ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতা ফিরে পাচ্ছে রাজধানী ঢাকা। তবে এতে খানিকটা বাদ সেজেছে নানান দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন। গেল কয়েক দিনে রাজধানীতে বেশ কিছু দাবি নিয়ে রাজপথে নামতে দেখা গেছে শিক্ষার্থী, চাকরিপ্রার্থী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন তারা। নতুন সরকারের কাছে জানাচ্ছেন তাদের প্রত্যাশা। গত তিন দিনে ঢাকায় অন্তত এমন প্রায় ২০টি বিক্ষোভ, মানববন্ধন, ঘেরাও কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী দুয়েক সপ্তাহে আরও নতুন কিছু দাবিদাওয়া নিয়ে মাঠে নামতে পারেন অনেকেই, যা সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়েও দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার দাবিতে ফের আন্দোলনে নেমেছেন চাকরিপ্রার্থীরা। এ দাবিতে গত শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন আন্দোলনকারীরা। দাবি পূরণ না হলে লাগাতার কঠোর কর্মসূচির ডাক দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা। একইদিনে শাহবাগে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন আউটসোর্সিং খাতের অন্তত ২০ হাজার কর্মী। আউটসোর্সিং নীতিমালা বাতিল এবং আউটসোর্সিং, দৈনিক ভিত্তিক ও প্রকল্পে কর্মরতদের বহাল রেখে বয়স শিথিল করে চাকরি স্থায়ীকরণের দাবি তুলেছেন সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এ পদ্ধতিতে কর্মরতরা। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবন যমুনার ফটকের সামনেও বিক্ষোভ করেন তারা।
এ ছাড়া শনিবার ভর্তি পুনর্বহালের দাবিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে মানববন্ধন করেছেন ভিকারুননিসা নূন স্কুলের প্রথম শ্রেণির ১৬৯ শিক্ষার্থী ও অভিভাবক। তারা জানান, চলতি শিক্ষাবর্ষে ভিকারুননিসা নূন স্কুলের প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। স্কুলের নিয়মকানুন মেনে ভর্তি হয়েছে, এমনকি বিভিন্ন পরীক্ষায়ও অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা। তিন মাস ক্লাস করার পর বয়স-সংক্রান্ত জটিলতায় ভর্তি বাতিল হয় ১৬৯ শিক্ষার্থীর। নিয়ম মেনে বেতনও পরিশোধ করা হয়। কিন্তু শিক্ষাবর্ষের মাঝখানে স্কুলের এমন সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক।
তার আগে গত শুক্রবার আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন এবং আদিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে শাহবাগ থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত ‘কালচারাল শোডাউন’ করেছে ‘সমতলের আদিবাসী ছাত্র-যুব ও সাধারণ জনগণ’। এ সময় সরকারের কাছে তারা ১১ দফা দাবি তুলে ধরে। একই দিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিভিন্ন দাবিতে সমাবেশ করেছেন গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্টের নেতারা।
তবে সাপ্তাহিক ছুটির পর প্রথম কর্মদিবস গতকাল রবিবার সবচেয়ে বেশি আন্দোলন করতে দেখা গেছে। সকাল ৯টায় মিন্টো রোডের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে সড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন করেছেন ‘তথ্য আপা’ প্রকল্পের নারীরা। একই স্থানে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের উপজেলা পর্যায়ে মহিলাদের জন্য আয়বর্ধক (আইজিএ) প্রশিক্ষণ প্রকল্পে কর্মরত জনবলকে মন্ত্রণালয়ে রাজস্বকরণের সুপারিশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমাবেশ করছেন প্রশিক্ষক ও কর্মচারীরা। প্রেস ক্লাবের সামনে রাস্তা অবরোধ করে একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা মানববন্ধন করেন। বাংলা মোটরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের সামনেও একটি দলকে দাবি আদায়ে ব্যানার নিয়ে দাঁড়িয়ে সড়ক অবরোধ করেন। তাদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
১৩ দফা দাবিতে সকালে সচিবালয়ের গেটে কর্মকর্তারা ব্যানার ও জাতীয় পতাকা নিয়ে অবস্থান করেন স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের আওতায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা। কারওয়ান বাজার মোড়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সামনে একদল মানুষ সড়কে অবস্থান নিয়ে নানা দাবিতে স্লোগান দেন। বেলা ৩টায় সায়েন্স ল্যাব মোড়ে এইচএসসি পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে একদল শিক্ষার্থী সড়ক অবরোধ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এ দাবিতে মানববন্ধন হয়। উত্তরা বিএনএস সেন্টারের সামনেও এইচএসসি পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। একই সময়ে নিউ মার্কেটের সামনে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করেন।
চাকরি ফিরে পেতে পুলিশ সদর দপ্তরের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছেন গত ১৫ বছরের বিভিন্ন সময়ে হাজারো চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্য। পরে তাদের চার প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন আইজিপি।
এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা আসামিদের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে আসামিদের পরিবারের প্রায় দুই শতাধিক ব্যক্তি এ মানববন্ধনে অংশ নেন। তারা অভিযোগ করে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার তার প্রতিপক্ষ বিরোধী নেতাদের ফাঁসি দিতে এ ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করেছিল।
এদিকে সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ১০ দফা দাবি জানিয়েছে অধিদপ্তরের ক্ষতিগ্রস্ত ঠিকাদার সমন্বয় কমিটি। অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বরাবর স্মারকলিপি দেয় এ সমন্বয় কমিটি। দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত চলমান কাজ বন্ধ রাখা এবং তিন কর্মদিবসের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা না হলে চতুর্থ কার্যদিবস থেকে সড়ক ভবন ঘেরাও কর্মসূচি পালন করবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে সমন্বয় কমিটি।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও চাকরির বয়সসীমা ৩৫ বছর করার আন্দোলনের সংগঠক আরাফাত হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘদিন মানুষ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গেছে। আন্দোলনই হয়েছে বৈষম্য দূরীকরণের জন্য। সরকার গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই যদি আবারও আন্দোলনে উত্তপ্ত হয় দেশ, তাহলে রাষ্ট্র এবং জণগণ সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আমি মনে করি। মানুষের দুর্ভোগ বাড়াবে অনেক। তবে কেউ যাতে আর বৈষম্যের শিকার না হয়, সেদিকে সরকারকে লক্ষ রাখতে হবে।’
মানুষের এসব দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন যৌক্তিক বলে মনে করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার সরকারকে হঠানো হয়েছে। এ সময়ে নানান মানুষ বৈষম্য ও অন্যায়ের শিকার হয়েছেন। নতুন সরকার এ বৈষম্য দূর করতেই কাজ করছে। মানুষের দাবিদাওয়া থাকা যৌক্তিক, তবে তার আগে কিছু সময় দেওয়া উচিত।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন সরকারের কাছে মানুষের চাওয়া-পাওয়া থাকা স্বাভাবিক। তবে শুরুতেই অতিরিক্ত আন্দোলন হলে সেটি আবার সরকারের জন্যই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এ সময় ছাত্র-জনতা ও সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সব ধরনের অনিয়ম, অন্যায় ও বৈষম্য দূর করা উচিত।’
