ক্যু বা পাল্টা ক্ষমতা দখল একসময় ঘন ঘন দেখা যেত। তবে এখন তা কমে এসেছে। তারপরও ‘ক্যু ভীতি’ পিছু ছাড়ে না। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
ক্যু বা পাল্টা অভ্যুত্থান হলো একটি ছোট গোষ্ঠীর দ্বারা বিদ্যমান সরকারকে আকস্মিক বা সহিংস উপায়ে উৎখাত করা। বিপ্লব বলতে সাধারণত বোঝানো হয় বেশিরভাগ মানুষের স্বার্থে, অংশগ্রহণে ক্ষমতা দখল। আর ক্যু বা প্রতিবিপ্লব অর্থ হলো, অল্প কিছু মানুষের স্বার্থে, তাদের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জনগণের সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল। তারা ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে বেশিরভাগ জনগণের স্বার্থরক্ষা করে না। আধুনিক ইতিহাসের প্রাচীনতম পাল্টা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রয়েছে ৯ নভেম্বর, ১৭৯৯ সালে (১৮ ব্রুমায়ার) নেপোলিয়ন ক্ষমতা দখল করেছিলেন। এ ছাড়া লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে ক্যু একটি নিয়মিত ঘটনা ছিল। ১৯ এবং ২০ শতকে এবং আফ্রিকার দেশগুলোতে ব্যাপক মাত্রায় ক্যু-এর ঘটনা ঘটে।
তবে একটি সংস্থা কয়েক বছর আগে করা তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ১৯৪৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশে^ একটিও ক্যুর ঘটনা ঘটেনি। তাদের হিসাবে, ২০ শতকে বিশ^ব্যাপী বার্ষিক ক্যু ঝুঁকি ছিল ৯৯ শতাংশ। ২০১৯ সালে তা ৮০ শতাংশে নেমে আসে। আর লাতিন আমেরিকায় ‘প্রায় বিলুপ্ত’ হয়ে গেছে গোপনে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা। অথচ এ অঞ্চল ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ক্যু-প্রবণ এলাকা।
কয়েকটি ক্যু
আধুনিক পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ক্যু হয় ১৭৯৯ সালের অক্টোবরে। মিসরে সামরিক অভিযান থেকে ফিরে আসার পর ফরাসি সামরিক নেতা নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ফ্রান্সের ক্ষমতায় বসা পাঁচ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদকে উৎখাতের পরিকল্পনা করেন। ওই পাঁচজন পরিচালকের দুজন এবং বেশ কয়েকজন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নেপোলিয়নের ষড়যন্ত্রে সমর্থন দেয়। নেপোলিয়ন ১০ নভেম্বর প্যারিসের বাইরে একটি বিশেষ আইনসভার অধিবেশনের ব্যবস্থা করেন। নেপোলিয়ন ঘুষ এবং ভয় দেখিয়ে ভেবেছিলেন আইনসভা তাকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। তবে এর পরিবর্তে তাকে গালাগাল দিয়ে স্লোগান ওঠে এবং তাড়া করা হয়। তবে নেপোলিয়ন যেভাবেই হোক সৈন্যদের নিজের পক্ষে আনতে সক্ষম হন। ধীরে ধীরে তিনি আইনসভায় যুক্ত হন, পরিচালকদের সেখান থেকে অপসারণ করেন। সবশেষে নেপোলিয়ন ১৮০৪ সালে সব ক্ষমতা একত্রিত করে নিজেই সম্রাট হয়ে ওঠেন।
এরপর আলোচিত ক্যু ঘটে ১৯৩৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। স্প্যানিশ নির্বাচনে বামপন্থিরা জয়লাভ করার পর জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কোকে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসনে পাঠানো হয়। যদিও তার সহমর্মী সেনা কর্মকর্তারা ক্যু ষড়যন্ত্র করছিল। তবে ফ্রাঙ্কো প্রথমে এতে যোগ দিতে দ্বিধা করেন। তবে পরে এক রক্ষণশীল রাজনীতিকের হত্যার ঘটনায় তিনি সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ওই বছরের ১৮ জুলাই ফ্রাঙ্কো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতে সামরিক বাহিনীকে অনুরোধ জানিয়ে একটি ইশতেহার প্রচার করেন।
স্পেন জুড়ে সেনা সদস্যরা তার আহ্বানে সাড়া দেন। ফ্রাঙ্কো এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে গোপনে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ থেকে স্প্যানিশ নিয়ন্ত্রিত মরক্কোয় চলে যান। সেখান থেকে ফ্যাসিস্টি ইতালি এবং নাৎসি জার্মানির সহায়তায় স্প্যানিশ মূল ভূখণ্ডে যেতে সক্ষম হন ফ্রাঙ্কো। তার ক্যু প্রচেষ্টা আংশিকভাবে সফল হয়েছিল। ফ্রাঙ্কো বাহিনী স্পেনের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং একটি রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত ফ্রাঙ্কো বিজয়ী হন। ১৯৭৫ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্পেনকে একনায়ক হিসেবে শাসন করেন ফ্রাঙ্কো।
আরেকটি আলোচিত ক্যুয়ের জনক মুয়াম্মার গাদ্দাফি। নিরক্ষর বেদুইন মা-বাবার পরিবারে এক তাঁবুতে জন্ম নেওয়া মুয়াম্মার আল-গাদ্দাফি লিবিয়ায় রাজতন্ত্র এবং পশ্চিমাবিরোধী মনোভাবের ভেতর বড় হয়েছেন। এ যুবক ২৭ বছর বয়সে জুনিয়র সেনা কর্মকর্তা থাকা অবস্থায় ক্ষমতা দখলে মনস্থির করেন। ১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর দেশটির রাজা ইদ্রিস দেশের বাইরে ছিলেন। এ সুযোগে গাদ্দাফি ত্রিপোলি এবং বেনগাজি শহরে সামরিক যান নিয়ে নেমে পড়েন। তিনি এবং প্রায় ৭০ ষড়যন্ত্রকারী রাজপ্রাসাদ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন ঘিরে ফেলেন। সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে শীর্ষ কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার করেন। রাজার ব্যক্তিগত প্রহরীরা সামান্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। মাত্র দুই ঘণ্টায়
রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানে সফল হন গাদ্দাফি। সেদিন সকালে এক রেডিও ভাষণে গাদ্দাফি জানিয়েছিলেন তিনি ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ এবং ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ শাসনের পতন ঘটিয়েছেন। ২০১১ সালের ‘আরব বসন্ত’ বিদ্রোহের নানা ঘটনায় নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত ৪২ বছর লিবিয়া শাসন করেন গাদ্দাফি।
ধরন
বছর চারেক আগে ওয়াশিংটন পোস্ট ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯০ সালে অর্থনীতিবিদ জন লন্ড্রেগান এবং কিথ পুল প্রকাশিত এক গবেষণায় দাবি করা হয়, দারিদ্র্য ক্যু ঘটার অন্যতম কারণ। তাদের মতে, যেসব দেশ দরিদ্র তারা ক্যুর ফাঁদে পড়ার ঝুঁকি রাখে। বেস্টসেলার বই ‘দ্য বটম বিলিয়ন’-এ পল কোলিয়ার এ উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, আফ্রিকা বিশ্বের সবচেয়ে ক্যু-প্রবণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে কারণ এটি ‘নিম্ন আয় এবং নিম্ন প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রস্থল’।
ওয়াশিংটন পোস্টের ওই প্রতিবেদনে গবেষক জন চিন বলছেন, অন্যান্য ধরনের ক্যুও আছে। যেমন শুধু রেজিম পরিবর্তন ঘটানো অথবা একই দলের ভেতর অন্য গ্রুপ ক্ষমতায় আসা। লাতিন আমেরিকার বেশিরভাগ ক্যু ছিল এ ধরনের। এর জন্য দারিদ্র্য কোনো কারণ নয়। নিজেদের ভেতর ক্ষমতার ভাগাভাগি অথবা একটি কর্র্তৃত্ববাদী সরকারকে দলকে হটিয়ে তুলনামূলক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিস্থাপন করা। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন আসে না।
ওই প্রতিবেদনে জন চিন একটি টিভির বরাত দিয় বলছেন, ‘যখন আপনি সিংহাসনের খেলা খেলবেন, আপনি জিতবেন বা আপনি মারা যাবেন। এখানে কোনো মধ্যস্থল নেই।’ তিনি লিখেছেন, পর্যবেক্ষকরা নিয়মিতভাবে হিংসাত্মক অভ্যুত্থানের সঙ্গে অহিংস নির্বাচনের পার্থক্য খুঁজে পান। যেমনটি রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ব্রায়ান পি. ক্লাস ২০১৫ সালের একটি গবেষণাপত্রে করেছিলেন। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা অভ্যুত্থানকে ‘একটি ছোট গোষ্ঠীর দ্বারা একটি বিদ্যমান সরকারের আকস্মিক, হিংসাত্মক উৎখাত’ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে। গবেষকরা বিপ্লবী বা জাতিগত গৃহযুদ্ধ, গণহত্যা এবং রাজনৈতিক হত্যার সঙ্গে ক্যুর মিল খুঁজে পান। তারা বলছেন, সব অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা শক্তির অন্তর্নিহিত সংঘাতের কারণে ঘটে। তাই রক্তপাত হয়। জন চিন বলেছেন, আমার নিজস্ব তথ্য থেকে জানা যায় যে, ক্যু প্রচেষ্টার ৮০ শতাংশে বলপ্রয়োগের সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে। অর্ধেকের বেশি ক্যু-তে গুলি চালানো হয়েছে, অন্তত ২৫ জন মারা গেছে এমন পাল্টা ক্ষমতা দখলের ঘটনা ১৫ শতাংশের কম। মাত্র এক শতাংশ ক্যু-তে নিহতের সংখ্যা অন্তত এক হাজার। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৮৭ সালের নভেম্বরে তিউনিসিয়ার অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট হাবিব বুরগুইবাকে প্রধানমন্ত্রী জাইন এল-আবিদিন বেন আলী ক্ষমতাচ্যুত করেন। আর সেটি ঘটে খুব সহজে। বুরগুইবাকে পরীক্ষা করে তাকে শারীরিকভাবে প্রেসিডেন্ট পদের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। এ ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তখনকার প্রধানমন্ত্রী বেন আলী।
ক্ষতি
ক্যু রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ এর মধ্য দিয়ে রাজনীতি কিছুদিনের জন্য স্থবির হয়ে যায়। সামরিক, আধাসামরিক বা অনির্বাচিত শক্তির হাতে চলে যায়। তখন অরাজনৈতিক একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যা গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য অশনিসংকেত। জন চিন বলেছেন, ক্যু অবশ্যই গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। যেমন ১৯৭৩ সালে চিলির ভাগ্যে যা ঘটে। সালভাদর আলেন্দেকে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্য দিয়ে দেশটিতে গণতন্ত্রহীন পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তবে গণতান্ত্রিক নেতাদের বিরুদ্ধে কিছু অভ্যুত্থানের ফলে গণতান্ত্রিক ভাঙন ঘটেনি। যার প্রধান কারণ একটি সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলেও সাংবিধানিকভাবে পরবর্তীদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে। যারা শিগগিরই নতুন গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। ২০০৯ সালে হন্ডরাসে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সেখানে তখন সামরিক বাহিনী ম্যানুয়েল জেলায়াকে নির্বাসনে পাঠাতে বাধ্য হয়। কিন্তু দ্রুত নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। যার মাধ্যেমে পোরফিরিও লোবো ক্ষমতায় আসেন।
ক্যু চেষ্টা নিয়ে বিশ্বে কিছু কিছু গবেষণা হয়েছে। তাদের মতামত হচ্ছে বিশ্ব ক্রমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও সংহত করছে। ক্যুর ঘটনা অনেক কমে এসেছে। আগের মতো অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থেকে নিজেদের ইমেজ, আর্থিক অবস্থা, কূটনৈতিক যোগাযোগ নষ্ট করতে চায় না। তবে নতুন প্রক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে, গণতান্ত্রিক সরকারই কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠছে। যা গণতন্ত্রকে নতুন সংকটে ফেলে দিয়েছে। সম্প্রতি ভেনিজুয়েলায় যা হয়েছে। সেখানকার ক্ষমসতাসীন মাদুরো সরকার বরাবরই ক্ষমতায় থাকছে। তারা নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নিজেদের কবজায় নিয়ে গণতন্ত্রের নামে কর্র্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। ফলে ক্যু আবার ফিরে আসতে পারে বিশ্বে। আর সেটা ঘটতে পারে লাতিন আমেরিকার মধ্য দিয়ে। তবে আফ্রিকার পরিস্থিতি ভালো। এ উপমহাদেশে গণতন্ত্র চর্চার প্রতি আন্তরিকতা দেখা যাচ্ছে। তারা নিজেদের আরও সংহত করার জন্য গণতন্ত্রকেই বেছে নিয়েছে। একটা সাধারণ উপলব্ধি তাদের হয়েছে যে, অন্যদের দ্বারা তারা আর শোসিত হবে না। নিজেদের স্বার্থকে সবার আগে প্রাধান্য দিতে হবে। এই বোধ ও বুদ্ধি থেকে আফ্রিকায় গণতান্ত্রিক শাসন জোরদার হচ্ছে। এশিয়ায় অবশ্য বিভিন্ন দেশে কর্র্তৃত্ববাদী সরকার ক্ষমতায় আছে। সেখানে যে কারণে বিদ্রোহের ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন শাসন করা আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। এখন বিক্ষোভ চলছে পাকিস্তানে। ভারতেও বিক্ষোভ হতে পারে বলে অনুমান করছে আন্তর্জাতিক সংস্থা। মিয়ানমার পরিস্থিতি খুবই নড়বড়ে।
