সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঘিরে বিক্ষোভ, টানা কয়েকদিনের সহিংসতা, বহু হতাহত, ইন্টারনেট বন্ধ এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ শেষে কারফিউ জারি সব মিলিয়ে দেশে এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভর করেছে অজানা এক আতঙ্ক। এই বিক্ষোভ-সহিংসতা ও বহু প্রাণহানির পর অস্থিতিশীল পরিবেশে দেশের মানুষ যেমন উদ্বিগ্ন, তেমনি ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকেও বিচলিত করেছে। এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন ক্ষমতাসীন দলেরও বহু কর্মী-সমর্থক। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা এবং বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের বড় একটি অংশ যারা আগে আওয়ামী লীগের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন তাদের মধ্যেও অনেকে এখন কড়া সমালোচনা করছেন দলটির। একটানা ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকাকালে কখনো এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি আওয়ামী লীগকে।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের ভাষা অনুধাবন করতে পারেনি সরকার। তাই সংকট আরও গভীর হয়েছে। এই বিক্ষোভ সামলাতে যথাযথ ব্যবস্থা না নিতে পারার ভেতর দিয়ে বোঝা যাচ্ছে যে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক অবস্থা অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
কোটাব্যবস্থা নিয়ে হাইকোর্টের এক রায়কে কেন্দ্র করে গত জুন থেকে দ্বিতীয় দফায় সরব হয় কোটা সংস্কারের পক্ষে থাকা আন্দোলনকারীরা। চলতি মাসের শুরু থেকে নানা ধরনের কর্মসূচি দিতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। পরিস্থিতি যখন উত্তাল হতে শুরু করে তার মধ্যেই গত ১০ জুলাই সরকারি চাকরিতে সরাসরি নিয়োগে (৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড) কোটার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে চার সপ্তাহের জন্য স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে নির্দেশ দেয় আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের
নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের আপিল বিভাগ এ আদেশ দেয়। পরবর্তী শুনানির জন্য ৭ আগস্ট দিন রাখা হয়। তবে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, এটি সরকারের নীতিনির্ধারণী বিষয়। সংসদের জরুরি অধিবেশন ডেকে আইন পাস করে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবি জানান তারা। এরপর থেকে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন তারা।
এরপর ১৪ জুলাই চীন সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর এক মন্তব্যের পর ওই দিন মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। এ সময় তারা ‘তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার। চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেয়। পরদিন সারা দেশে দিনভর বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ হয়। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ সরকার সমর্থকরা। এর পরদিন হামলার প্রতিবাদে সারা দেশে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। ওইদিন নিহত হন ৬ জন। এরপর সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। দেশ জুড়ে কমপ্লিট শাটডাউন ঘোষণা করা হয় আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত অন্তত দেড়শ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ। এছাড়া বিক্ষোভ চলাকালে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে পুঁজি করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল-শিবির নেতাকর্মীরা এসব নাশকতার ঘটনা ঘটিয়েছে। যাতে সংশ্লিষ্টতা ছিল জঙ্গিদেরও।
সরকারপক্ষের জোটভুক্ত দলের শীর্ষ নেতারা, বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের একটা অংশ মনে করেন, সরকারের ভুল পদক্ষেপের কারণেই দেশে আজ অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সরকার চাইলে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি আগেই সমাধান করতে পারত।
সার্বিক বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্রদের আন্দোলনের বিষয়ে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ ঠিক ছিল না। সরকারের ভুল কৌশলের কারণেই আজ এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সরকারের প্রতি আস্থা রাখতে পারেনি। তাই তারা আন্দোলনের পথকেই বেছে নিয়েছেন। আন্দোলনকে কেন্দ্র করে যা হয়েছে এটাকে আমরা কোনোভাবেই সমর্থন করি না। আমি মনে করি ছাত্র ও শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের হত্যা, আহত এবং নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করা প্রয়োজন। আন্দোলনকারীদের নামে এখন যেভাবে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তারও আমরা নিন্দা জানাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক আন্দোলনকারীদের মধ্যে কয়েকজনকে ডেকে নিয়ে একটা বার্তা দেওয়া হয়েছে, এটা গ্রহণযোগ্য না। কারণ এটি এখন একটি জাতীয় ইস্যু হয়ে গেছে। সরকারের উচিত সবার সঙ্গে বসে কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করা। আলোচনা ছাড়া কোনো সমাধান হবে না।’
আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংসের বিষয়টিও মেনে নেওয়া যায় না উল্লেখ করে এই মানবাধিকারকর্মী বলেন, ‘আমরা এটারও সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি। বলা হচ্ছে অমুকে করেছে, তমুকে করেছে, সেটারও একটা তদন্ত হওয়া উচিত এবং এর শ্বেতপত্র সবার সামনে প্রকাশ করা উচিত।’
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিক ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার অতি আত্মবিশ্বাসী ছিল যে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু সেটা তো থাকেনি। শেষ পর্যন্ত এতগুলো মানুষের প্রাণ গেল। শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরুতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সঠিক ছিল না, যার সুযোগ নিয়েছে জামায়াত-শিবিরের মতো অপশক্তি। সংকট নিরসনে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।’
একই ধরনের মন্তব্য করেন সরকারি দলের আরেক শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া। তিনি বলেন, ‘সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে, তদন্ত চলছে। তারপর বোঝা যাবে কী হয়েছিল। দেশে কী ঘটছে বা ঘটবে, এসব বিষয়ে সরকার গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে রিপোর্ট নিয়ে থাকে। সে অনুযায়ী সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়। আমি মনে করি তারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেনি। তাহলে আজ জামাত-শিবির সুযোগ নিয়ে অরাজকতা তৈরি করতে পারত না।’
দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজ। তিনি গত সোমবার রাতে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে থাকা কোটা সংস্কার আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে দেখতে গিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা গণমাধ্যমকে বলেন।
সোহেল তাজ বলেন, ‘আমরা জানি আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম এমন একটি বাংলাদেশের জন্য যেখানে ন্যায়বিচার থাকবে, যেখানে মেধা দিয়েই যোগ্যতা যাচাই হবে। সেই সোনার বাংলাদেশে গরিব-ধনী সবার জন্য মৌলিক অধিকার থাকবে, বাকস্বাধীনতা থাকবে, চিন্তার স্বাধীনতা থাকবে। আজ আমি মনে করছি আমাদের সবারই এই অধিকারগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে।’
কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে দেশে অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, ‘এখানে শত শত মানুষ নিহত হয়েছে। নিরীহ ৫ বছরের বাচ্চা থেকে শুরু করে ৮, ১০, ১৫ বা ১৬ বছরের বাচ্চা, ছাত্র, সাধারণ মানুষসহ অনেক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। এটা আমাদের সবার মধ্যে ক্ষত তৈরি করেছে। আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে।’
ছাত্র আন্দোলনে প্রাণহানির তুলনায় সম্পদহানি ‘কিছুই না’ মন্তব্য করে সোহেল তাজ বলেন, ‘সম্পদের এই যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা তো জনগণের ট্যাক্সের টাকায় করা হয়েছে। এগুলো জনগণের সম্পদ। এগুলো হয়তো ভবিষ্যতে আমরাই আবার গড়ে নেব। কিন্তু যারা প্রাণ হারিয়েছে তাদের একটি প্রাণও কি ফেরত পাব? এই প্রাণ কি ফিরে আসবে? আমাদের মনে রাখতে হবে মুখ্য জিনিসটা কী। প্রাণের মূল্য কিন্তু কোটি কোটি টাকার থেকেও অনেক বেশি, এটা অমূল্য।’
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতি সরকারের ভুল পদক্ষেপে হয়েছে কি না জানতে চাইলে এই সাবেক প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে একটা সমূহ সমাধান প্রয়োজন। তার জন্য প্রথম যে কাজটা করতে হবে প্রতিটি হত্যাকাণ্ড সুনির্দিষ্টভাবে তদন্ত করে বিচার করতে হবে এবং এগুলোর জন্য যারা দায়ী তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।’
