শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দলীয় পরিচয় ব্যবহার করা সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গা-ঢাকা দিয়েছেন। একইভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিরাও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অতিমাত্রায় দলীয়করণের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি ও শীর্ষস্থানীয় পদে আওয়ামীপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) নেতাকর্মীদের দখলে। তারা নানা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব পদে বসেছিলেন। অপরদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। সরকারের বিদায়ের ফলে এখন ড্যাবের চিকিৎসকরা এসব পদ দখলে নিতে মরিয়া হয়ে উঠছেন এবং তাদের হামলা ও অপমানের সম্মুখীন হতে ভয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছেন না স্বাচিপ নেতারা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক ইনস্টিটিউট ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান বা পঙ্গু হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, আগারগাঁওয়ের প্রবীণ হাসপাতালসহ আরও কয়েকটি হাসপাতালে গতকালও চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর উপস্থিতি কম ছিল।
কেবল রাজধানী ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিলেও এই হাসপাতালের আওয়ামী লীগপন্থিরা এখনো হাসপাতালে আসতে ভয় পাচ্ছেন। সরকার পরিবর্তনের পর থেকে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি অনেক কম।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল সকাল ১১টায় অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভা ডাকেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান ও অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. শফিকুল আলম চৌধুরী। সভায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর থেকে স্বাচিপ বা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যারা জড়িত আছেন তারা ভয় পাচ্ছেন। তারা বিগত সময়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়ায় অনেকেই ক্ষুব্ধ। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত কলেজের অধ্যক্ষ পর্যন্ত কার্যালয়ে আসেননি। চিকিৎসক নার্সদের উপস্থিতি কিছুটা বাড়লেও তা পর্যাপ্ত ছিল না।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের হাসপাতালে এখনো বড় কোনো সমস্যা হয়নি। চিকিৎসা কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। তবে চিকিৎসকসহ অন্যদের মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক ছিল। আমরা অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভা করেছি। সভায় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক থাকবে এবং কোনো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাবে না।
দেশের প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)। গতকালও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নুরুল হকসহ প্রশাসনের দায়িত্বশীল কাউকে দেখা যায়নি। প্রশাসনিক ভবনের চতুর্দিকেই সুনসান নীরবতা।
মঙ্গলবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় বিএনপি-সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) নেতাকর্মীরা সভা-সমাবেশ করছেন। তারা হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় ভাঙচুর চালিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ২০০ জন চিকিৎসকের নিয়োগ বিএনপির আমলে হওয়ার কারণে গত দেড় যুগে তাদের বেশিরভাগই পদোন্নতি পাননি। পদোন্নতি পাওয়ার সব ধরনের যোগ্যতা থাকলেও দলীয় পরিচয় তাদের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পদোন্নতির দাবিতে বিভিন্ন সময় এই চিকিৎসকরা আন্দোলন ও কর্মসূচি পালন করলেও তা আমলে নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তারা ২০০৩-০৪ সালে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দিয়ে এখনো একই পদে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে সরকারের পতনের পর থেকে তারা পদোন্নতির জন্য তোড়জোড় শুরু করেন। তারা ইতিমধ্যে পদোন্নতির জন্য নিজেরাই কাগজপত্র তৈরি করে রাখছেন। উপাচার্যসহ প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা হাসপাতালে এলে কাগজপত্রে দস্তখত নেওয়া হবে এমন আশঙ্কা কাজ করছে বিভিন্ন মহলে।
হাসপাতালে সেবা নিতে আসা একাধিক রোগীর সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের এই প্রতিবেদকের। তারা জানান, মঙ্গলবার থেকে চিকিৎসা প্রায় নেই বললেই চলে। বাইরে সভা-সমাবেশ-চেঁচামেচি চলছে। এতে রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে।
এ বিষয়ে জানতে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নুরুল হককে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় পঙ্গু হাসপাতালেও একই অবস্থা। গতকালও হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিতি অনেক কম ছিল। হাসপাতালের প্রতিটি শীর্ষ পদে স্বাচিপ নেতাদের দখলে। দীর্ঘদিন ধরে সরকার ক্ষমতায় থাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণে সবকিছু ফলে ড্যাব-সমর্থক চিকিৎসকরা বঞ্চিত। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে স্বাচিপ নেতারা হাসপাতালে আসছেন না। এতে রোগীরা কাক্সিক্ষত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। হাসপাতালের নিচতলায় ক্যাজুয়ালিটি ২ নম্বর ইউনিটে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন মাদারীপুরের ফিরোজ মিয়া। তিনি অভিযোগ করেন, বৃহস্পতিবার থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শনিবার আমার একটি অপারেশন করার কথা থাকলেও তা আর করা হয়নি। যে চিকিৎসক অপারেশনের কথা বলছিলেন তিনি আর হাসপাতালে আসেননি তাই আমার অপারেশন হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী শামীম উজজামানের কার্যালয়ে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইলে ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এদিকে দেশের স্বাস্থ খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও অজানা আতঙ্ক কাজ করছে। গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কার্যত জনবলশূন্য ছিল। মহাপরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালকসহ অধিদপ্তরের কর্তাব্যক্তিদের কার্যালয় ছিল তালাবদ্ধ। একাধিক কর্মকর্তাকে দেশ রূপান্তর থেকে ফোন দেওয়া হলেও তারা কথা বলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা একে অন্যকে ফোন দিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছি। হাসপাতাল জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান, এখানে অরাজকতা কাম্য নয়। নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে তারা বিষয়টিতে নজর দিক। কেউ যদি বঞ্চিত হয় কিংবা অন্য কেউ অনিয়ম করে তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ঢালাওভাবে একদল বের হয়ে যাবে আরেক দল ক্ষমতা দখল করবে এমনটা কাক্সিক্ষত নয়।
নতুন সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন নুরজাহান বেগম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমি দ্রুত সব বিষয়ে খোঁজ নেওয়া শুরু করব। রবিবার প্রথম কর্মদিবস। ইতিমধ্যে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করার। হাসপাতাল কিংবা স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা করার সুযোগ নেই। কোথাও যদি রোগীরা সেবাবঞ্চিত হন কিংবা চিকিৎসার পরিবেশে বিঘ্ন ঘটে আমরা ব্যবস্থা নেব।
