আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শেখ হাসিনা নিরাপদে দেশ ছাড়লেও বিপদে পড়েছেন তার দলের নেতাকর্মীরা। দলের নেতাকর্মীরা বলছেন দলীয় সভাপতির ওপর তাদের যে আস্থা ও বিশ্বাস ছিল তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। তিনি পরিবার নিয়ে নিরাপদে দেশ ছেড়ে গেলেও বিপদে ফেলে গেছেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মীদের।
নেতাকর্মীরা বলছেন, নিজে বাঁচলেও পুরো দলকেই ঝুঁকিতে ফেলে গেছেন সভাপতি শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। যদি ক্ষমতা ছেড়েই দেওয়া হবে তবে কেন শেষ মুহূর্তে দলের নেতাকর্মীদের আন্দোলন রুখে দিতে মাঠে নামানো হলো এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে।
গতকাল সোমবার শেখ হাসিনার দেশ ছাড়ার খবর যখন গণমাধ্যমে প্রচার হয় তখনও কিছুই আঁচ করতে পারেননি আওয়ামী লীগের ৫ বারের এক সংসদ সদস্য। ন্যাম ভবন ছেড়ে তিনি যখন পালিয়ে যান তখন ঘড়িতে ৩টা পেরিয়ে গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই সংসদ সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, সোমবার সকালে ঘুম থেকে উঠে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। দলের হাইকমান্ড থেকে কোনো নির্দেশনা আসেনি, ফলে নিশ্চিন্তে ছিলাম। সকালে বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর পাচ্ছিলাম আন্দোলনকারীরা জমায়েত হতে পারেনি। বেলা ১২টার দিকে এক স্বজন জানান শাহবাগে অবস্থান নিয়েছে পরিস্থিতি ভালো না। এরপর থেকে নানা উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় সময় কাটতে লাগে। এক পর্যায়ে যখন গণমাধ্যমে দেখলাম পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন ঢাকার রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ। বাসা থেকে বের হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাব সেই সময়টুকু পাইনি। মুহূর্তেই মানুষের বিক্ষোভ মিছিল সংসদ ভাবন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে একটি গেট দিয়ে বের হয়ে জনতার স্রোতে মিশে যাই। বেঁচে ফিরব ভাবতে পারিনি, খুব একটা পরিচিতি ছিল না বলেই মানুষ চিনতে পারেনি। এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছি, কতটা নিরাপদে আছি জানি না।
তিনি বলেন, সোমবারই এলাকার বাসায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে, আওয়ামী লীগ অফিস পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। অনেক নেতাকর্মীর বাসায় আগুন দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থান দিয়ে দেশ ছাড়তে গিয়ে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আটক হচ্ছেন। বিমানবন্দর পর্যন্ত নিরাপদ নয় আমাদের আটক করা হচ্ছে। সারা জীবন দলের জন্য কাজ করে আজ দলীয় সভাপতি সেক্রেটারি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন আর লাখ লাখ নেতাকর্মীকে জীবনের ঝুঁকিতে ফেলে রেখে গেছেন এটা ভাবতে পারিনি।
আওয়ামী লীগের ২ জন সদ্য সাবেক মন্ত্রী, ২ সিটি মেয়র ও কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের। তারা জানান, রবিবার আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে আন্দোলন প্রতিরোধে মাঠে নামানো হয়, সোমবার মধ্যরাত থেকে দেশের প্রতিটি জায়গায় অবস্থান নিতে বলা হয় আমরা সেভাবেই প্রস্তুতি নেই। আমাদের মানুষের মুখোমুখি করে দিয়ে দলীয় প্রধান দেশ ছাড়বেন এটা ভাবতে পারিনি। তাছাড়া দেশের যে অবস্থা ছিল তাতেও সরকার প্রধান পদত্যাগ করবেন এমন কোনো আভাস পাইনি। ৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর হাজার হাজার আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল, জেলে বন্দি করা হয়েছিল বিষয়টি শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদের জানতেন। এমনকি ২০০১ সালে বিএনপি ও জোট সরকার ক্ষমতায় এসেও দেশে তাণ্ডব চালিয়েছিল। অথচ তারা দিব্যি সেসব ভুলে গিয়ে পুরো দলকে জিম্মি করে রেখে গেলেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সদ্য সাবেক মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারের পদত্যাগ করার বিষয়টি যে একদম আলোচনা হয়নি, বিষয়টি এমন নয়। রবিবার মধ্যরাতেও দলের মিটিং হয়। সেখানে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা উঠলে শেখ হাসিনা রাজি হননি, তিনি পুরো পরিস্থিতি কন্ট্রোলে আছে বলে সবাইকে ধমক দেন, তার কথায় আমরাও সমর্থন জানাই। রাতে ১৪ দলের আরেকটি মিটিং হয় সেখানেও পদত্যাগ না করে রাজপথে মোকাবিলার সিদ্ধান্ত হয়। অথচ দিনে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেলেন দলীয় সভাপতি।
ঢাকায় এক আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ভাবছিলাম দেশ ছেড়ে চলে যাব। কিন্তু গণমাধ্যমে দেখলাম হাছান মাহমুদ ও জুনাইদ আহমেদ পলক হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক হয়েছেন। এখন আর বিমানবন্দরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না। অন্যদিকে সীমান্ত দিয়ে যাব সেই সুযোগ নেই। এখন যে অবস্থা তাতে হয় মাইর খেয়ে রাস্তায় মরতে হবে অথবা আটক হতে হবে। দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র চলছে, জীবন নিরাপদ নয়। যেকোনো মুহূর্তে ধরা পড়তে পারি এই শঙ্কায় সময় পার করছি।
এদিকে আজ মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিনকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাদের আটক করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের দেশ ছেড়ে যেতে দেওয়া হবে না।
ঢাকার একটি বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন ছাত্রলীগের এক সহসভাপতি। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এমন অনেকবার শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের বলতে শুনেছিলাম শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর মেয়ে, তিনি দেশ ছেড়ে পালাবেন না। অথচ এখন তার উল্টো হলো। তিনি যদি ক্ষমতা ছাড়বেন তাহলে আমাদের আগে নির্দেশনা দিতেন নিরাপদে চলে যেতাম। কিন্তু তা না করে কেবল বোনকে নিয়ে দেশ ছেড়ে আমাদের বিপদে ফেলে গেলেন। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের তো বিদেশে ভিসা নাই, তাহলে আমরা এখন কই যাব? রাস্তায় বের হলে আমাদের পিটিয়ে মারা হবে, আমাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যে দলের জন্য রাজপথে লড়াই করলাম সেই দলের জন্য এখন জীবন যাবে। রাজনীতি নিষ্ঠুর হয় জীবন এখন আল্লাহর হাতে।
