গোয়েন্দা নজরদারি হাসপাতালে, আতঙ্কে পালাচ্ছেন আহতরা

  • সারা দেশে আটক অন্তত ৭০ জন
  • মোড়ে মোড়ে পুলিশ, র‍্যাব বিজিবি ও সেনাবাহিনী
  • বিক্ষোভ সংঘর্ষ লাঠিচার্জ বিভিন্ন জায়গায়
আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৪, ০১:০২ পিএম

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার ঘটনায় আহতরা রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ আহতদের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছেন সাধারণ পোশাকে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এই গুলিবিদ্ধদের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। আবার অনেক আহতকে জেরা করা হচ্ছে সংঘর্ষের মধ্যে যাওয়ার কারণ জানতে।

এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন আহত রোগী ও তাদের স্বজনরা। ফলে গ্রেপ্তার আতঙ্কে অনেকেই চিকিৎসা শেষ না করেই হাসপাতাল ছাড়ছেন। তবে পুলিশ বলছে, আতঙ্কের কিছু নেই।

গতকাল সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (নিটোর বা পঙ্গু হাসপাতাল) ঘুরে চিকিৎসক, নার্স, রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে গুরুতর আহতদের বেশিরভাগই রাজধানীর অন্যতম প্রধান এই চার হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। চিকিৎসাধীন রোগীরা চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখেই গ্রেপ্তারের ভয় ও আইনি জটিলতা এড়াতে গোপনে হাসপাতাল ছাড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’র তিন সমন্বয়ককে গণস্বাস্থ্য হাসপাতাল থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) হেফাজতে নেওয়ার ঘটনা থেকেই মূলত গ্রেপ্তার আতঙ্ক শুরু হয়। তাই আহতরা পুরোপুরি সুস্থ না হয়ে অনেকেই হাসপাতাল ছাড়ছেন। অনেকে হাসপাতালকে না জানিয়েও চলে গেছেন বলে জানা গেছে। আন্দোলনের শুরু থেকে হাসপাতালে ভর্তি আহত রোগীদের ওপর নজরদারি চালায় পুলিশ। দিনে দিনে এই নজরদারি বাড়ছে। এখন পর্যন্ত সমন্বনয়কদের বাইরে কাউকে হাসপাতাল থেকে আটক করা না হলেও ভবিষ্যতে আইনি জটিলতায় পড়ার শঙ্কা কাজ করছে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে।

সরেজমিনে ঢামেক এলাকায় দেখা গেছে, হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেট থেকে ঢুকতেই পাঁচ-ছয়জন পোশাক পরিহিত পুলিশ বসে আছে। এর পর ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেছে, হাসপাতাল গেটে রোগীর জটলা। সেখানেও অনেকে সাদাপোশাকে আহত রোগীদের নাম জানতে চাইছে। জেলা শহর থেকে গুলিবিদ্ধ আহত যেসব রোগী ঢামেকে আসছে, তাদের নাম-পরিচয় টুকে নেওয়া হচ্ছে। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদক গুলিবিদ্ধ আহত এক রোগীর বিষয়ে জানতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক সদস্য বলে ওঠেন, ‘আপনি কে?’ পরিচয় দেওয়ার পরে তিনি তার পকেট থেকে কার্ড বের করে জানান গোয়েন্দা কর্মকর্তা। এরপর জরুরি বিভাগে সাধারণ পোশাকে অবস্থানরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে দেখা হয়। গুলিবিদ্ধ আহত রোগীদের দেখতে ঢামেকের জরুরি বিভাগের বার্ন ইউনিটে গেলে সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক কর্মকর্তাকে দেখা যায়। হাসপাতালের অনেক কর্মীও তাদের ভয়ে কথা বলতে রাজি নয়। রোগীদের সঙ্গে কথা বলতে ও ছবি তুলতে গেলে হাসপাতালের কর্মীরা নিষেধ করেন। আবার আহত রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তারাও আতঙ্কে থাকেন। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢামেকের এক কর্মী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সহিংসতায় আহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা নিয়েছে ঢামেকে। এই হাসপাতালে ১৫ থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত আট দিনে ১ হাজার ৫৬০ জন চিকিৎসার জন্য এসেছে। এর মধ্যে গুরুতর অবস্থায় ভর্তি হয়েছে ৩৭১ জন। অনেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল থেকে চলে গেছে। গুলিবিদ্ধ ভর্তি রোগীদের অনেক পরিবার তাদের নিয়ে যাচ্ছে।’

চিকিৎসাধীন হাসান নামে এক আহতের সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। তিনি বলেন, ‘কে কোন এলাকায় আহত হয়েছেন, রোগীদের এমন তথ্য নেওয়া হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। তবে কী কারণে নেওয়া হয়েছে, তা জানি না। এ নিয়ে অনেক ভয়ে আছি।’

আহত বেসরকারি একটি কলেজের শিক্ষার্থী সিয়াম জানান, তার দুই পা গুলিবিদ্ধ হয়েছে ঢাকা কলেজ এলাকায়। কাছে গিয়ে কথা বলতে চাইলে স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তার মামা মতিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাবা, আমার ভাগ্নে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তাকে চিকিৎসার জন্য এখানে নিয়ে আসছি। আপনারা যদি কিছুক্ষণ পরপর আসেন তাহলে আমাদের এখান থেকে চলে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।’ পরে সাংবাদিক পরিচয় দিলে তিনি কথা বলেন। তখন তিনি জানান, অনেকে এসে নাম-পরিচয় জানতে চেয়েছে। আর ছাত্র হওয়ায় সিয়ামের কাছে অনেকে এসে জেরা করছে।’

এ বিষয়ে ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া বলেন, ‘সংঘর্ষের ঘটনায় অনেক আহত রোগী আসছে। তাদের অনেকে সুস্থ হয়ে ফিরে গেছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জেরা বা তথ্য সংগ্রহর বিষয়টি মিথ্যা। অনেক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা ঢামেকে কাজ করেন, এটা সত্যি। তবে ঢামেকে রোগীদের আতঙ্কের কিছু নেই।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে পঙ্গু হাসপাতালের প্রধান ফটকে কথা হয় এক রোগীর স্বজনের সঙ্গে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই স্বজন বলেন, ‘আমার রোগী পায়ে গুলিবিদ্ধ হয় রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায়। ২১ জুলাই থেকে তার চিকিৎসা এই হাসপাতালে চলছে। রবিবার সন্ধ্যার পর সাদাপোশাকে ছয়-সাতজন হাসপাতালে আসে। তারা রোগীদের ভিডিও করে নিয়ে যায়। এরপর থেকে আমরা যারা রোগী নিয়ে ভর্তি আছি, তারা ভয়ের মধ্যে আছি। একে তো হাসপাতালের যন্ত্রণা, এর মধ্যে পুলিশি যন্ত্রণা শুরু হলে হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।’

জরুরি বিভাগের ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ড-২-এ গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এক রোগীর স্বজনরা। জানতে চাইলে তারা বলেন, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার আনাগোনা বেড়েছে হাসপাতালে। এখন যদি পুলিশ পরিচয় নিয়ে রাখে তাহলে যেকোনো সময় আইনি ঝামেলায় পড়তে হতে পারে। তাই হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র না নিয়েই চলে যাচ্ছেন।

এ বিষয়ে পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী শামীম উজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে পুলিশ কিংবা বাইরের যে কেউ প্রবেশ করতে হলে অনুমতি নিতে হয়। এখন পর্যন্ত আমার কাছে প্রশাসন থেকে এ রকম কোনো অনুমতি চাওয়া হয়নি। তা ছাড়া হাসপাতালে যারা ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে, সেই রোগী বা তাদের স্বজনরাও পুলিশি হয়রানির কোনো অভিযোগ জানাননি।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আহত রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘পাঁচ-সাতজনের একটি দল এসে ভিডিও করে নিয়ে গেছে। পরে শুনেছি তারা নাকি ডিবির লোক। আমরা তো আন্দোলনে যাইনি, রাস্তায় কাজ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছি। হাসপাতালে কেন পুলিশ আসবে, রোগীরা ভয়ে আছি।’

একাধিক চিকিৎসক ও নার্স নিশ্চিত করেন রবিবার রাতে ও গতকাল সকালে সাদাপোশাকে পুলিশের কয়েকজন সদস্য এসে হাসপাতাল ঘুরে গেছেন। তবে তারা রোগীদের ভিডিও করে নিলেও কাউকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বলেন, ‘বিভিন্ন সময় পুলিশের পক্ষ থেকে রোগীদের তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। কিন্তু মানবিক দিক বিবেচনা করে রোগীদের নিরাপত্তার জন্য হাসপাতাল থেকে তথ্য দেওয়া হয়নি। শুরু থেকেই অনেক রোগী পুলিশি হয়রানির ভয়ে নিজের নাম গোপন করে চিকিৎসা নিয়েছে, আমরা বুঝেও ছাড় দিয়েছি।’

এদিকে চক্ষু হাসপাতালে গতকাল মাত্র ১০ জনের মতো রোগী ভর্তি পাওয়া গেছে। ১৭ থেকে ২৯ জুলাই পর্যন্ত ৫ শতাধিক রোগী এই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিলেও পুলিশ আতঙ্কে বাকিরা হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘পুলিশি হয়রানির কোনো অভিযোগ নেই। যাদের চিকিৎসা শেষ হয়েছে, তারা বাড়ি চলে গেছে। পুলিশ হাসপাতালে আসেনি। আমাদের রোগীদের যে ধরনের ইনজুরি তাতে বেশিদিন হাসপাতালে ভর্তি থাকার প্রয়োজন নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত