মাঠে নাগরিক সমাজ শিল্পী আটকদের মুক্তি দাবি

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৪, ০৫:৪৮ এএম

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে ঢাকাসহ সারা দেশে আটক সব শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিকদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। পাশাপাশি জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে প্রাণহানি ও সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের বিচারেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ের সামনে ‘বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজের’ ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধন থেকে এসব দাবি জানানো হয়।

এদিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে সমাবেশ করেছেন পরিচালক, অভিনয়শিল্পী ও নানা মাধ্যমের কলাকুশলীরা। গতকাল সকালে ফার্মগেট এলাকায় ‘দৃশ্যমাধ্যম শিল্পীসমাজ’র ব্যানারে এ সমাবেশ করেন তারা। বৃষ্টি উপেক্ষা করেই হাতে ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে এতে যোগ দেন শিল্পী ও তারকারা।

ডিএমপির গোয়েন্দা কার্যালয়ের সামনের মানববন্ধনে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘জবাবদিহিবিহীন ক্ষমতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নামে যে সংস্থাগুলো কাজ করছে, এমনই একটি প্রতিষ্ঠানের (ডিবি) সামনে দাঁড়িয়ে আমরা আজ কথা বলছি। সেই সংস্থাসহ তারা স্বাধীন দেশে বাস করে ছাত্রসমাজ ও জনতার শক্তি এবং তাদের মত, অজেয় শক্তির বিরুদ্ধে গিয়ে দমন-নিপীড়ন চালিয়েছে। এমনকি এসব প্রতিষ্ঠান মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছে, প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিটি ফোর্সই প্রতিটি বিষয়ে জনগণকে মূর্খ মনে করেছে। এর মধ্য দিয়ে প্রতিটি কথায় যে নিজেদের মূর্খের পরিচয় দিয়েছে, সেটা তারা ভুলে গেছে। মূর্খতা ও মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে যে কাজগুলো করে সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। আইনের লঙ্ঘন করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পেশাগত উৎকর্ষতার কথা তারা (সরকার) বলে থাকেন। পেশাগত প্রশিক্ষণের বাইরে গিয়ে তারা আমাদের প্রতারিত করার চেষ্টা করেছেন। তাদের মানদ-ে দেশবাসীকে বিচার করার কোনো সুযোগ নেই।’

অর্থনীতিবিদ ও জননীতি বিশ্লেষক সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশে আটক ছাত্র-শিক্ষক, সাধারণ মানুষ বিনা বিচারে আটক ও আইনানুগ ব্যবস্থা ছাড়া আটকদের অনতিবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। এটা হচ্ছে আমাদের প্রধান দাবি। আমরা শুনেছি কোটা সংস্কার আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এতে আমরা খুশি, কিন্তু সন্তুষ্ট নই। কারণ এখনো ঢাকাসহ সারা দেশে আটক ছাত্র-শিক্ষক, সাধারণ মানুষ বিনা বিচারে আটক আছে। এ ছাড়া এই আন্দোলনে এ পর্যন্ত যেভাবে দেশের নিরপরাধ মানুষ মারা গেছেন, তাদের সবার বিচার করতে হবে। এ বিচারের জন্য জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করতে হবে। স্কুল-কলেজ খুলে দিতে হবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সেখান থেকে সরিয়ে দিতে হবে। দেশে ইন্টারনেটের অবাধ সুস্থ ব্যবস্থা করতে হবে। দেশে আইন সুরক্ষার পরিবেশ দ্রুত সৃষ্টি করতে হবে।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘ডিবির কাছে থাকলে নাকি নিরাপত্তাবোধ করে। আসলে আমাদের নিরাপত্তার সংজ্ঞাটা দেবেন? আমরা সংবিধানে তুলে দেব! শিক্ষার্থীদের হেফাজতে রাখার আইনি সংজ্ঞাটা কী? শিক্ষার্থীদের আটকে রাখার ক্ষমতা কোথায় দেওয়া হয়েছে? সংবিধানের কোন আইনে আটকে রাখার কথা হয়েছে?’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের যখন ইচ্ছা তুলে আনবেন, যতদিন ইচ্ছা আটকে রাখবেন, নুডলস খাওয়াবেন, পোলাও, রুটি খাইয়ে আবার পত্র-পত্রিকায় দেবেন। এগুলো কাদের টাকায় খাওয়ান? আমরা জনগণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনোদিন মুখোমুখি হতে চাই না। আমাদের নিরাপত্তার প্রয়োজন হলে আমরা আপনাদের কাছে যাব। গায়েবিভাবে আমাদের বাসা থেকে তুলে আনবেন, সেই আইন-ক্ষমতা আপনাদের দেওয়া হয়নি। আমরা চাই সেরকম আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যারা আমাদের কথা শুনবে। আপনারা বাংলাদেশ পুলিশ হবেন। আওয়ামী লীগ পুলিশ, বিএনপি পুলিশ, জাতীয় পার্টি পুলিশ হবেন না। এটাই আমরা চাই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, ‘আমরা কোটা সংস্কার আন্দোলনের ছয় সমন্বয়কের মুক্তির জন্য এখানে এসে শুনলাম তাদের নাকি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি না তারা আসলে নিরাপদে আছে কি না। সারা দেশে অজস্র কারাগার গড়ে তোলা হয়েছে শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনতা আটকের মাধ্যমে। জুলাইয়ে হত্যাকা-ে যারা প্রাণ হারিয়েছে, সেই আন্দোলনের হাজার হাজার ছেলেমেয়েকে ব্লক রেইড দিয়ে দিয়ে কারাগারগুলো ভরে ফেলা হয়েছে। এ অবস্থা আজকেই থামাতে হবে। কারফিউ তুলে নিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তুলে নেবেন। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে হবে। মানুষের মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে, তা আটকে রাখার অধিকার আপনাদের কারও নেই।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমাদের সব শিক্ষার্থীকে যদি ছেড়ে দেওয়া না হয়, যদি হত্যার বিচার করা না হয়, যদি অবিলম্বে শিক্ষাঙ্গন খুলে দেওয়া না হয়, তাহলে আমাদের বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আরও কঠোর ও অব্যাহত কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মির্জা তাসলিমা সুলতানা বলেন, ‘আমাদের অনেক শিক্ষার্থী কারাগারে। আটকে রাখা সব শিক্ষার্থীকে মুক্তি দিতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুশাদ ফরিদী বলেন, ‘আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। আগামীকাল (আজ) জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বেলা ৩টায় দ্রোহযাত্রা নামে একটি সমাবেশ হবে। এ সমাবেশে ছাত্র-শিক্ষক, সুধীসমাজ অংশগ্রহণ করবেন। এতগুলো হত্যার বিচার চাই।’

এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, প্রয়াত ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর স্ত্রী শিরীন হক, বাংলাদেশের বেসরকারি সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম ইন বাংলাদেশের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. গীতি আরা নাসরীন, বেসরকারি সংস্থা উবিনীগর (উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা) নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফ নূর, সদস্য রুমি প্রভাসহ আরও শিক্ষক-শিক্ষার্থী।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে শিল্পীদের সমাবেশ : কোটা সংস্কার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে গতকাল সকালে ফার্মগেট এলাকায় সমাবেশ করেছেন পরিচালক, অভিনয়শিল্পী ও নানা মাধ্যমের কলাকুশলীরা। দৃশ্যমাধ্যম শিল্পীসমাজ ব্যানারে আয়োজিত সমাবেশে তারা হত্যাকা-ের নিন্দা, বিচার দাবি, গণগ্রেপ্তার বন্ধ করা, সরকারের সমালোচনা ও পদত্যাগ দাবি করে বিভিন্ন সেøাগান দেন। বৃষ্টিতে ভিজে শিল্পীরা আনন্দ সিনেমা হলের সামনের পশ্চিম পাশের সড়কের দুই পাশে ব্যানার-পোস্টার নিয়ে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে সেøাগান দেন।

‘কোটা সংস্কার আন্দোলনে সরকারের কঠোর দমনপ্রক্রিয়া ও গুলিতে ছাত্র-জনতা হত্যার’ প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশে অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে বক্তব্য দেন মোশাররফ করিম। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে যে অবস্থা বর্তমানে সৃষ্টি হয়েছে, তাতে আমরা ঘরে বসে থাকার মতো অবস্থায় নেই। আমরা শান্তি চাই। রক্ত দেখতে চাই না। গোলাগুলি, রক্ত দেখতে চাই না। আমি ও আমরা সাধারণ মানুষ। আমরা শান্তি চাই।’

অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন বলেন, ‘নাগরিক হিসেবে আমাদের সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় সেটি কি করেছেন? চেষ্টা করছেন? আমরা ভালো দিন দেখতে চাই। যেদিন থেকে গুলি চলেছে, সেদিন থেকেই আমরা মানসিকভাবে ভালো নেই। আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্ম। যারা মারা গেছে, তাদের হত্যার বিচার চাই।’

শিল্পী, নির্মাতা ও কলাকুশলী ছাড়াও অনেক সাধারণ মানুষও এ সমাবেশে অংশ নেন। চারপাশে অনেক পুলিশ সদস্যও ছিলেন।

সমাবেশে অভিনেত্রী নাজিয়া হক অর্ষা বলেন, ‘এতগুলো মেধাকে এভাবে মৃত্যুর জায়গায় পৌঁছে যাওয়া, এত রক্ত, এত ক্ষত, এটা আমি সাধারণ নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে পারি না।’

পরিচালক অমিতাভ রেজা চৌধুরী বলেন, ‘এই রাজনীতি, ভয়ের রাজনীতি, এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে রাজনীতি, যেভাবে গুলি করা হচ্ছে, এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রয়োজন ছিল আরও আগে। বড্ড দেরি হয়ে গেছে।’

বক্তাদের মধ্যে ছিলেন মামুনুর রশীদ, আকরাম খান, পিপলু আর খান, ঋতু সাত্তার, আমরিন মুসা, আশফাক নিপুণ, সুকর্ণ শাহেদসহ অনেকে। বৃষ্টির কারণে সবাই বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করেছেন।

সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন নির্মাতা নূরুল আলম আতিক, মাতিয়া বানু শুকু, রেদওয়ান রনি, তানিম নূর, নুহাশ হুমায়ূন, সৈয়দ আহমেদ শাওকী, আদনান আল রাজীব, শঙ্খ দাশ গুপ্ত, অভিনয়শিল্পী ইরেশ যাকের, সিয়াম আহমেদ, জাকিয়া বারী মম, সুকর্ণ শাহেদ, মোস্তফা মন্ওয়ার, দিপু ইমাম, সাবিলা নূর, প্রবর রিপন, শ্যামল মাওলা, রাফিয়াথ রশিদ মিথিলা প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত