কোথায় হারাল সাম্বার ছন্দ?

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৪, ০১:৪৮ পিএম

যদি প্রশ্ন করা হয়, আপনি ফুটবল কেন দেখেন? শুধুই ৯০ মিনিটের রোমাঞ্চের জন্য নাকি আরও কিছু খুঁজে বেড়ান সবুজ মাঠে? আপনি যদি বিংশ শতাব্দীর ফুটবল দর্শক হন, তাহলে নিশ্চয়ই মাঠে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে পেয়েছেন ফুটবলীয় সৌন্দর্যের খোঁজ। দশকের পর দশক এই সৌন্দর্যের যোগান দিয়ে গেছে ল্যাটিন ফুটবল। একটা সময় ব্রাজিলের ফুটবল মানেই ছিল ছন্দবদ্ধ আক্রমণ। সাম্বার তালে তালে একযোগে আক্রমণে যেতেন রোনালদো, রিভালদো, রবার্তো কার্লোস, রোমারিওরা। ব্রাজিলের ফুটবলে সেই সাম্বার ছন্দ এখন আর নেই। ছন্দের মতোই যেন হারিয়ে গেছে ব্রাজিল ফুটবলে সোনালী সময়। ফুটবলবিশ্বে একটা সময় রাজত্ব করে বেড়ানো দলটি এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। ল্যাটিন রাজত্ব ছিনিয়ে নিয়েছে ইউরোপের ছন্দহীন গতিময় ফুটবল।

কাতার বিশ্বকাপের পর কোপা আমেরিকা- বৈশ্বিক ও মহাদেশীয় ফুটবলের সবশেষ দুই বড় ইভেন্টে ব্রাজিলকে স্বরূপে দেখা যায়নি। জয়-পরাজয় ছাপিয়ে সমালোচিত হয়েছে তাদের ছন্নছাড়া ফুটবল। নেইমারের পরবর্তী সময়ে যাদেরকে আইকন হিসেবে ভাবা হচ্ছে, সেই ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কিংবা হাল আমলের এনদ্রিক- কেউই নিজেদের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি। অথচ এই উঠতি তারকারাই ক্লাব ফুটবল মাতিয়ে দিচ্ছেন। দলকে এনে দিচ্ছেন শিরোপা। তাহলে ব্রাজিল ফুটবলে সমস্যাটা কোথায়? এর শেকড় কতটা গভীরে?

কোপা আমেরিকার শেষ আট থেকে বিদায় নিয়েও চাকরি টিকে গেছে দরিভাল জুনিয়রের। তিনি ২০২৬ বিশ্বকাপ টার্গেট করে দলটিকে পুনর্গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। এই মুহূর্তে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলে কোনো আইকন নেই, যাকে কেন্দ্র করে একটি দল পুনর্গঠিত হবে। ব্রাজিল ফুটবলের দীর্ঘ ইতিহাসে অসংখ্য সুপারস্টার উঠে এসেছে। কিন্তু গত দুই দশক ধরে এই জায়গায় তৈরি হয়েছে শূন্যতা। আর্জেন্টিনার যেমন আছেন লিওনেল মেসি। এমন একটি আইকনিক ফিগারকে কেন্দ্র করে তাদের ৩৬ বছরের বৈশ্বিক শিরোপা ঘুচেছে। টানা দুই বার কোপা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এমি মার্তিনেজরা প্রকাশ্যে বলে দিতে পেরেছেন, মেসির জন্য তারা জীবন দিতে প্রস্তুত। ব্রাজিল ফুটবলে এমন কারও অভাব। দলটির সবচেয়ে বড় তারকা নেইমার ভীষণ চোটপ্রবণ। গত কয়েক বছর ধরে মাঠের বাইরেই তার বেশিরভাগ সময় কাটে। ক্যারিয়ার বেশ বড় হলেও নেই কোনো ব্যালন ডি’অর। পাশাপাশি সমালোচনাও আছে, ক্যারিয়ারের চেয়ে টাকার দিকেই নাকি তার মনোযোগ বেশি। বার্সেলোনা থেকে পিএসজিতে ব্যর্থ মিশন শেষে এখন খেলছেন সৌদি ক্লাব আল হিলালে। সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন পুরনো চোট। তাই তাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে পারেন না ব্রাজিলের কোচেরা।

ব্রাজিল ফুটবলের পতনের দেশটির ফেডারেশনের সিদ্ধান্তহীনতার দায়ও কী কম? গত বিশ্বকাপের শেষ আট থেকে ব্রাজিলের বিদায়ের পর তখনকার কোচ তিতে পদত্যাগ করেছিলেন। পরবর্তী কোচ নিয়োগ দিতে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশন দেড় বছর সময় নিয়েছে! একটা সময় বিদেশি কোচও তারা নিয়োগ দিতে চেয়েছে, যা নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে বিস্তর। যে দেশে এত এত সুপারস্টারের জন্ম হয়েছে, সে দেশের ফুটবল কেন বিদেশি কারও অধীনে থাকবে? এসব কথায় কান না দিয়ে তারা কার্লো আনচেলত্তিকে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদ আনচেলত্তির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করায় ব্রাজিলের সেই মিশন ব্যর্থ হয়। এরপরই চলতি বছরের জানুয়ারিতে কোচের দায়িত্ব পেলেন দরিভাল জুনিয়র। তার অধীনে বিচ্ছিন্ন কিছু সাফল্য এলেও কোপা আমেরিকার মঞ্চে ভেঙে পড়ে ব্রাজিল। ফুটবলবোদ্ধা থেকে শুরু করে সাধারণ দর্শকরাও হতবাক হয়ে বললেন, এ কোন ব্রাজিল?

শেষ আট থেকে বিদায় নেওয়ার পর দরিভাল জুনিয়র বললেন, ‘আমরা সবাই চাই এই দলটা যেন অতীতের সেই জায়গায় ফিরে যায়।’ তার মতোই ল্যাটিন ফুটবলের কোটি কোটি ভক্ত স্বপ্ন দেখে, একদিন ব্রাজিলের ফুটবলে ফিরবে পুরনো সেই ছন্দ। কিন্তু পথটা খুবই কঠিন। তৃতীয় বিশ্বকাপ শিরোপার জন্য আর্জেন্টিনাকে ৩৬ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ২০০২ সালে সবশেষ বিশ্বকাপ জেতা ব্রাজিলের ‘হেক্সা মিশন’ শেষ কবে হবে- তা কেউ জানে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত