জামায়াত এখন কী করবে? 

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৪, ০৯:০৯ এএম

জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করেছে সরকার। আইনি প্রক্রিয়া শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীনতার বিরোধীকারী জামায়াত ও এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলো।

এ ঘোষণা কার্যকরী হওয়ায় জামায়াত এখন কোন পথে হাঁটতে পারে সে বিষয়ে রাজনৈতিক মহলসহ বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা-পর্যালোচনা। দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যেও রয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া, জিজ্ঞাসা।

জামায়াতের ঘনিষ্ঠ এবং বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে আছে এমন দুটি দলের শীর্ষ নেতারা বলেছেন, জামায়াতের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা এ ব্যাপারে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দিকনির্দেশনা চাইছেন। নিষিদ্ধ হওয়ায় জামায়াতের অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। যদিও তাৎক্ষণিক বিবৃতিতে বলেছে, সরকার নিষিদ্ধ করলেই জামায়াতে ইসলামীর মূল কাজ বন্ধ হয়ে যাবে না।

জামায়াত নিষিদ্ধ হওয়ায় দেশের রাজনৈতিক পরিসরে কী প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে মোটা দাগে তিনটি বিষয় উপস্থাপন করেছেন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অস্তিত্ব রক্ষার্থে জামায়াত তাদের হালচাল পরিবর্তন করে নতুনভাবে মাঠে নামার চেষ্টা করতে পারে অথবা আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা ইসলামপন্থি সমমনা রাজনৈতিক দলে লীন হয়ে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে চাইতে পারে কিংবা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে পারে।

জামায়াত আন্ডারগ্রাউন্ডে যেতে চাইবে না বলে মনে করছেন একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক। তাদের মতে, জামায়াতে ইসলামী যদি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়, তাহলে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে, তা গত এক দশকে দেখা গেছে। দ্বিতীয় দফায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মূলত আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকেই দলটি পরিচালিত হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে মোটাদাগে ব্যর্থ জামায়াত সুযোগ খুঁজে মাঠে নেমেছে। সহিংস কর্মকাণ্ডেও জড়াতে দেখা গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার আলোচনা অনেক দিন ধরেই চলছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কেন্দ্র করে দেশ একটা সংকট-মুহূর্ত পার করছে। সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মনোযোগ না দিয়ে জামায়াতকে নিষিদ্ধের মতো ইস্যু হঠাৎ কেন সামনে নিয়ে এলো তা বোধগম্য নয়। জামায়াত একটা শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। নিষিদ্ধ হলেও তারা নিজেদের জায়গাটা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের এক ধরনের অ্যালায়েন্স আছেই। সেটাকে তারা কাজে লাগাতে পারে। তাদের যে উইং আছে সেগুলো কাজে লাগিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। যেমনটা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ক্ষেত্রে হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জামায়াতকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা কঠিন। কারণ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বাম-ডান, আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত সব দলের মানুষ আছে।’

জানা গেছে, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে না পারলেও জামায়াত নিজেদের মতো করে সংগঠিত হয়েছে, বিকল্প পথ তৈরি করে রেখেছে। যেমন জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক বা কর্মীদের কেউ কেউ ইতিপূর্বে কিছু দলে যোগ দিয়েছে। নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা হয়তো অন্য দলে ব্যাপকভাবে যোগ দেবে। ভিন্ন নামেও সংগঠন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারে এবং নতুন করে পুরনো খোলসে রাজনীতির মাঠে থাকার চেষ্টা করতে পারে। এ সম্ভাবনাটাই বেশি বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

তাদের মতে, এবি পার্টি নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠন জামায়াত-ত্যাগীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে। তাদের রাজনৈতিক আদর্শও জামায়াতের মতোই। প্রকাশ্যে তারা মুক্তিযুদ্ধের কথাও বলছে। দলটি হয়তো জামায়াতকর্মীদের ছাতা হয়ে দাঁড়াবে অথবা এমন আরেকটি দল তৈরি হয়ে জামায়াতেরই এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে। যেমন গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধনের জন্য বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা বিডিপি নামের নতুন দলটি তাদের ১৫ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটির নাম জমা দিয়েছিল। ওই কমিটির বেশিরভাগ নেতাই জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বিডিপির সেক্রেটারি জেনারেল করা হয়েছিল নিজামুল হককে। তিনি ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। ছাত্র সংগঠনটির ভেতরের সমস্যার কারণে তিনি ওই পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।

সমাজ ও অপরাধবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘জামায়াত সাম্প্রদায়িক কর্মকা-ের কারণে নিষিদ্ধের কবলে পড়েছিল। খুব সরলভাবে বললে, কাউকে নিষিদ্ধ করলে বা তাদের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে বাধা সৃষ্টি করলে, তারা বিকল্প পথ বেছে নেয়। মনে রাখতে হবে, জামায়াত তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এ দেশের রাজনীতিতে অবস্থানটা আরও পোক্ত করতে চায়। তাই বলে নিষিদ্ধ করলেই তারা যে ডার্ক উইন্ডোর (সহিংসতা) দিকে চলে যাবে, এটা বলা যায় না। তারা খুব অগতান্ত্রিক আচরণ করবে সেটাও বলা যায় না। তবে তারা রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে।’

গত ২৯ জুলাই গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে ১৪-দলীয় জোটের সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে জামায়াতকে নিষিদ্ধের কথা বলা হয়।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন যুগপৎ আন্দোলনে জামায়াতের ঘনিষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিষিদ্ধ হওয়ায় তাদের ওপর বড় প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন না জামায়াত নেতারা। ‘কৌশলে’ রাজনীতিতে টিকে থাকার একটা পথ তারা বের করবেন। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সাল থেকেই জামায়াতকে চাপে রেখেছিল। এক-এগারোর পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জামায়াত ২০১৩ সালের ১০ জুন প্রথম রাজধানীতে প্রকাশ্যে সমাবেশ করেছিল। ২০১৩ সালের ১ আগস্ট জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে হাইকোর্ট। এরপর গত ১০ জুন ২০২৩ এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২৮ অক্টোবর জামায়াত রাজধানীতে সমাবেশ করতে পেরেছিল।

গ্রেপ্তারি কার্যক্রম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের কারণে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় বন্ধ বছরের পর বছর। বড় ধরনের নাশকতার ঘটনায় প্রথমেই জামায়াতের নাম আসে। অনেকটাই নিষিদ্ধ দলটির কর্মকা- চালিয়েছেন নেতারা। এ অবকাশে ব্যাপক সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়েছে দলটি। তাই নিষিদ্ধ হলেও প্রভাব নেতাকর্মীদের ওপর প্রভাব পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে না। তবে রাষ্ট্রশক্তির সঙ্গে সংঘাতে না গিয়ে ‘কৌশল’ হাঁটবে বলে জানা গেছে।

জামায়াত-ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র বলছে, নতুন দল হলেও নিজেদের বিলুপ্ত করবে না জামায়াত। যেভাবে দলটি ছিল সেভাবেই তারা রাখতে চায়। পাশাপাশি তারা নতুন দলে কাজ শুরু করবে। নতুন দলে জামায়াতেরই কর্তৃত্ব ও প্রভাব থাকবে। একাধিক সূত্র বলছে, এ প্রক্রিয়া তারা জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পরই একটি কমিটি করে শুরু করেছিল।

জামায়াতে ইসলামীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো কোরআন অনুযায়ী ইসলামি শাসনতন্ত্র কায়েম করা। ২০১২ সালের অক্টোবরে সংশোধিত গঠনতন্ত্রে দলটি ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে।

অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘জামায়াত বসে নেই। তারা তাদের রাজনৈতিক বিকল্প প্ল্যাটফর্ম তৈরি, জনসমর্থন ও সংগঠনের বিস্তার ঘটানোর কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা জামায়াতে ইসলামী নামে রাজনীতি করতে না পারলে ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাদের মতাদর্শের সঙ্গে সাজুয্যপূর্ণ রাজনৈতিক দল তৈরি করবে।’

অভ্যন্তরীণ নানা রাজনৈতিক কাঠামোতে জামায়াতের অনুপ্রবেশ তথা লীন হওয়ার সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি পাশ্চাত্য শক্তিবলয় বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের এবং মধ্যপ্রাচ্যের কোনো রাষ্ট্রের আনুকূল্যও তাদের প্রতি রয়েছে। ফলে বৈদেশিক প্রভাবের ছায়াতলেও তাদের থাকার সুযোগ রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা মনে করেন।

জামায়াতে ইসলামীর সূচনা হয় উপমহাদেশের বিতর্কিত ধর্মীয় রাজনীতিক আবুল আলা মওদুদীর নেতৃত্বে ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় উসকানির অভিযোগে পাকিস্তানে প্রথমবারের মতো ১৯৫৯ সালে জামায়াত নিষিদ্ধ হয়। মুসলিম পারিবারিক আইনের বিরোধিতার কারণে ১৯৬৪ সালের ৪ জানুয়ারি আবারও নিষিদ্ধ হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করতে রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামে বিভিন্ন দল গঠন করে জামায়াত ও এর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়েছিল।

১৯৭৬ সালে সংবিধানের ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে প্রথমে ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ হিসেবে আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী আবার কর্মকাণ্ড শুরু করে। ১৯৭৯ সাল থেকে নিজেদের নামেই কর্মতৎপরতা চালাচ্ছিল দলটি।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৩৮ অনুচ্ছেদ ফিরিয়ে আনে। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা এবং মন্ত্রীরা অসংখ্যবার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেটি কার্যকর হয়নি।

নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের মুজিবুল আলম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেই জামায়াতে ইসলামীর মূল কাজ বন্ধ থাকবে না। আমি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সব স্তরের জনশক্তিকে ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

অন্যদিকে ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে সংগঠনটির এক যৌথ বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল জাহিদুল ইসলাম বলেন, ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বেআইনি ও সংবিধান পরিপন্থী।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত