কদিন আগের আইনমন্ত্রী কেন পেলেন না আইনজীবী

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৪, ০৪:৪০ এএম

অ্যাডভোকেট আনিসুল হক। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের ১০ বছর তিনি ছিলেন আদালত ও বিচারাঙ্গনে প্রতাপশালী ও অনেকটা নীতিনির্ধারকের ভূমিকায়। তিনি নিজেও একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। অথচ গত বুধবার তার রিমান্ড শুনানিতে আদালতে তার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। আদালতের এজলাসের লোহার খাঁচায় দাঁড়িয়ে আদালতের আদেশে যেতে হয়েছে ১০ দিনের রিমান্ডে।

আওয়ামীপন্থি শীর্ষ বা তরুণ আইনজীবীদের কেউ সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের পক্ষে শুনানি করেননি। এক বিরূপ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন তিনি। মন্ত্রী পদে থাকাকালে এক পিঠ দেখা আনিসুল হক মন্ত্রীর পদ চলে যাওয়ার পর দেখলেন আরেক পিঠ। মূলত অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা ও হামলার ভয় থেকে তার পক্ষে কোনো আইনজীবী শুনানি করেননি বলে জানিয়েছেন আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় সংঘর্ষে হকার শাহজাহান আলী খুনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে গত বুধবার আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে ঢাকার সিএমএম (চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট) আদালতে হাজির করা হয়। সন্ধ্যায় তাদের রিমান্ড শুনানি কেন্দ্র করে আদালত এলাকায় ছিল কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে। সিএমএম আদালত চত্বরে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা দুজনের বিরুদ্ধে মিছিল করেন। উৎসুক মানুষরা ঝাড়–, জুতা হাতে আনিসুল হক, সালমান এফ রহমানের শাস্তির দাবি করেন। কেউ কেউ এতটাই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান যে, প্রিজন ভ্যানে ডিম, পানির বোতল ও ইটের টুকরো ছুড়ে মারেন। এ পরিস্থিতির মধ্যে তাদের সংশ্লিষ্ট আদালতের এজলাসে আসামিদের জন্য নির্ধারিত লোহার খাঁচায় ঢোকানো হয়। রিমান্ডের ওপর ২০ মিনিট শুনানি নিয়ে তাদের ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে সংশ্লিষ্ট আদালত। দুজনের জামিন ও রিমান্ডের বিরোধিতার জন্য কোনো আইনজীবী শুনানিতে আসেননি।

একাধিক আইনজীবীর তথ্যমতে, দুজন আইনজীবী তাদের হয়ে শুনানিতে আগ্রহ দেখালেও বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের তোপের মুখে তারাও শুনানিতে আসতে পারেননি।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের আন্দোলন চলতি মাসের শুরুতে শেখ হাসিনা ও সরকারের পদত্যাগের এক দফা আন্দোলনে পরিণত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্বিচার গুলিতে শিক্ষার্থীসহ কয়েকশ মানুষ নিহত হওয়ার পর গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং ওইদিন তিনি পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে  যান।

ঢাকার আদালতগুলোতে রাষ্ট্রপক্ষে (আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত) মামলা পরিচালনা করেন এমন বেশ কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছে দেশ রূপান্তর। তারা বলেন, সরকারের পতনের দিন থেকেই আওয়ামীপন্থি আইন কর্মকর্তারা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১০ দিন তাদের শীর্ষ আইনজীবীরা আদালতে আসছেন না। এমনকি আদালত অঙ্গনে গত দেড় দশকের বেশি সময়ে বিএনপি- জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের বিরুদ্ধে যারা মিছিল, মিটিংয়ে সোচ্চার ছিলেন, তারাও আদালতে আসছেন না। কেউ কেউ চলে গেছেন আত্মগোপনে।

সাবেক আইনমন্ত্রীর আইনজীবী না থাকা নিয়ে ঢাকার আদালতে শুনানিকারী আওয়ামীপন্থি অন্তত পাঁচজন আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে দেশ রূপান্তর। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নিয়োগপ্রাপ্ত ও দীর্ঘদিন ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের প্রধান কৌঁসুলি হিসেবে দায়িত্বপালনকারী আবদুল্লাহ আবুর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শীর্ষ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন কাজলকে ফোন করা হলে তিনি কোনো কথা বলেননি।

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) পদমর্যাদার দুজন আইনজীবী প্রায় অভিন্ন সুরে বলেন, মূলত অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কা ও ভয় থেকে আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের পক্ষে কোনো আইনজীবী শুনানিতে আসেননি। তারা বলেন, দুজনের পক্ষে কোনো আইনজীবী ওকালতনামা জমা দিয়েছেন, এমন তথ্য তাদের জানা নেই। দুজন আইনজীবী শুনানি করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন বলে তারা শুনেছেন। কিন্তু আদালতে বিরূপ পরিস্থিতিতে তারাও একপর্যায়ে পিছু হটেন।

একজন এপিপি বলেন, আনিসুল হককে আদালতে আনার আগে থেকেই তারা আঁচ করতে পেরেছিলেন যে, শুনানি করতে গেলে বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা আক্রমণাত্মক হবেন এবং তাদের রোষানলে পড়তে হবে। এ আশঙ্কা থেকে কেউ আদালতে আসার সাহস পাননি। ওই আইনজীবী আরও বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ তারা আদালতে শুনানি করতে গেলে বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। অনেকেই হেনস্তার শিকার হয়েছেন। যেজন্য অনেকেই বাসাতেই অবস্থান করছেন।

অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর পদমর্যাদার একজন আইনজীবী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অনেক আইনজীবী আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠ ও বন্ধু বলে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে পরিচয় দিতেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন। কিন্তু তাদের কেউ বুধবার আদালতে আসেননি। রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী আরও বলেন, সাধারণত রিমান্ড শুনানিতে রিমান্ডের বিরোধিতা করে জামিনের আবেদন করা হয়। অথচ উনি (আনিসুল হক) একজন সাবেক আইনমন্ত্রী হয়েও কোনো আইনজীবী তার পক্ষে যাননি। বিপরীতে ব্যতিক্রম ঘটনা হলো, তার রিমান্ড চেয়ে শুনানি করেছেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত