রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর বা পঙ্গু হাসপাতাল) ক্যাজুয়ালিটি-২ ওয়ার্ডে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে চলমান সহিংসতায় গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৩৬ রোগী। এই রোগীদের মধ্যে ৬ জনের ইতোমধ্যে বাম বা ডান যেকোনো একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার কারণে পা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন আরও অনেকেই।
এই রোগীদের কারও কারও হাতে গুলি লেগেও গুরুতর আহত হয়েছেন, গুলিবিদ্ধ ৬ জনের হাত কেটে ফেলতে হতে পারে। চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন হাত পা যাতে কেটে ফেলতে না হয় বিকল্প উপায়ে সর্বোচ্চ চিকিৎসা করে সুস্থ রাখার প্রাণান্ত লড়াই করছেন তবুও অনেকের শেষ রক্ষা হবে কী না নিশ্চিত নয়। এদের কারও লেগেছে একটি গুলি, কারও একাধিক সেই সাথে ছররা গুলিও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে বিছানায় কাতরাচ্ছেন তারা।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে পঙ্গু হাসপাতাল ঘুরে দেখেন দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদক। একদিকে নিজের হাত পা হারানোর শঙ্কা অন্যদিকে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। দেশের বিভিন্ন স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এই মানুষগুলোই তাদের পরিবার চালানোর ভরসা। সারাদিন পরিশ্রম করে তারা যা উপার্জন করেন তা দিয়েই সংসার চলতো তাদের। অথচ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এই মানুষগুলোর উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে। এখন চিকিৎসা খরচ ও সংসার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।
১৯ বছরের তরুণ আকতার হুসেন। চিটাগাং রোড এলাকার একটা সেলুনে কাজ শিখছেন। প্রতিদিনের মতো গত শনিবারও তিনি সেলুনে গিয়েছিলেন। বিকেল থেকে চিটাগাং রোড এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলছিল। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিনি বাসায় ফেরার জন্য বের হন। তিনি বলেন, রাস্তায় বের হলে পুনরায় গোলাগুলি শুরু হয়, অন্যান্য মানুষের দেখাদেখি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য আমিও দৌড় শুরু করি। একটা গুলি এসে বাম পায়ে লাগে। এর মধ্যে আমার শরীরে একাধিক অপারেশন হয়েছে, বড় একটা অপারেশনের মাধ্যমে গত সোমবার বাম পায়ের হাঁটু থেকে কেটে ফেলা হয়েছে।
১৬ বছরের আরেক তরুণ নাজিম যে পেশায় কারখানা শ্রমিক। কারখানায় কাজ করে রিকশাচালক বাবাকে পরিবার চালাতে সহযোগিতা করতেন নিয়মিত। নারায়নগঞ্জের কাচপুর এলাকার একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় শ্রমিকের কাজ করে প্রতি মাসে যে টাকা বেতন পেতেন তা তুলে দিতেন বাবা মায়ের হাতে।
নাজিম বলেন, গত শনিবার বিকেল ৫টার দিকে কাজ শেষে বাসায় ফিরছিলাম। চিটাগাং রোডে গোলাগুলি হচ্ছিল, চারদিকে মানুষ দৌড়াচ্ছিল। হেলিকপ্টার থেকেও গুলি করা হচ্ছিল। আমার বাম পায়ে একটা গুলি লাগে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
তার মা মরিয়ম বেগম বলেন, আমার ছোট বাচ্চাটাকে গুলি করা হল, এই বয়সে তার একটা পা কেটে ফেলা হয়েছে। তার জীবন কীভাবে চলবে, আমার বাচ্চাকে গুলি করা হয়েছে এই দোষ আমি কাকে দেব?
হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন গুলিবিদ্ধ প্রাইভেট কার চালক সজিব খান। গত শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে তার ডান হাতে গুলি লাগে। সজীব খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমার হাতে একটা গুলি লেগে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত হাত কেটে ফেলে দিতে হয় কি না সেই চিন্তায় দিন কাটছে।
তার পাশে বসে অসহায় দৃষ্টিতে সময় পার করছেন স্ত্রী সেফালি বেগম। তিনি বলেন, ৩ জনের সংসারে স্বামীই একমাত্র উপার্জনকারী। এই মানুষটি গুলি নিয়ে হাসপাতালে, ডাক্তাররা বলছেন হাত যদি কেটে নাও ফেলা হয় আগামী দেড় দু বছর কোনো কাজ করতে পারবে না। উনি কাজ না করলে আমাদের মুখে খাবার কিনে কে দেবে? এখন আমাদের গ্রামে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু গ্রামে গেলেও কে আমাদের খাবার দেবে। আমাদের রাস্তায় বসা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
