সময় অনুকূল কি না সেটাই প্রশ্ন

আপডেট : ৩১ জুলাই ২০২৪, ০৭:০১ এএম

জামায়াত ও তাদের ছাত্র সংগঠন শিবির নিষিদ্ধ করার এখনই উপযুক্ত সময় কি না, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে আওয়ামী লীগে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিশ্চয়ই ঐতিহাসিক একটি ব্যাপার। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বকারী দল আওয়ামী লীগের কাছে কোটি কোটি মানুষের দাবি এটা। এটি পূরণ হলে সাধুবাদ পাওয়া উচিত সরকার তথা আওয়ামী লীগের। কিন্তু আওয়ামী লীগ তথা সরকারের জন্য এ দাবি পূরণে সময় কতটা অনুকূল সেই প্রশ্ন বেশিরভাগ নীতিনির্ধারকদের।

তবে সরকার তথা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, জামায়াত-শিবির নির্মূল মিশনকে প্রশ্নহীন করে তুলতে নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সূত্রগুলো আরও জানায়, জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ না করা হলে দলটির নেতাকর্মীদের দমনের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি মহলের নানা সমালোচনার মুখে পড়তে হবে সরকারকে। সংগঠন নিষিদ্ধ করলে তাদের ওপর দমন-পীড়নের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক মহলে তেমন প্রশ্নের মুখে পড়তে হবে না বলে মনে করছে সরকার।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত সোমবার গণভবনে ১৪-দলীয় জোটের বৈঠক থেকে নেওয়া এ সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগের কারও কোনো দ্বিমত নেই। তবে সময় কতখানি অনুকূল সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ ব্যাপারে নানা প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে সবার জানিয়ে তিনি মনে করেন, স্বাভাবিক সময়ে এ সিদ্ধান্ত ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ উদযাপন হতো। মিষ্টি বিতরণ হতো। কিন্তু সে ধরনের আবহ এখন সৃষ্টি হয়নি বলে তিনি মনে করেন।

ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এ নেতা বলেন, কোটাবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে ধ্বংসযজ্ঞে শিবিরের নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে। ফলে সরকার যেকোনো মূল্যে তাদের দমন করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য জাতীয়-আন্তর্জাতিক প্রশ্ন এড়াতে হলে জামায়াত ও তার ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করা ছাড়া সরকারের সামনে কোনো পথ খোলা নেই।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, এ সিদ্ধান্ত মুক্তিযুদ্ধের পর নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের একটি। অথচ কোনো বাহবা নেই। এটিও পর্যালোচনার বিষয়। তারা বলেন, দেশে বিদ্যমান ঘোলাটে পরিস্থিতির মধ্যে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত যেভাবে প্রশংসনীয় হওয়ার কথা ছিল সেটি দেখা যাচ্ছে না। বরং জনমনে এক ধরনের আশঙ্কা বিরাজ করছে। কতটা উপযুক্ত সময় সেটা নিয়ে বেশ আলোচনা চলছে। নিষিদ্ধ হওয়ার পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বা আওয়ামী লীগ কতটা প্রস্তুত সেটা নিয়েও আলোচনা রয়েছে দলের ভেতরে।

দলের নীতিনির্ধারকরা দাবি করেন, দেশে ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে এক ধরনের সেন্টিমেন্ট আছে। ফলে সহিংসতা, ধ্বংসযজ্ঞ, মৃত্যুর মতো দুর্ঘটনাগুলো মোকাবিলায় সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতিকারমূলক যেকোনো পদক্ষেপ সরকার নিতে যাচ্ছে সেন্টিমেন্ট সরকারের পক্ষে আনা অসম্ভব হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার ঘটনায় উদ্ভূত পরিস্থিতি ভিন্ন কোনোদিকে মোড় নেওয়ার ১-২ শতাংশ সম্ভাবনাও অনেক বড় ক্ষতির মুখে ফেলে দিতে পারে সরকারকে।

তবে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন দলের এমন একজন নেতা নাম প্রকাশ না করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি অংশও হতে পারে। তার দাবি, কারও কোনো চাওয়া পূরণের ব্যাপারও থাকতে পারে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, আওয়ামী লীগের ভেতরে ধারণা ছিল জামায়াত সত্যিই আলাদা হয়ে গেছে বিএনপি থেকে। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ক্ষমতাসীনদের সেই ধারণা ভুল প্রমাণ হয়েছে। এ আন্দোলনে বিএনপির পলাতক নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে জামায়াত-শিবির এ প্রমাণও সরকারের হাতে রয়েছে। এ ছাড়া গত কয়েক বছরে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ধারণা সৃষ্টি করেছে, জামায়াতকে সরকার চাপমুক্ত রেখেছে এটি ভুল প্রমাণ করতেও ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে জামায়াত নিষিদ্ধের।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো বলেন, পরিস্থিতি কী হবে না হবে সেটি নিয়ে এখন আর ভাবছে না সরকার। ঘোষণা যেহেতু হয়ে গেছে, কাক্সিক্ষত-অনাকাক্সিক্ষত যেকোনো পরিস্থিতি শক্ত হাতে দমন করা যাবে। ইস্যুটি নিয়ে গতকাল দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমে বলেন, জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, মুক্তিযোদ্ধা ও নাগরিক সমাজ দাবি করে আসছে। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির গঠিত গণআদালত ও পরবর্তীকালে গণজাগরণ মঞ্চের দাবিও ছিল জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ।

তিনি বলেন, দলটি ধর্মের মুখোশ পরা সাম্প্রদায়িক অপশক্তি। নানান সময়ে তাদের ধারা প্রকাশ্য ও গোপনে নানা অপতৎপরতা ও নাশকতা, ষড়যন্ত্র, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেশের জনগণও সেটা অবহিত। এ ইস্যুতে দলের সাধারণ সম্পাদক যে বার্তা গণমাধ্যমের বদৌলতে জানিয়েছেন, রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ এ অবস্থানেই থাকবে। গণদাবি-জনদাবি হয়ে উঠেছে বলেই সরকার নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

দলের দুই সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য প্রায় অভিন্ন সুরে বলেন, জামায়াত নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত বিদ্যমান পরিস্থিতি ঘোরানোর একটি কৌশলও হতে পারে। তবে সরকার সেটিও উপযুক্ত সময়ে নেওয়া হলো কি না, এ প্রশ্ন থেকে যায়।

এ সময়ে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তে কেন, এ প্রশ্নে দলের অন্য একজন সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে এত মাজেজা খুঁজতে না যাওয়াই ভালো। যেভাবে চলছে, সেভাবে চলতে দিন।’

এ সিদ্ধান্ত কতটা সঠিক এই সময়ে এ প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সঠিক সময়ে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার।’ পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবিলা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবিলা করার শক্তি সামর্থ্য জনগণ এবং সরকারের আছে বলেই নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।’

এদিকে জামায়াতের অতীত ও বর্তমান কর্মকা-, বিভিন্ন সময় দেওয়া আদালতের রায় বিবেচনা করে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষের ১৪ দল সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে গত সোমবার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত