পাবেন। এটা এখন অনেকটা তাদের কাছে ফ্যাশন। কিছু কিছু সিনেমা, ওটিটির তো তুলনা নেই। এই যে সম্প্রতি শাকিব খানের ‘তুফান’ ছবিটা মুক্তি পেল এটার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তো সিগারেট। আমার সন্দেহ হয়, তামাক কোম্পানি কি এটার স্পন্সর করেছে? নায়ক, নায়িকা, ভিলেন, পুলিশ সবাই খাচ্ছে। এমনকি পুলিশ অফিসার চঞ্চল চৌধুরীর মুখেও সিগারেট। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে বলা আছে পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষেধ। সে পুলিশ হয়ে কীভাবে খায়! এগুলো প্রদর্শন করাই তো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মাননীয় তথ্যমন্ত্রী, সচিব, সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যানকে আমরা চিঠি দিয়েছি এ ব্যাপারে। এই ছবি নাকি আনকাট সেন্সর হয়েছে। কখন এসব হয়! এর পেছনে অনেক ষড়যন্ত্র। কোনোভাবেই আমরা পারছি না। যুদ্ধ করেই যাচ্ছি। ২০৪০ সালের মধ্যে করতে চাইলে, সরকারের যে সমস্ত লোকের শেয়ার রয়েছে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। আরও বেশি জিরো টলারেন্স নীতিতে আসতে হবে।
সাহাদাত পারভেজ : আমার অল্প মনে পড়ে, তখন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান। তাকে একজন ডাক্তার বলেছিলেন ধূমপান আইন করে বন্ধ করে দেন। তিনি নাকি বলেছিলেন- আমাকে জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে দাও। আমি দেশ চালাব কীভাবে! সেই ডাক্তার কি আপনি?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : হাহাহাহাহাহা। (ডা. অরূপরতন চৌধুরী কফি খাচ্ছেন আর মুচকি হাসছেন। বললেন) আমিই ছিলাম। আপনার কোনো সন্দেহ আছে? এসব আমি ছাড়া কে বলবে! এখনো তো মাননীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে প্রায়ই দেখা করি। তারা বলেন, এত ট্যাক্স দেয় কীভাবে কী করব! প্রথমেই নেগেটিভ মানসিকতা। আমার মনে হয়, তাদের ধারণা এই ট্যাক্স ছাড়া দেশ চলবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু করে দেখিয়েছেন না, ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের টাকা লাগে না। কই, লাগছে? এ ধরনের কমিটমেন্ট যদি একজন মন্ত্রীর থাকত, তাহলে এটা কোনো বিষয় না।
নাসিমুল শুভ : আমরা একটু রাজনীতির দিকে যাই। সিলেটে আপনি একটা আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন, পাননি। এখনো কি নির্বাচনের ইচ্ছা আছে?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : না, একেবারেই নেই। দেখেন, বলা হতো রাজনীতিতে পরিষ্কার মানুষ আসে না। সংসদ এখন ব্যবসায়ীতে ভরে গেছে। কিছু ভালো মানুষ রাজনীতিতে এলে, রাজনৈতিক পরিবেশটাও ভালো হয়। আমি তো রাজনীতির ভেতর দিয়েই বড় হয়েছি। আমার এলাকা, সিলেটের বিশ্বনাথের সঙ্গেও আমার যোগাযোগ আছে। গত ৩-৪ বছর আমি নিয়মিত এলাকায় গেছি। কই, আমি তো সিলেট-২ থেকে নমিনেশন পাইনি? এখন রাজনীতির যে চেহারা উন্মোচিত হচ্ছে, তাতে না আসাটাই ভালো হয়েছে।
তাপস রায়হান : আপনারই বা রাজনীতি করার, নির্বাচন করার ইচ্ছা হলো কেন!
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : আমি তো দীর্ঘদিন এর সঙ্গে জড়িয়ে আছি। এলাকায় যাচ্ছি। আমি কাজ করতে চেয়েছিলাম। এটা কি ভুল চাওয়া? আমাদের বিশ্বনাথ কিন্তু দারুণ অবহেলিত। এলাকার মানুষ আমাকে সাপোর্ট করেছিল। বলেছিল- আপনি ঐতিহ্যবাহী জমিদারবাড়ির সন্তান। এখানে সনাতন ধর্মাবলম্বী রয়েছে অনেক। তারা আমাকে সমর্থন করেছিল। বলেছিল- আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত। আপনার মা একজন বিদূষী মানুষ। ৩ ভাইবোন উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত। আপনার মতোন মানুষ এমপি হলে, আমরা গর্বিত হব। তারাই আমাকে নামিয়েছিল। আমার কিন্তু একটা আশা ছিল, নেত্রী বিষয়টা দেখবেন। কিন্তু সেটা পাইনি। আমি খুবই হতাশ। মনে হয় না, এখানে ভালো মানুষের কোনো প্রয়োজন আছে।
তাপস রায়হান : আপনার পারিবারিক জীবনের কথা জানতে চাচ্ছি?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : আমার একজন স্ত্রী , হাহাহাহাহাহা। নাম গৌরী চৌধুরী। আগে শিক্ষক ছিলেন, এখন গৃহিণী। দুই ছেলে। এক ছেলে ইংল্যান্ডে আরেকজন অস্ট্রেলিয়ায়। বড় ছেলে ব্যবসা করে। ছোট ছেলে সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। দুজনই প্রতিষ্ঠিত এবং বিবাহিত।
সাহাদাত পারভেজ : সময় কাটে কীভাবে?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : অনেক কাজ করি।
তাপস রায়হান : বারডেমে এখনো আছেন?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : হ্যাঁ। ওখানে অনারারি সিনিয়র কনসালট্যান্ট। অধ্যাপক হিসেবে আছি। ক্লাস নিই। ছেলেমেয়েদের পড়াই। গবেষণা করি। বই লিখি। এ পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিষয়ক বই ২৪টা প্রকাশিত হয়েছে। টিভি-রেডিওতে নিয়মিত অনুষ্ঠান করি। আর চেম্বার তো আছেই। আমার মনে হয়, কখনো অবসরে যাব না। কাজ করতে করতে একদিন মারা যাব। আমি কাজের মধ্যে থাকতে চাই।
সাহাদাত পারভেজ : আপনার বাবার কথা, সেই অর্থে জানা হলো না?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : তিনি তো জমিদার ছিলেন- শৈলেন্দ্র কুমার চৌধুরী। জমিদারি প্রথা যাওয়ার পর, কিছুদিন ব্যাংকে চাকরি করেছেন, শিক্ষকতাও করেছেন।
নাসিমুল শুভ : আপনাদের গ্রামের বাড়িটা আছে?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : হ্যাঁ। এখনো আছে। বাবার প্রজারাই তো অনেক জমি জবরদখল করে নিয়েছে। তবে এখন শুনেছি, যার কাছে জমির দলিল থাকবে, সেই মালিক। আমি যদি এখন দাবি করি, তাহলে আমিও পাব। কে যায় এসব ঠিক করতে!
তাপস রায়হান : শেষ ইচ্ছা?
ডা. অরূপরতন চৌধুরী : আরে, আমি কি ফাঁসির আসামি। শেষ ইচ্ছা মানে! হাহাহাহাহাহা। অনেক আছে। এখন বলব না।
আনুষ্ঠানিকভাবে আড্ডা শেষ হওয়ার পর সাহাদাত পারভেজ বললেন- আপনার চেহারা তো একদম মায়ের মতোই। ডা. অরূপরতন চৌধুরী ঘাড় দুলিয়ে হেসে বললেন- হ্যাঁ হ্যাঁ। অনেকেই বলে।
এক নজরে
সদস্য, জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটি ও সদস্য, জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ টাস্কফোর্স কমিটি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটির উপদেষ্টা এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত টাস্কফোর্স সদস্য। ১৯৮০ সাল থেকে বেতার ও টেলিভিশনে একজন সফল স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপক। বেতার, টিভিতে বিশেষ শ্রেণিভুক্ত রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী। রবীন্দ্রসংগীতের ৪টি অডিও সিডি ও দুটি ভিসিডি প্রকাশিত হয়েছে।
স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র : ১. ডায়াবেটিস রোগসংক্রান্ত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘শৃঙ্খলাই জীবন’ এবং ‘শিশুদের ডায়াবেটিস’ (টিভিতে নিয়মিত প্রচারিত স্বাস্থ্যমূলক অনুষ্ঠান)।
২. ‘নেশা সর্বনাশা’ বিটিভিতে নিয়মিত প্রচারিত হচ্ছে।
পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র : ‘স্বর্গ থেকে নরক’।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ : মুখ ও দাঁতের ৬০টি সমস্যা ও সমাধান, সুন্দর দাঁতে সুন্দর হাসি, মাদকাসক্তি ও এইডস্, আর ধূমপান নয়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ইত্যাদি।
গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য
ছবি : আবুল কালাম আজাদ
লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ